kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

মোবাইল ব্যাংকিং সেবা মাসুল কমানোর দাবি

সজীব আহমেদ   

৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মোবাইল ব্যাংকিং সেবা মাসুল কমানোর দাবি

গাইবান্ধার সুমন মিয়া রাজধানীর কুড়িল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে রিকশা চালাচ্ছেন। রিকশা চালিয়ে যা আয় করেন সেখান থেকে নিজের খরচ রেখে বাকি টাকা বিকাশের মাধ্যমে গ্রামে থাকা স্ত্রীর কাছে পাঠিয়ে দেন। সুমন বলেন, ‘আগে টাকা জমিয়ে ১৫ দিন পর পর বাড়িতে গিয়ে দিয়ে আসতে হতো। কারণ আমার কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। এখন বিকাশ আসার পরে আমার জন্য অনেক ভালো হয়েছে। টাকা পাঠালে সঙ্গে সঙ্গে টাকা উঠিয়ে নিতে পারে। কিন্তু বিকাশ যদি টাকা পাঠানোর চার্জটা কম রাখে তাহলে আমাদের পরিশ্রমের টাকার অনেকটা থেকে যেত। এক হাজার টাকা তুলতেই খরচ করতে হয় সাড়ে ১৮ টাকা। এ সার্ভিস চার্জ আমাদের জন্য অনেক বেশি।’

সুফিয়া বেগম রাজধানীর জোয়ারসাহারা এলাকায় কয়েকটি বাসায় কাজ করেন। চার বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামী মারা যান। গ্রামে তাঁর মা-বাবার সঙ্গে ১৩ বছরের একটি ছেলে থাকে। মাস শেষে যে অল্প টাকা আয় করেন তা গ্রামে পাঠান বিকাশ ও রকেটের মাধ্যমে। কিন্তু সার্ভিস চার্জ বেশি দিতে হয় বলে তাঁর আক্ষেপের শেষ নেই।

সুমন মিয়া ও সুফিয়া বেগমের মতো কম আয়ের মানুষের কাছে মোবাইল ব্যাংকিং এখন যেন বড় আশীর্বাদ। এ সেবা আমাদের জীবনযাত্রাকে অনেক সহজ করে দিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ইমারজেন্সি টাকা লেনদেনের ভরসা এখন মোবাইল ব্যাংকিং। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে অতি দ্রুত টাকা পাঠানো বা আনা যায় বলে এটি সর্বসাধারণের কাছে বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু লেনদেনে যে পরিমাণ সার্ভিস চার্জ দিতে হয় তা সর্বসাধারণের জন্য অতিরিক্ত। দিনমজুর, রিকশা-ভ্যানচালক, প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকসহ দেশের হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন করছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণে লেনদেন হয়ে থাকে বিকাশের মাধ্যমে। সেখানে হাজারে সাড়ে ১৮ টাকা চার্জ দিতে হয়। এ রকম সব মোবাইল ব্যাংকিংয়ের চার্জের পরিমাণ বেশি। মোবাইল ব্যাংকিংগুলোর লেনদেন দেশের মধ্যেই হয়, তাহলে সার্ভিস চার্জ এত বেশি কেন? উন্নত প্রযুক্তির এ যুগে এটা বেমানান বলে জানায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

এদিকে মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস চালুর ফলে শুধু কম আয়ের মানুষের সুবিধা হয়েছে, বিষয়টা তেমন নয়। বড় করপোরেট ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পমালিকরাও এর সুবিধা পেয়েছেন। এখন দেশের সব বড় ভোগ্যপণ্য প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্য বিক্রির টাকা এ সেবার মাধ্যমে সংগ্রহ করছে, যাকে কালেকশন সেবা বলছে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো। আবার বড় শিল্প গ্রুপ তাদের শ্রমিকের বেতনও দিচ্ছে এমএফএসের মাধ্যমে। শুধু তা-ই নয়, সরকারি ভাতা, শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, কেনাকাটা, পরিষেবা বিল পরিশোধ সবই করা যাচ্ছে। আবার ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ ও আদায় এবং বিদেশি সংস্থার তহবিল বিতরণও হয়ে থাকে।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ নিয়মিত এ সেবা ব্যবহার করছে। সেবার জন্য নিবন্ধিত গ্রাহক এখন প্রায় আট কোটি। যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৫ শতাংশ।

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট হাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিকাশে সবচেয়ে বেশি সার্ভিস চার্জ দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের, তার পরও ৮০ শতাংশ মানুষ বিকাশে লেনদেন করছে। এক হাজারে সার্ভিস চার্জ সাড়ে ১৮ টাকা। এজেন্টরা পায় ৪.২০ টাকা। আর বাকিটা ব্যাংক পায়। তবে মোবাইল অপারেটরকে সেখানে থেকে কত টাকা দিতে হয়, তা আমরা জানি না।’

একটি ওষুধ কম্পানিতে কর্মরত আবু রায়হান কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যাংকের মাধ্যমে এক অ্যাকাউন্ট থেকে আরেক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হলে কোনো ধরনের মাসুল দিতে হয় না। একই ব্যাংকের অন্য অ্যাকাউন্টে পাঠালে তা তৎক্ষণাৎ পৌঁছে যায়। এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকের গ্রাহকের হিসাবে টাকা পাঠালে বর্তমানে এক থেকে তিন দিন পর্যন্ত সময় লাগে; কিন্তু কোনো মাসুল লাগে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্লিয়ারিং হাউস আধুনিকায়ন করায় লেনদেনের সময় কমে এসেছে। অদূর ভবিষ্যতে একই দিনের মধ্যে যেকোনো ব্যাংকের যেকোনো শাখায় তৎক্ষণাৎ টাকা পৌঁছে যাবে। প্রথাগত ব্যাংকিং যেখানে বিনা মাসুলে দুই গ্রাহকের মধ্যে লেনদেন করার সুযোগ দিতে পারে, সেখানে মোবাইল ব্যাংকিং এত উচ্চ হারে মাসুল নেবে কেন?

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের দুর্বল দিক হচ্ছে এর উচ্চ হারের মাসুল (সার্ভিস চার্জ) এবং অরক্ষিত এজেন্ট। তাঁদের মাধ্যমে সংঘটিত প্রতিটি লেনদেনে প্রতি হাজারে ২০ টাকা পর্যন্ত মাসুল দিতে হয়। এর পরও দৈনিক এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে এ সেবার মাধ্যমে। এতেই বোঝা যায় এ সেবার পরিধি কেমন।

মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসগুলোর (এমএফএস) সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, যে মাসুল আদায় হয়, তার ৬০ শতাংশের বেশি এজেন্টদের দেওয়া হয়। এরপর নেটওয়ার্ক খরচ দিতে হয়। বাকিটা প্রতিষ্ঠান পরিচালনাতে খরচ হয়। দিন শেষে মুনাফা হয় খুব কম। তবে দিন শেষে এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি জমা থাকছে। এসব অর্থের সুদ থেকেই মুনাফা করছে প্রতিষ্ঠানগুলো।

বাংলাদেশে মোবাইলের মাধ্যমে আর্থিক সেবার যাত্রা শুরু হয় ২০১১ সালের মার্চে। বাংলাদেশে এখন ১৬টি ব্যাংক মোবাইলে আর্থিক সেবা দিচ্ছে। এ বাজারের ৭০ শতাংশ বিকাশের নিয়ন্ত্রণে, ২২ শতাংশ রকেটের আর বাকিটা অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা