kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সহজ শ্রমিকের জীবন

নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা থেকে মুক্তি মিলেছে উদ্যোক্তার
মজুরি দিতে সময় কমায় উৎপাদনশীলতা বেড়েছে কারখানায়
মোবাইলে লেনদেন; মজুরির টাকায় সঞ্চয়

এম সায়েম টিপু   

৫ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সহজ শ্রমিকের জীবন

শ্রমিকরা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দ্রুত মজুরি পাওয়ায় বদলে যাচ্ছে তাঁদের জীবন। এখন আর লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে টাকার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। সময়ও বাঁচে অনেক। নগদ টাকার পরিবর্তে অন্যান্য খরচের পাশাপাশি মোবাইলে সঞ্চিত অর্থ থেকে মুনাফাও পান। এ ছাড়া নগদ লেনদেনের পরিবর্তে মোবাইলে লেনদেন হওয়ায় কারখানার মালিকদের দুশ্চিন্তা কমেছে আগের চেয়ে অনেক। ব্যাংক থেকে টাকা উঠিয়ে পথের নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা থেকে মুক্তি মিলেছে। এ ছাড়া বেড়েছে কারখানার উৎপাদনশীলতা। দিনব্যাপী মজুরি বণ্টনে ২০ থেকে ২৫ জন কর্মীর পুরো কাজ করেন চার-পাঁচজন। ফলে মালিক-শ্রমিক উভয় মনে করেন মোবাইল ফোনভিত্তিক আর্থিক লেনদেনের কারণে সহজ হয়েছে শ্রমিক জীবন। আর গতি এনেছে কারখানার উৎপাদনশীলতায়।

কভিড-১৯-এর সংকটকালীন এই সময়ে জনজীবন অনেকটা স্তব্ধ হয়ে পড়ে। বন্ধ হয়ে যায় শিল্প-কারখানা। কারখানার শ্রমিকরা চলে যান গ্রামে। এই সময় রপ্তানিমুখী শিল্প-কারখানাগুলোর শ্রমিকদের মজুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে নিম্ন আয়ের এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে সরকার পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করে। এই টাকা দিয়ে শ্রমিকদের তিন মাসের মজুরি দেওয়া হবে। মজুরির টাকা শ্রমিক পাবেন সরাসরি মোবাইল ফোনভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় কিছু জটিলতাসহ সমস্যা হলেও ডিজিটাল মাধ্যমে সহজ প্রাপ্তির এই সুযোগ শ্রমিকবান্ধব হয়েছে। তবে প্রথম প্রথম এমন উদ্যোগ শ্রমিকদের নানা বিড়ম্বনায় ফেলে। তবে উদ্যোক্তারা বলেন, সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতির মধ্য দিয়ে সামনে স্বচ্ছ, সহজ এবং নিরাপদ একটি আর্থিক লেনদেনের মাইলফলক হবে মোবাইল ব্যাকিং।

গাজীপুরের মাস্কো গ্রুপের শান্তা এক্সপ্রেস লিমিটেডের কর্মী মাহমুদা খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন আর মজুরির জন্য লাইনে দাঁড়াতে হয় না। বাড়ি ভাড়া দিই বিকাশে। বাড়িতে টাকা পাঠাই মোবাইলে। মাঝে মাঝে কেনাকাটাও করি মোবাইলে। টাকা খরচ করার পর কিছু টাকা আবার মোবাইলে থেকে যায়। এতে যে কী ভালো লাগে, বোঝানো যাবে না। সময় বাঁচে, দ্রুত লেনদেন হয়, এমনকি মোবাইলটি দেখলে গা হালকা লাগে। আমার নিরাপত্তা আমার মোবাইল হয়ে উঠেছে আজকাল।’

মোবাইল লেনদেনের সুবিধার পাশাপাশি কালের কণ্ঠকে কিছু অসুবিধার কথা জানান কয়েকজন পোশাক শ্রমিক। তাঁরা বলেন, এরই মধ্যে তাঁরা মোবাইল ব্যাংকিয়ের মাধ্যম এপ্রিল ও মে মাসের মজুরি পেয়েছেন। কিন্তু এই পদ্ধতিতে টাকা পেতে এক সপ্তাহ থেকে কখনো কখনো ১০-১২ দিন সময় লাগে। ৮ তারিখের মধ্যে মজুরি পাওয়ার কথা থাকলেও মজুরি হাতে পৌঁছতে ১৪ থেকে ১৫ তারিখ হয়ে যায়। এর মধ্যে শুরু হয়ে যায় বাড়িওয়ালার বাড়িভাড়ার তাড়া।

রাজধানী মিরপুরের একটি কারখানায় কাজ করেন রজিমা খাতুন। তিনি বলেন, আট হাজার টাকা মজুরি উঠাতে ১৬০ টাকা দিয়ে দিতে হয় এজেন্টদের। এটা প্রায় তাঁর চার ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজের টাকার সমান। অনেক সময় হিসাব-নিকাশের জটিলতায় কোনো কোনো শ্রমিক তাঁর প্রাপ্য মজুরি থেকেও অনেক কম পান। এটা আবার কারখানার কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়ে ঠিক করতে হয়। লকডাউনের এই সময় এজেন্টের দোকান পেতেও বেশ সমস্যা হয়। টাকা উঠাতে ছয়-সাতটি দোকান ঘুরে একটি দোকান পাওয়া যায়।

কষ্টের টাকা কেটে নেওয়া অনেক কষ্টকর উল্লেখ করে রাজধানীর রিও ফ্যাশনের শ্রমিক মো. আল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কারখানায় টাকা পেলে মজুরির খুচরা একটি অংশ থেকে ৮-১০ টাকা কারখানা কর্মকর্তারা না দিলেও তেমন গায়ে লাগেনি। কিন্তু মোবাইলে টাকা পাওয়া অনেক সময়সাপেক্ষ। কম করে হলেও এক সপ্তাহের বেশি সময় লেগে যায়। এ ছাড়া এজেন্টরা টাকা কেটে নেওয়ার ফলে পুরো টাকা আর হাতে পাই না।’

আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সময় বাঁচাতে ও শ্রমিকের মজুরি নিশ্চিত করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সুবিধা নেওয়া হলেও এর বিড়ম্বনাও কম নয়। দেখা যায়, টাকা উঠাতে দোকানে দোকানে ঘুরতে হয়। এজেন্টদের কাছে পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে এমনটা ঘটে। কোনো ব্যাংকের বুথে গিয়ে দেখা যায় দুই-তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এ ছাড়া এত বেশি কমিশন দিতে হয়; ফলে শ্রমিকরা মোবাইল ব্যাকিংয়ের আওতায় মজুরি নিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। তাই আমাদের দাবি, শ্রমিকদের মোবাইল ব্যাকিংয়ের আওতায় আনতে প্রতি হাজারে ১৮ থেকে ২০ টাকা কমিশন চার্জ কমিয়ে এটা অর্ধেকে নামিয়ে আনা।’

গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের তৈরি পোশাক খাতে শ্রমিকদের মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বেতন-ভাতা প্রদানে ব্যাপক পরিবর্তনের তথ্য উঠে এসেছে। চলতি বছরের ১৬ মে পর্যন্ত ৬৭ শতাংশ পোশাক শ্রমিক বেতন-ভাতা পেয়েছেন। বেতন প্রদানে নারী ও পুরুষের মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। নারী শ্রমিকদের বেতন কম দেওয়া হয়েছে। ৬৪ শতাংশ নারী শ্রমিক এবং ৭৪ শতাংশ পুরুষ শ্রমিক বেতন-ভাতা পেয়েছেন।

মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে বেশি সময় টাকা জমা রেখেছেন নারী শ্রমিকরা। ৮৪ শতাংশ নারী ৯৩ শতাংশ পুরুষের তুলনায় বেতনের টাকা বেশি সময় অ্যাকাউন্টে জমা রেখেছেন। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বেতন পাওয়া শ্রমিকদের ৯৫ শতাংশই প্রথমবারেই এজেন্ট ও এটিএম মেশিন থেকে টাকা তুলতে পেরেছেন।

দেশের মোবাইল ফোনভিত্তিক আর্থিক নেটওয়ার্ক বিকাশের কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০১৫ সাল থেকেই তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের বিকাশের আর্থিক নেটওয়ার্কের আওতায় শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া হতো। তবে এটার আওতা বেড়েছে। রপ্তানি খাতের শ্রমিকদের মজুরি দিতে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার পর এর চাহিদা বেড়েছে অনেক। আগে মাত্র ৪০০ কারখানার চার লাখ শ্রমিককে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা দেওয়া হলেও এটা এখন ১৫ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।

এর প্রভাবের কথা উল্লেখ করে ডালিম বলেন, মোবাইলের মাধ্যমে মজুরি পাওয়ায় দ্রুত টাকা পেয়ে যাচ্ছেন শ্রমিকরা। নগদ অর্থের পরিবর্তে অন্যান্য ব্যয় করতে পারেন বিকাশের মাধ্যমে। ফলে সব টাকা খরচ না করায় জমাকৃত টাকা থেকে লাভও পান কর্মীরা। শ্রমিকের মজুরির টাকার জন্য কোনো সার্ভিস চার্জ দিতে হয় না। সার্ভিস চার্জের টাকা ভাগাভাগি করে দায়িত্ব নেয় বিকাশ এবং ব্যাংক।

তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি আরশাদ জামাল দিপু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মোবাইল ব্যাকিংয়ের মাধ্যমে শ্রমিকদের মজুরি দিতে গিয়ে সরকারের প্রণোদনার অর্থ সুনির্দিষ্টভাবেই তাদের কাছে পৌঁছে গেছে। এপ্রিল মাসের এক হাজার ৮৬৭টি কারখানার ১৭ লাখের বেশি শ্রমিক মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পেয়েছে। এ জন্য শ্রমিকদের কোনো টাকা দিতে হয় না। তবে প্রথম প্রথম এই লেনদেন প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় নিলেও, আমার আশা এটা শিগগিরই ঠিক হয়ে আসবে।’ ৩০ লাখ শ্রমিকের মোবাইল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে বলে তিনি জানান।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা