kalerkantho

শনিবার । ২৭ আষাঢ় ১৪২৭। ১১ জুলাই ২০২০। ১৯ জিলকদ ১৪৪১

করোনার প্রভাব ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে

মেগাপ্রকল্পে কৃচ্ছ্র নীতি

আরিফুর রহমান   

৩ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মেগাপ্রকল্পে কৃচ্ছ্র নীতি

করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মেট্রো রেল, স্বপ্নের পদ্মা সেতু, পদ্মা রেল সংযোগ সেতুসহ মেগাপ্রকল্পগুলোতে। বিগত বছরগুলোর বাজেটে অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোতে যে হারে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হতো, আসছে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে সেই হারে টাকা দিতে পারছে না সরকার। করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবেলায় এক লাখ কোটি টাকারও বেশি ঘোষিত প্রণোদনার টাকা জোগান দিতে হবে আগামী অর্থবছর।

দীর্ঘদিন সাধারণ ছুটির কারণে রাজস্ব আদায়েও ধস নেমেছে। একদিকে প্রণোদনার টাকা জোগান দেওয়ার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ে শ্লথগতি। এমন বাস্তবতায় আসছে অর্থবছরে মেগাপ্রকল্পগুলোতে কৃচ্ছ নীতি অবলম্বন করা হচ্ছে। করোনার প্রভাবে প্রায় তিন মাস ধরে মেগাপ্রকল্পগুলোর কাজ বন্ধ।

ফলে নির্ধারিত সময়ে এসব প্রকল্পের কাজ শেষ করা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। আবার নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ না হলে প্রকল্পের খরচও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। পরিকল্পনা কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে পদ্মা সেতুর জন্য রাখা হয়েছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। অথচ চলতি অর্থবছরের বাজেটে পদ্মা সেতুর জন্য বরাদ্দ ছিল পাঁচ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। সে হিসাবে পদ্মা সেতুতে বরাদ্দ কমছে ৩৭০ কোটি টাকা। সরকারের অন্যতম একটি মেগাপ্রকল্প হলো রাজধানীতে চলমান মেট্রা রেল প্রকল্প। রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য মেট্রা রেল প্রকল্পটিতেও আগামী অর্থবছরে কাঙ্ক্ষিত বরাদ্দ দিতে পারছে না পরিকল্পনা কমিশন। আসছে ২০২০-২১ অর্থবছরে মেট্রা রেল প্রকল্পে পাঁচ হাজার ৬২২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। অথচ চলতি অর্থবছরের এডিপিতে এই প্রকল্পে রাখা হয়েছিল সাত হাজার ২১২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে বরাদ্দ কমছে এক হাজার ৫৯০ কোটি টাকা। জাপান আন্তর্জাতিক সহযাগী সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে দেশের প্রথম এই মেট্রা রেল প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। আগামী বছর ১৬ ডিসেম্বর প্রকল্পটি উদ্বোধনের কথা রয়েছে। কিন্তু করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে প্রায় তিন মাস ধরে প্রকল্পটির কাজ পুরোপুরি বন্ধ। দৈনিক শ্রমিক ও মাসওয়ারি শ্রমিক সবাই বাড়ি চলে গেছে। সাধারণ ছুটি শেষে ৩১ মে থেকে আবার অফিস খুলেছে। এখন আবার পুরোদমে কাজ শুরু হবে।

সরকারের আরেক মেগাপ্রকল্প হলো পদ্মা রেল সংযোগ সেতু প্রকল্প। ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই রেললাইন প্রকল্পে চলতি অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ ছিল তিন হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। কিন্তু আগামী অর্থবছরের বাজেটে সরকারের মেগাপ্রকল্পটিতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে তিন হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা। ফলে এই প্রকল্পে বরাদ্দ কমছে ১৫৬ কোটি টাকা। সরকারে আরেক অগ্রাধিকার কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পে আগামী অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ৫০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মূল এডিপিতে বরাদ্দ ছিল এক হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা। সেই হিসাবে বরাদ্দ কমছে ৮৪৯ কোটি টাকা। পরিকল্পনাসচিব নূরুল আমিন কালের কণ্ঠকে জানান, আগামী অর্থবছরের বাজেটে মেগাপ্রকল্পে কাঙ্ক্ষিত টাকা দেওয়া যায়নি। কারণ করোনার প্রভাব মোকাবেলায় যে প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে, সেখানে বড় একটি অংশ চলে যাবে। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় সব কিছু বন্ধ থাকায় রাজস্ব আদায়ও কমে যাবে। এসব কারণে মেগাপ্রকল্পে বরাদ্দ কমেছে।

সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার প্রকল্প হলো রাশিয়ার অর্থায়নে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প। করোনার মধ্যেও পাবনার ঈশ্বরদীতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ এগিয়ে চলেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে প্রতিদিন ছয় থেকে আট হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। প্রত্যেক শ্রমিককে কেন্দ্রে ঢোকানোর আগে মূল গেটে শরীরের তাপমাত্রা দেখে এরপর ভেতরে ঢোকানো হচ্ছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. শৌকত আকবর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা প্রতিটি শ্রমিকের শরীরের তাপমাত্রা মাপার জন্য মূল গেটের বাইরে স্ক্যানিং মেশিন বসিয়েছি। প্রত্যেককে পরীক্ষার পর তাদের ভেতরে ঢোকানো হয়। শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ চলছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, এক লাখ ১৩ হাজার ৯৩ কোটি টাকা ব্যয়সংবলিত দুই হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির কাজ শেষ হওয়ার কথা আগামী ২০২৫ সালে। এখন পর্যন্ত প্রকল্পটির অগ্রগতি হয়েছে ২৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের বাজেটে রূপপুরের জন্য যে টাকা বরাদ্দ ছিল, আগামী অর্থবছরে তা বাড়ছে।

পরিকল্পনা কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, চলতি বছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) এই প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ১৪ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। আগামী বছর তা বাড়িয়ে ১৫ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা রাখা হচ্ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বরাদ্দ বাড়ছে আগামী বছর।

সরকারের আরেকটি মেগাপ্রকল্প কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলায় মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পটির কাজ চলছে পুরোদমে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি লকডাউন বা অবরুদ্ধ করে দিতে কয়েক দিন ধরেই আন্দোলন করে আসছেন প্রায় তিন হাজার শ্রমিক। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা কোল পাওয়ার জেনারেশন কম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল) সাফ জানিয়ে দিয়েছে, করোনার কারণে প্রকল্পটির কাজ বন্ধ করা যাবে না। এরই মধ্যে প্রকল্প এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে কাজের গতি কমে গেছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালপত্র আমদানি শ্লথ হয়ে যাওয়ার কারণে। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রকল্পটি অনুমোদন পায় ২০১৪ সালে। ৩৫ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির কাজ ২০২৪ সালে শেষ হওয়ার কথা।

আগামী অর্থবছরের এডিপিতে মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে তিন হাজার ৩৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। চলতি অর্থবছর এই প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল তিন হাজার কোটি টাকা। সরকারের আরেক মেগাপ্রকল্প হলো ১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার হয়ে মিয়ানমারের ঘুনধুম সীমান্ত পর্যন্ত ১১৮ কিলোমিটার ডুয়াল গেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প। করোনার কারণে ২৬ মার্চ সরকারি ছুটি ঘোষণার পর থেকে প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে। সাধারণ ছুটি শেষ হয়ে আবার অফিস শুরু হয়েছে। ফলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এসব প্রকল্পের কাজ শুরু হবে শিগগিরই। আগামী অর্থবছরের এডিপিতে এই প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা। গত কয়েক বছরের এডিপিতে মেগাপ্রকল্পগুলোর বিপরীতে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি টাকা বরাদ্দ থাকত। কিন্তু করোনার প্রভাবে রাজস্ব আদায় কম হওয়ার কারণে আসছে বাজেটে মেগাপ্রকল্পে বরাদ্দ কমে ৩৭ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা