kalerkantho

শনিবার । ২৭ আষাঢ় ১৪২৭। ১১ জুলাই ২০২০। ১৯ জিলকদ ১৪৪১

করোনায় চট্টগ্রাম কাস্টমসে রাজস্ব আয়ে ধস

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

৩ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনায় চট্টগ্রাম কাস্টমসে রাজস্ব আয়ে ধস

রাজস্ব আয়ে এককভাবে শীর্ষে থাকা চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে রাজস্ব আদায়ে ধস নেমেছে। করোনাভাইরাসের প্রভাবে আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়া; উচ্চ শুল্কের বাণিজ্যিক পণ্য আমদানি কমা, ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে সারা দেশে টানা ৬৬ দিনের ছুটির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতার কারণে আমদানি পণ্য বন্দর থেকে ছাড় না নেওয়ায় রাজস্ব আয়ে এই ধস নেমেছে বলে মনে করেন কাস্টমস কর্মকর্তা, আমদানি-রপ্তানিকারক এবং কাস্টমস স্টেকহোল্ডাররা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে শুধু আমদানি-রপ্তানি খাতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৯২ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে শুধু চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকেই রাজস্ব আয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ আমদানি-রপ্তানি খাতে রাজস্ব আয়ের ৬৮ শতাংশই এই কাস্টমস থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। কিন্তু সেই লক্ষ্যমাত্রায় গুড়েবালি দিয়েছে করোনাভাইরাসের মহামারি।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের হিসাবে, চলতি ২০১৯-১০ অর্থবছরের জুলাই-মে পর্যন্ত ১১ মাসে কাস্টম হাউসের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা আছে ৫৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে আয় হয়েছে সাড়ে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রা থেকে এখনো প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা পিছিয়ে আছে রাজস্ব আয়ে দেশের সবচেয়ে বড় এই কাস্টমস।

কাস্টমসের তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, রাজস্ব আয়ে সবচেয়ে বড় ধস নেমেছে এপ্রিল ও মে মাসে। এই দুই মাসে লক্ষ্যমাত্রার এক-তৃতীয়াংশ আয় করতে সক্ষম হয়েছে কাস্টমস। মূলত ২৬শে মার্চ থেকে সারা দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলে আমদানি-রপ্তানিতে ধস নামে। এর প্রভাবে এপ্রিল-মে মাসে রাজস্ব আয়ে ধস নেমেছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, চীনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ার পর জানুয়ারি থেকে কিছুটা প্রভাব পড়ে দেশের আমদানি বাণিজ্যে। কিন্তু ফেব্রুয়ারি থেকে দেশে এর প্রভাব পড়তে শুরু করে; কিন্তু কাস্টমসে এর বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে গত এপ্রিল থেকে।

তিনি বলেন, মে মাস পর্যন্ত আমরা লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে পিছিয়ে আছি। জুন মাসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বকেয়া আদায়ে বেশ কিছু পরিকল্পনা নিয়েছি। এই অবস্থা চলতে থাকলে জুন মাসে রাজস্ব আয় বাড়বে এবং লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে আয়ের ব্যবধান কিছুটা কমে আসবে, কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না।

কাস্টমস কমিশনার বলছেন, ২৬শে মার্চ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ ভোগ্য পণ্য ছাড় হয়েছে; কারখানা খোলায় ছাড় হয়েছে বিপুল গার্মেন্ট কাঁচামাল এবং করোনাভাইরাস প্রতিরোধে বিভিন্ন ওষুধজাতীয় পণ্যের কাঁচামাল। এসব পণ্যে শুল্কহার আছে নামমাত্র। আর ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় উচ্চ শুল্কের পণ্যগুলো চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছাড় নিচ্ছেন না আমদানিকারকরা। ফলে সেই খাত থেকে আমরা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছি।

জানা গেছে, জাতীয় বাজেট প্রণয়নে সরকারের প্রথম ও তীক্ষ চোখ থাকে চট্টগ্রাম কাস্টমসের দিকে। রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আয়ে বড় নির্ভরতার জায়গা এই কাস্টমস। কিন্তু করোনাভাইরাস সব কিছু এলোমেলো করে দিয়েছে।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, দেশের অর্থনীতি যে গতিতে চলছিল; তাতে বাংলাদেশ দ্রুত এক উঁচু মর্যাদাশীল আসনে পৌঁছে যেত কিন্তু তা থমকে দিয়েছে এই করোনাভাইরাস। দেশজুড়ে লকডাউনের কারণে স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এই অর্থনীতির চাকা সচল না থাকলে রাজস্ব আয়ে তো ধস নামবেই। এখন সরকার চাইছে সেই চাকা সচল করতে।

কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিবছর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়; তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। এর আগের বছর কত শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে সেটি বিবেচনা করেই নতুন বছরে বাড়তি প্রবৃদ্ধি ধরে নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এই বছরের আমদানির গতি-প্রকৃতি বিবেচনা না করেই নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করায় অর্জন সম্ভব হয় না।

কাস্টমস কমিশনারও বলছেন, রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৪৫ শতাংশ কিন্তু আমদানির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ থেকে ৭ শতাংশ সুতরাং লক্ষ্যমাত্রা অর্জন চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে। এ ছাড়া উচ্চ শুল্কের যে পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আসত এখন সেটি আসছে না। অন্য বন্দর দিয়ে ছাড় হচ্ছে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম কাস্টমসে রাজস্ব আয়ের প্রধান খাত ছিল জ্বালানি তেল, গাড়ি আমদানি এবং ইলেকট্রনিকস খাত। ওই তিন খাতেই আমদানি অনেক কমেছে। ফলে সেসব খাত থেকে রাজস্ব আয় কমেছে। এ ছাড়া দেশে বিপুল ভোগ্য পণ্য আমদানি হলেও সেই পণ্যে শুল্কহার একেবারে নেই বললেই চলে। ফলে আমদানি বেশি; আমাদের কাজের পরিধিও একই কিন্তু রাজস্ব আয় নেই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা