kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ শ্রাবণ ১৪২৭। ১৬ জুলাই ২০২০। ২৪ জিলকদ ১৪৪১

বৈদেশিক ঋণ ও পাচারের টাকা আনতে হবে অর্থনীতিতে

রফিকুল ইসলাম   

২০ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বৈদেশিক ঋণ ও পাচারের টাকা আনতে হবে অর্থনীতিতে

২০০৫-০৬ অর্থবছরের চেয়ে আকার আট গুণ বাড়িয়ে চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছিল সরকার। এই বাজেটের আকার পাঁচ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা, যা ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ছিল ৬৪ হাজার কোটি টাকা। বিশাল এই বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় তিন লাখ ৭৭ হাজার টাকা। আর বাজেট ঘাটতি দাঁড়ায় এক লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা, যা বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে জোগান আসার কথা।

বাজেট হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯-২০ রাজস্ব আহরণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঘাড়ে চাপে তিন লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভূত কর আদায় ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ও কর ব্যতীত প্রাপ্তি ৩৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। বৈদেশিক উৎস থেকে অনুদানসহ আয় ৬৮ হাজার ১৬ কোটি টাকা ও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ উৎসে ব্যাংক থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। গত বছরের জুনে ঘোষিত বাজেটের এই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণের কাজ চললেও করোনাভাইরাস সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে। চলতি বছরের মার্চে দেশে করোনার আঘাত আসে। জনগণকে বাঁচাতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। স্বাস্থ্য খাতের জরুরি সেবাভুক্ত প্রতিষ্ঠান ছাড়া শিল্প-কারখানায় স্থবিরতা দেখা দেয়। উন্নত দেশের পথে এগিয়ে চলা অর্থনীতিতে টালমাটাল অবস্থার সৃষ্টি হয়। জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে ধারাবাহিকতা থাকা অর্থনীতিতে নামে বিপর্যয়।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা। তবে সংশোধিত বাজেটে এই আকার কমিয়ে ধরা হয় দুই লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। এবার এনবিআরের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা সোয়া তিন লাখ কোটি টাকা। করোনার আঘাত, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা, আমদানি-রপ্তানিতে স্থবিরতা ও প্রবাসীদের পাঠানো আয়ে ধসের কারণে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জানা যায়, বৈদেশিক বাণিজ্যে আমদানি-রপ্তানি অনেকটাই বন্ধ। বন্ধ শিল্পের উৎপাদনও। ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতার কারণে থমকে গেছে রাজস্ব আদায়। ক্ষতি সামলে উঠতে নানামুখী প্রণোদনা ঘোষণা করছে সরকার। মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষের সহায়তায় নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। করোনায় অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে এলেও বেড়েছে সরকারের ব্যয়। কিন্তু ব্যয়ের সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়ছে না। বরং রপ্তানি বন্ধের কারণে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। আবার ব্যবসায়ীদের সুবিধায় কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ায় সরকারের রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রায় প্রভাব পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাজেটে করের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটা পূরণ না হলে বাজেট বাস্তবায়নে অসুবিধা হবে। এ জন্য সরকারকে বাজেট বাস্তবায়নে বিকল্প পন্থা অবলম্বন করতে হবে। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে না হোক, বিদেশি সহায়তা নিতে হবে। বর্তমানে অর্থনীতিতে মূলধন প্রয়োজন হবে। সেই ক্ষেত্রে পাচার হওয়া টাকা বা করবহির্ভূত অপ্রদর্শিত অর্থকে অর্থনীতিতে আনতে হবে। আর টাকার প্রবাহ বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে হবে।’

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনার কারণে সৃষ্ট সংকট মোকাবেলায় অর্থনীতিতে অর্থের জোগান প্রয়োজন। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলেও সরকারকে ব্যয় তো মেটাতে হবে। এই ক্ষেত্রে সংকট মেটাতে টাকা ছাপানো, আড়ালে পড়ে থাকা কালো টাকা ও পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে অর্থনীতিতে আনতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েও ব্যয় নির্বাহ করা একটি ভালো মাধ্যম। এই ক্ষেত্রে ঋণের জাল বড় না করে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই নিতে হবে এমন পরামর্শ বিশ্লেষকদের। আর মূল্যস্ফীতির কথা চিন্তা করে টাকা ছাপানোর পক্ষে-বিপক্ষেও মত রয়েছে।

রাজস্ব আহরণের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও সেভাবে আদায় বাড়েনি। লক্ষ্যমাত্রার অনেক পেছনে থাকায় এবার বাজেট ঘাটতি ব্যাপক হারে বাড়বে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, করোনায় বিশ্ব মন্দার কারণে পণ্য আমদানি-রপ্তানি কমে গেছে। দেশের রপ্তানি পোশাকে চাহিদা বাতিল করেন বড় বড় ক্রেতারা। তৈরি পোশাক খাত রপ্তানি আয়ের বড় খাত হলেও দীর্ঘদিন থেকে মন্দা। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সও নিম্নমুখী। করোনার কারণে শিল্প খাত থেকে সরকারের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। আর ব্যবসায় মন্দার কারণে সরকারের রাজস্ব আহরণে বড় প্রভাব পড়বে, যাতে বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সরকারকে হিমশিম খেতে হবে।

গত ৫ এপ্রিল গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাজেট ঘাটতির আশঙ্কার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, করোনাভাইরাসের প্রভাব সার্বিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আয় সম্ভব হবে না। এ অর্থবছর শেষে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ আরো বেড়ে যাওয়া ও প্রবৃদ্ধি কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থনীতির প্রভাব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এবার ৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। চলতি অর্থবছরের পর এ হ্রাসের পরিমাণ আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আব্দুল মজিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার কারণে যে সংকট চলছে তাতে বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। বরং অর্থনীতি আরো ভঙ্গুর হবে। ব্যবসা ভালো না চললে করের ওপর প্রভাব পড়বে। অনেকে কর দিতে পারবে না। দেশের অর্থনীতির জন্যই ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হবে। ব্যবসা না হলে কর আসবে না। এ ক্ষেত্রে যারা প্রভাবিত হবে তাদের সরকার সহায়তা দেবে। অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান (এডিবি ও বিশ্বব্যাংক) বাজেট সহায়তায় ঋণ দিতে চাইবে। ঋণ নেওয়াও হচ্ছে। কিন্তু ভঙ্গুর অর্থনীতিতে এই ঋণ আরো ক্ষতি হয়ে দাঁড়াবে। কাজেই বিদেশে থাকা পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে হবে। এই টাকা না আনলে সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা