kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার আর মাস্কে সয়লাব চট্টগ্রামের বাজার

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

৮ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নকল হ্যান্ড স্যানিটাইজার আর মাস্কে সয়লাব চট্টগ্রামের বাজার

ওষুধ ব্যবসায়ী মো. শহীদুল ইসলাম সুজন তাঁর পেশাগত জীবনে হ্যান্ড স্যানিটাইজার কোনো ক্রেতা খুঁজেছে, সেটা মনেই করতে পারলেন না। চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর আবাসিক এলাকায় গত ১০ বছর ধরে ‘সামিয়া ফার্মেসি’ নামে জনপ্রিয় ওষুধের দোকানটি পরিচালনা করছেন তিনি। অথচ গত দেড় মাসে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে চর্চিত শব্দ মাস্ক এবং হ্যান্ড স্যানিটাইজার। আর মানুষের চাহিদাকে পুঁজি করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী যেমন এ দুটি পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়েছে আকাশছোঁয়া। আবার এক শ্রেণির অসাধু এই দুই পণ্যের চাহিদাকে পুঁজি করে কম দামের কথা বলে নকল পণ্য বিক্রি করে ধোঁকা দিচ্ছে ক্রেতাসাধারণকে।

গত দুই দিন চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নামি কম্পানির হ্যান্ড স্যানিটাইজার ফার্মেসি কিংবা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে নেই বললেই চলে। এর বদলে জায়গা নিয়েছে অখ্যাত কিছু প্রতিষ্ঠানের বানানো হ্যান্ড স্যানিটাইজার। নিম্নমানের এসব স্যানিটাইজারের দামও তুলনামূলক বেশি।

সামিয়া ফার্মেসির মালিক শহীদুল ইসলাম নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ‘নামি কম্পানির হ্যান্ড স্যানিটাইজার অর্ডার দিয়েও পাচ্ছি না। এসকে-এফ ফার্মার কয়েকটি স্যানিটাইজার পেয়েছি, যেগুলো ২৫০ মিলি এবং বোতলের গায়ের দাম ১১০ টাকা। অথচ সেফ নামের একটি লোকাল ব্র্যান্ডের ১০০ মিলির বোতলের দামই ধরেছে ১১০ টাকা। কিন্তু পণ্য তেমন ভালো না। চাহিদার সুযোগ নিয়ে কিছুদিন ধরে আরো কিছু বিক্রেতা হ্যান্ড স্যানিটাইজার নিয়ে দোকানে দোকানে সাপ্লাই দিচ্ছে। এসব পণ্য অত্যন্ত নিম্নমানের। আদৌ স্যানিটাইজারের ফর্মুলা মেনে পণ্য তৈরি করছে কি না, সেটা নিয়েই আমি সন্দিহান।’ এরই মধ্যে নগরের পাইকারি ওষুধের বাজার হাজারী গলি থেকে আসল বোতলে নকল স্যানিটাইজারসহ একজনকে আটক করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মানব শরীরে ৭০ শতাংশ ভাইরাস প্রবেশ করে হাতের মাধ্যমে। আর হাত নিয়মিত সাবান কিংবা হ্যান্ড ওয়াশ দিয়ে পরিষ্কার রাখলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা কম থাকে। এ কারণে ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকে সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেও হ্যান্ড ওয়াশ ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের চাহিদা বেড়ে যায়। দোকানে থাকা স্টক শেষ হওয়ার পর কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিজেদের উদ্যোগে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানিয়ে বিনা পয়সায় বিলিয়েছে। চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নসহ অনেকেই ব্যক্তি উদ্যোগে হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানিয়ে প্রাথমিক চাহিদা মিটিয়েছেন। এ সুযোগে স্যানিটাইজার বানানোর কাঁচামালের দামও অবশ্য অসাধু ব্যবসায়ীরা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

এদিকে করোনা আতঙ্কে বেড়েছে মাস্কের চাহিদা। এ সুযোগে মাস্কের কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ রয়েছে সুযোগসন্ধানীদের বিরুদ্ধে। ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে অনলাইন শপ দারাজের মাধ্যমে কার্বন ফিল্টারের পাঁচটি মাস্কের সেট মাত্র ১১২ টাকায় আনিয়েছিলেন চট্টগ্রামের একটি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রাশেদ হাসান। অথচ দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মাত্র ২২ টাকার প্রতিটি মাস্ক সেই দারাজেই বিক্রি হয়েছে ১১০ থেকে ১৫০ টাকা।

মূলত চীন ও ভারত থেকে আমদানি করে বাজারে মাস্ক সরবরাহ করে নগরের হাজারী গলি ও রিয়াজউদ্দিন বাজারের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। কিন্তু চীনেই মাস্কের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এবং একই সঙ্গে ভারতও রপ্তানি বন্ধ করায় দেখা দিয়েছে সংকট। সার্জিক্যাল মাস্কের সংকট এখনো রয়ে গেছে। নিনজা মাস্ক নামে কিছু মাস্ক আছে বাজারে, যেগুলো চীন থেকে আসা। এ মাস্কগুলো বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকার মধ্যে।

তবে দেশে সীমিত আকারে মাস্ক তৈরি করে গেটওয়েল ও হ্যালো ইউ নামের দুটি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ রয়েছে, সরবরাহ করছে না তারাও। সাধারণ কটন কাপড় দিয়ে হাতে মাস্ক বানিয়েও অনেকে বিক্রি করছে চড়া দামে। এগুলো দিয়ে আদৌ করোনাভাইরাসের প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত হবে কি না, সেই বাছবিচারের সুযোগও নেই।

কিছু অসাধু ব্যবসায়ী শপিং ব্যাগ তৈরির কাঁচামাল দিয়ে মাস্ক বানিয়ে বিক্রি করছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা দামে। কম দামে পাওয়ায় ভোক্তারাও কিনছে দেদার। কিন্তু এগুলো দিয়ে নিঃশ্বাস নিঃসরণ না হওয়ায় উল্টো শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। এ ছাড়া মুখে এক ধরনের তিতকুটে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তাই এ ব্যাপারে মনিটরিং বাড়ানোর তাগিদ ভোক্তা অধিকারবিষয়ক সংগঠন—ক্যাবের। ক্যাবের সহসভাপতি এস এম নাজির হোসেন বলেন, মানুষকে জিম্মি করে সংকটে ফেলে ব্যবসা করে অতি মুনাফা করার যে প্রক্রিয়া, সেটা বন্ধ হওয়া উচিত। আর এখানে সরকারেরও একটা নজরদারি থাকা উচিত।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা