kalerkantho

শুক্রবার । ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৫ জুন ২০২০। ১২ শাওয়াল ১৪৪১

পোশাক খাত ঘুরে দাঁড়াতে সম্ভাবনা দেখাচ্ছে পিপিই

বাংলাদেশের পিপিই চায় আমেরিকা, কুয়েতসহ আরো অনেক দেশ তৈরি করছে ১২ প্রতিষ্ঠান, যুক্ত হচ্ছে আরো অনেক কম্পানি

এম সায়েম টিপু   

৮ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পোশাক খাত ঘুরে দাঁড়াতে সম্ভাবনা দেখাচ্ছে পিপিই

একটি পোশাক কারখানায় পিপিই তৈরি করছে কর্মীরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় ডাক্তার, নার্সদের সুরক্ষায় বিশ্বজুড়ে এখন পিপিইর (পার্সোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট) সংকট দেখা দিয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ রপ্তানিকারক বাংলাদেশের সামনে নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখা দিয়েছে পিপিই খাত। পিপিই তৈরিতে বাংলাদেশের তেমন অভিজ্ঞতা না থাকলেও করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে বেশ কিছু পোশাক কারখানা পিপিই তৈরি শুরু করেছে। বিশ্ববাজারে ৫০০ কোটি ডলারের পিপিইর চাহিদা থাকায় প্রতিদিনই নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান যোগ হচ্ছে এই খাতে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কুয়েত থেকে পিপিই নিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কর্তৃপক্ষের সনদ, দক্ষ কর্মী তৈরি এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানি করা গেলে ভবিষ্যতে এই পিপিই দেশের একটি বড় সম্ভাবনার খাত হতে পারে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বর্তমানে বিশ্বমানের পিপিইর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশ্বমানের চতুর্থ ধাপের পিপিই তৈরির পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনা করছে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। আগামী ছয় থেকে এক বছরের মধ্যে পিপিই রপ্তানি বাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা নিয়েছে সংগঠনটি। বাংলাদেশ যদি শুরুতে এই বাজার ধরতে পারে তাহলে পোশাকশিল্প খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

এদিকে করোনাভাইরাসে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের সুরক্ষা নিয়ে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সভাপতি ও বিজিএমইএ সাবেক সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে পিপিই এবং শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার বিশেষ যন্ত্র ভেন্টিলেটর নিতে চায়। এ সময় সেনাপ্রধানও এসব পণ্যে কুয়েতের আগ্রহের কথা তুলে ধরেন।

বিজিএমইএ জানায়, দেশের এই সংকটময় সময়ে সুরক্ষা সরঞ্জামের সংকট কাটাতে এরই মধ্যে পিপিই তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে বিজিএমইএ। এই বিশেষ পোশাক তৈরিতে দেশের ১০-১২টি কারখানা যুক্ত হয়েছে। এই কারখানাগুলোর মধ্যে কেউ পিপিইর জন্য সরবরাহ করছে বিশেষ কাপড়, আবার কেউ বা বিনা মূল্যে সেলাই করে দিয়ে এ উদ্যোগে অংশীদার হচ্ছে।

বিজিএমইএ সভাপতি রুবানা হক বলেন, ‘বর্তমানে বিজিএমইএ সদস্যরা দেশের স্বাস্থ্য খাতে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে বেশ কিছু পিপিই তৈরি করছে। মূলত আমরা প্রথম স্তরের পিপিই বানাচ্ছি। কিন্তু করোনার চিকিৎসাকাজে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজন তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের পিপিই। আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য বিশ্বমানের ওই ধরনের পিপিই তৈরি করা, যা বিদেশে রপ্তানি করা যায়।’ তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে আইএলও, ডাব্লিউএইচও, ডাব্লিএফপি, ইউনিসেফ এবং অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তাদের কাছে মানসম্মত পিপিই উৎপাদন ও আমাদের উৎপাদন ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করতে সহায়তা চেয়েছি। তাদের সহায়তায় আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে এই খাতকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নীত করতে পারব এবং চতুর্থ ধাপের পিপিই তৈরি করার মতো ক্ষমতা ও জ্ঞান অর্জন করবে বলে আশা করছি।’

বিজিএমইএর পিপিই বিষয়ক সমন্বয়ক নাভিদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শতভাগ মেডিকেডেট পিপিই তৈরি করতে বাংলাদেশের আরো কমপক্ষে ছয় মাস সময় লাগবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, দক্ষ কর্মী, কাঁচামাল, স্বীকৃত মান সনদ দেয় এমন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সনদ নিতে হবে। বর্তমান অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো গেলে পোশাক খাতের ভবিষৎ সম্ভাবনাময় খাত হতে পারে এই পিপিই।’

এদিকে সম্প্রতি বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হকের এক চিঠির জবাবে জার্মানির অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও উন্নয়ন বিষয়ক মন্ত্রী গার্ড মুলার জানান, বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে বিকল্প পণ্য হিসেবে মেডিকেটেড পোশাকের কাজ দেওয়া যায় কি না; এ নিয়ে তিনি তাঁদের ক্রেতাদের ভাবতে অনুরোধ করবেন।

রপ্তানিমুখী ১২টি পোশাক কারখানায় তৈরি হচ্ছে পিপিই। আজমি ফ্যাশন, অ্যালায়েন্স অ্যাপারেলস, জেএম ফ্যাব্রিকস, লাক্সমা ইনওয়্যার, ঊর্মি গার্মেন্ট, স্নোটেক্স আউটারওয়্যার, টিআরজেড গার্মেন্ট, ফোরএ ইয়ার্ন অ্যান্ড ডায়িং, ডেকো ডিজাইন লিমিটেড, ইসলাম গার্মেন্ট লিমিটেড, অ্যারিস্টোক্র্যাট গ্রুপ ও মোহাম্মদী শার্টেক্স লিমিটেড পিপিই তৈরি করছে।

জানা যায়, সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্যভিত্তিক পোশাকের ক্রেতা মার্কস অ্যান্ড স্পেনসারসহ কয়েকটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান পিপিই তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। দেশের এই সংকটময় সময়ে এগিয়ে এসেছে ঊর্মি গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ আশরাফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে করোনাভাইরাসের এই সংকট মোকাবেলায় কাজ করছে ঊর্মি গ্রুপ। তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে এক লাখ পিপিই (প্রথম স্তরের) তৈরি করছি। এগুলো ডাক্তারদের সহযোগীদের ব্যবহারের উপযোগী।’ পিপিইর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পিপিই তৈরির বর্তমান অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যে সুযোগ সৃষ্টি করবে বলে আশা করছি।’

চট্টগ্রামের স্মার্ট জ্যাকেট লিমিটেড তৈরি করছে এক লাখ পিপিই। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক বিপ্লব মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেকোনো সংকটময় সময়ে দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাব আমরা। আমাদের তৈরি পিপিই শতভাগ বাতাস ও পানি প্রতিরোধক। এই পোশাকে কোনো ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস প্রবেশ করতে পারে না। ফলে ডাক্তারদের জন্য এই বিশেষ পোশাক কার্যকর হবে বলে আমার বিশ্বাস।’

 

পিপিই কী?

যদি কোনো ব্যক্তি এমন কোনো জায়গায় কাজ করেন; যেখানে তাঁর সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা আছে, তাহলে তাঁর জন্য পিপিই আবশ্যক। পিপিইতে পাঁচটি উপকরণ থাকা উচিত। এগুলো হলো—জুতার কভারসহ গাউন, গ্লাভস, মুখের আবরণ (ফেস শিল্ড), চোখ ঢাকার জন্য মুখের সঙ্গে লেগে থাকে এমন চশমা বা গগলস এবং মাস্ক।

জানা যায়, ১৭ শতকে ইউরোপে প্লেগ (মহামারি) দেখা দেয়। তখন ডাক্তাররা পিপিই হিসেবে অদ্ভুত রকমের একটি পোশাক পরতেন। ধারণা করা হয়, পোশাকটি ফরাসি চিকিৎসক চার্লস ডি’লরমি আবিষ্কার করেছিলেন। সে সময় ডাক্তাররা যে পিপিই পরতেন, তার মধ্যে ছিল একটি লম্বা কোট, যার বাইরের আবরণে মোমের প্রলেপ দেওয়া হতো। এ ছাড়া তাঁরা ছাগলের চামড়ার তৈরি হ্যাট আর গ্লাভস পরতেন, চোখে থাকত চশমা। হাতে থাকত একটি লাঠি, পায়ে বুট জুতা। হাতের লাঠি দিয়ে দূর থেকেই রোগীদের শরীরে কাজ করতেন।

পিপিই ঠিক কোন কাপড়ের তৈরি হতে হবে, এমন কোনো সুনির্দিষ্ট ধারণা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও এনএইচএসের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। কিন্তু এনএইচএস বলছে, পিপিই তৈরিতে এমন কাপড় ব্যবহার করতে হবে, যা কোনোভাবেই তরল শুষে নেবে না। এটা এমন পদার্থে তৈরি হওয়া উচিত, যাতে তা কোনো ধরনের তরলকে ধারণ না করে এবং সেটা গড়িয়ে পড়ে যায়। অর্থাৎ পিপিইকে সম্পূর্ণ শুষ্ক রাখবে, এমন পদার্থ ব্যবহার করাটাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আরো যে বিষয়টির দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তা হলো পিপিই নিয়মিত পরিবর্তন করা। একজন রোগীর একটি নির্দিষ্ট কাজের পরই পিপিই পরিবর্তন করার উপদেশ দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা