kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৬ চৈত্র ১৪২৬। ৯ এপ্রিল ২০২০। ১৪ শাবান ১৪৪১

অগ্নিকাণ্ড এড়াতে চাই ভালো মানের তার

আরিফুর রহমান    

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অগ্নিকাণ্ড এড়াতে চাই ভালো মানের তার

রাজধানীতে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। শীতের সময় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেড়ে যায়। রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিনিয়তই অগ্নিকাণ্ডের খবর গণমাধ্যমে আসছে। এতে একদিকে প্রাণহানি ঘটছে; অন্যদিকে দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতি একটি পরিবারকে পুরোপুরি নিঃস্ব করে দিচ্ছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, রাজধানীসহ সারা দেশে যত আগুনের ঘটনা ঘটছে, তার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই হয় বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কারণে। আগুন লাগার পর যখন ফায়ার সার্ভিস থেকে ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নামা হয় তখন দেখা যায় নিম্নমানের তারের কারণেই আগুন লাগছে। নতুন বাড়ি বানানোর সময় নিম্নমানের তার ব্যবহার করছে মানুষ। কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু টাকা বাঁচানোর জন্য মানুষ কম দামে নকল বা নিম্নমানের তার ব্যবহার করছে, যা পরে নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে। দুর্ঘটনা এড়াতে বাসাবাড়িতে উন্নত মানের তার ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।

কারওয়ান বাজারসহ কয়েকটি বাজার ঘুরে জানা গেছে, দেশের বাজারে ভালো ব্র্যান্ডের তার রয়েছে। এর মধ্যে নকল তারও রয়েছে। বিআরবি, প্যারাডাইজ, ট্রান্সটেক, বিবিএস, আরআর, সুপারস্টার, পলি, ইস্টার্ন, সুপারসাইনের মতো ব্র্যান্ডের তার রয়েছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি), ডেসকো ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রাহক যদি একটু সচেতন হয়, বাসাবাড়িতে ভালো মানের তার ব্যবহার করে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা অনেকাংশে কমে আসবে।

আরইবির প্রধান প্রকৌশলী অনজন কান্তি দাশ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গ্রাম পর্যায়ে আমরা যখন কোনো বাসাবাড়িতে বিদ্যুতের লাইন দিতে যাই, তার আগে ওয়্যারিং কাজ দেখার জন্য আমরা পরিদর্শক পাঠাই। মিটার সংযোগ দেওয়ার আগে আমরা দেখি তারের মান কেমন। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, মানুষ বিআরবি ও পলি ব্র্যান্ডের তার ব্যবহার বেশি করছে গ্রামাঞ্চলে। এ দুটি ভালো ব্র্যান্ড। পরিদর্শক প্রতিবেদন দেওয়ার পর আমরা মিটার সংযোগ দিই। তবে এর পরও আমরা বলব, একটু কম দামে যাঁরা নকল তার ব্যবহার করার মানসিকতা পোষণ করেন তাঁরা যাতে মানসিকতা পরিবর্তন করেন। আমরা গ্রাহকদের সচেতন করি।’

গত বছরের ৩১ মার্চ বনানীর এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কারণে ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। গত বছর নির্বাচন কমিশন ভবনে আগুন লাগার ঘটনাটিও বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে বস্তিগুলোতে আগুন লাগার ঘটনাকে নাশকতা বলে দাবি করে বস্তিবাসীরা। ঢাকাসহ সারা দেশে গ্রাম পর্যায়ে নতুন নতুন যেসব বাসাবাড়ি করা হচ্ছে, সেখানে শতভাগ ভালো মানের তার ব্যবহার করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের উপপরিচালক দীলিপ কুমার ঘোষ কালের কণ্ঠকে বলেন, শিল্পায়নের ফলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন নতুন স্থাপনা গড়ে উঠছে। ব্যক্তিগত পর্যায়েও বাসাবাড়ি করছে অনেকে। শিল্প-কারখানা হচ্ছে। কিন্তু সবখানে ভালো মানের তার ব্যবহার করা হচ্ছে না। মানুষ পয়সা বাঁচানোর জন্য সস্তা দামে তার কিনছে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, দেশে ফায়ার সুরক্ষার তার আছে। আগুন লাগার পরও কিছু সময় তারে আগুন লাগে না। একটা বিষয় গ্রাহকদের মনে রাখতে হবে, টাকার চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। তার যত মানসম্পন্ন হবে দুর্ঘটনা তত কমে আসবে। অনেক সময় দেখা যায়, ইঁদুর তার কেটে ফেলছে। তখন বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগছে। তিনি বলেন, মানুষ সচেতন নয়। মানুষকে ভালো মানের তার ব্যবহারে সচেতন হতে হবে। মানুষকে সচেতন করতে ফায়ার সার্ভিস কী করছে জানতে চাইলে দীলিপ কুমার ঘোষ বলেন, ‘আমাদের পরিদর্শক আছে, যারা মাঠ পর্যায়ে গিয়ে মানুষদের সচেতন করছে। জরিপ করা হচ্ছে। মহড়া দেওয়া হচ্ছে। জনসংযোগ করা হচ্ছে। এ সব কিছুই করা হচ্ছে মানুষকে সচেতন করতে।’

জানা গেছে, বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক তারের বাজার এখন সাত হাজার কোটি টাকার মতো। বিদ্যুতের চাহিদা ও উত্পাদন বাড়ার কারণে বৈদ্যুতিক তারের বাজারও বাড়ছে। ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে এগোচ্ছে এই শিল্প। এই শিল্পের সম্ভাবনার ক্ষেত্র অনেক। সরকারকে এই শিল্পে আরো গুরুত্ব দিতে হবে। দেশীয় উত্পাদন যাতে বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক পণ্যের সঙ্গে যাতে প্রতিযোগিতা করতে পারে সেই সুবিধা বাড়াতে হবে। কাঁচামাল আরো সহজলভ্য করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, অভ্যন্তরীণভাবে দরকারি সব ধরনের কেবল বা তার সরবরাহ করার জন্য বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোই যথেষ্ট। এখানে সব ধরনের তারই তৈরি হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের তার বিদেশে রপ্তানিও হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন তার উত্পাদনে স্বয়ংসম্পন্ন।

ডেসকোর নির্বাহী পরিচালক প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ কালের কণ্ঠকে বলেন, মানসম্পন্ন কেবল ব্যবহারের ক্ষেত্রে মুজিববর্ষ উপলক্ষে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি বিভিন্ন কম্পানির তারের মান ঠিক করবে। তিনি বলেন, অনেক সময় দেখা যায়, মানুষ একটু কম দাম পেলেই নকল তার কিনে সংযোগ দেয়। কোথাও কোথাও ইলেকট্রিক মিস্ত্রি যেভাবে পরামর্শ দেয়, সেভাবেই তার কেনে গ্রাহক। এতে দিন শেষে গ্রাহকই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাজারে এখন অনেক ভালো মানের তার পাওয়া যায়। ভালো তার চেনাও জরুরি।

ভালো মানের তার সম্পর্কে পলি কম্পানির এক কর্মকর্তা জানান, নিম্নমানের তার ব্যবহার করলে গ্রাহকের জন্য ঝুঁকি তৈরি হয়। শর্টসার্কিট থেকে মারাত্মক বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে কিংবা তারের ইনসুলেশন গলে যেতে পারে। ইনসুলেশন ভালো মানের না হলে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশনে ক্ষতি হতে পারে। এ ছাড়া বিদ্যুতের বিলও বেশি হতে পারে। তাই ভালো তার খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা