kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ৩ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

চীনা যন্ত্রপাতি আর দেশি প্রযুক্তিতে সাফল্য

কাঠের বিকল্প ‘বাঁশের’ আসবাব!

বাঁশ দিয়ে ২২-২৫ ধরনের আসবাব তৈরি হয়। এর মধ্যে আছে চেয়ার, টেবিল, ডাইনিং টেবিল, ফ্লোর টাইলস, পার্টিকেল বোর্ড, ড্রেসিং টেবিল ইত্যাদি। সেগুন কাঠের চেয়ে অর্ধেক দামে পাওয়া যাবে এসব বাঁশের আসবাব। আর নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যাবে দুই-তিন যুগ

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

২৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কাঠের বিকল্প ‘বাঁশের’ আসবাব!

অন্দরমহলে প্রবেশ করতেই দেখা মেলে সুন্দর কারুকাজ করা সব ‘সেগুন কাঠের’ আসবাব। চেয়ার, টেবিল, ডাইনিং ডেবিল, ড্রেসিং টেবিলসহ নানা পদের আসবাব চারদিকে। এসব ‘সেগুন কাঠের’ আসবাব তৈরির নেপথ্যের কারিগররা রুচিশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। তৈরি করেছেন বাহারি ডিজাইনে।

পুরো কারখানা দেখার পর ভুল ভাঙল। এতক্ষণ যা ‘সেগুন কাঠ’ বলে ভ্রম হয়েছিল, সেটি ভেঙেছে বাঁশ দেখে। পুরো কারখানায় একখণ্ড সেগুন কাঠও দেখা গেল না। দেখা গেল বাঁশের টুকরো ও গুঁড়া। এমন দৃশ্যের দেখা মেলে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বিএফআরআই)। চট্টগ্রাম নগরীর ষোলশহরের গবেষণাগারে গিয়ে ‘সেগুন কাঠের’ আসবাবসম্ভার দেখা গেলেও শেষ পর্যন্ত উত্তর মেলে—‘এসব আসবাব বাঁশের তৈরি!’

শুনতে বিস্ময়কর মনে হলেও এটিই বাস্তবতা। বন বিভাগের একটি কারখানায় তৈরি হচ্ছে কাঠের বিকল্প বাঁশের আসবাব। বাঁশ দিয়ে ‘সেগুন কাঠের’ আসবাব তৈরির নেপথ্যে কী? প্রশ্নের সহজ উত্তর দিলেন ইনস্টিটিউটের তরুণ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সাদ্দাম হোসাইন। বললেন, ‘দেখতে অবিকল কাঠের আসবাব মনে হলেও এসব বাঁশের তৈরি। বনের কাঠের ওপর চাপ কমাতেই বাঁশ দিয়ে তৈরির এই গবেষণা চলছে। এমন গবেষণার সুফল ইতিমধ্যে পাওয়া গেছে।’ তাঁর ভাষায়, ‘বাঁশের তৈরি আসবাবপত্রের গুণগত মান, দৃঢ়তা, মসৃণতা সবই কাঠের তৈরি আসবাবপত্রের মতোই। টেকসই বিবেচনায় কাঠের আসবাবপত্রের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। তবে দাম সেগুন কাঠের চেয়ে প্রায় অর্ধেক।’

কারখানা ঘুরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেল, ২০০৫ সালে বাঁশ দিয়ে আসবাব তৈরির ভাবনা শুরু হয়েছিল। বিএফআরআইয়ের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা খুরশীদ আকতার বাঁশ দিয়ে আসবাব তৈরির গবেষণাপত্র তৈরি করেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল, বাঁশ দিয়ে স্বল্প খরচে ও পরিবেশবান্ধব আসবাব তৈরি। গবেষণাপত্র তৈরির পর ২০০৯ সালে এসে বাঁশ দিয়ে আসবাব তৈরিতে সফলতা পাওয়া যায়। এই সফলতার সঙ্গী ছিলেন গবেষক মাহবুবুর রহমান ও ওয়ালিউল শেখ।

গত রবিবার দপুরে নিজ কার্যালয়ে ‘বাঁশ চেয়ারে’ বসে সাফল্যের কাহিনি শুনিয়েছেন বিজ্ঞানী মাহবুবুর রহমান। কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে জানালেন, বাঁশ দিয়ে আসবাব তৈরির যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়েছে চীন থেকে। আর প্রযুক্তি বাংলাদেশি। আসবাবের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে বাঁশের যোজিত (কম্পোজিট) আসবাবের বিকল্প নেই। আসবাবের চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু বনের গাছ কমছে। এ কারণে বন উজাড় হচ্ছে। বনভূমিও কমছে। যদি বাঁশ দিয়ে তৈরি হয় তাহলে বন রক্ষা পাবে। পরিবেশের ভারসাম্য ঠিক থাকবে। তিনি বলেন, একটি সেগুনগাছ পরিপক্ব হতে সময় লাগে অন্তত ৪০ বছর। আর একটি বাঁশ পরিপক্ব হয় মাত্র চার বছরে। বাঁশের আবাদ সহজ। তাই বন ধ্বংস না করেই বাঁশের তৈরি আসবাব দিয়ে চাহিদা মেটানো সম্ভব। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পোদ্যোক্তারা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন। এতে উদোক্তারা লাভবান হবেন। আর প্রায় বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দেবেন তাঁরা।

 

বাঁশ দিয়ে যেভাবে তৈরি হয়

তরুণ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সাদ্দাম হোসাইন জানালেন, তাঁরা আসবাব তৈরিতে ব্যবহার করছেন বাঁশ। তিন-চার বছর বয়সী বরাক ও বাইজ্জা বাঁশ। এর মধ্যে আছে দেশের গ্রামাঞ্চলে পাওয়া করজবা, বাইজ্জা, তল্লা, ভুদুম, মাকলা বাঁশ। তবে আসবাব তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত হচ্ছে বরাক বাঁশ। কারণ এই বাঁশের পুরুত্ব বেশি।

প্রথমে বাঁশ সংগ্রহ করতে হয়। ব্যাম্বো স্প্লিটার মেশিনে বাঁশগুলোকে ফালি করে কাটা হয়। মসৃণ করার প্রয়োজনে ফালিগুলোকে ফোরসাইড প্ল্যানার মেশিনের মধ্যে পাঠানো হয়। মসৃণ হওয়ার পর ফালিগুলো শুকানো হয়, যাতে ভেতরের আর্দ্রতা কমে। আর্দ্রতার পরিমাপ গড়ে ২০ শতাংশের মধ্যে নেমে এলে ফালিগুলো ১০ শতাংশ বোরাক্স-বোরিক এসিডের দ্রবণে দুই দিন ডুবিয়ে রাখা হয়। এই দ্রবণের মধ্যে ডুবিয়ে রাখার ওপর ফালিগুলোর টেকসই অবস্থা নির্ভর করে। নির্ধারিত সময়ে দ্রবণ থেকে ফালিগুলো তোলে আবার শুকানো হয়। এরপর নিয়ে যাওয়া হয় হটপ্রেস মেশিনে। একটি পাটাতনে বাঁশের ফালিগুলো সাজিয়ে রাখা হয়। শেষে ইউরিয়া-ফরমালডিহাইড আঠা দিয়ে চতুর্মুখী চাপ দেওয়া হয় মেশিনের ভেতরে নিয়ে। এতে একটি ফালির সঙ্গে আরেকটি ফালি এমনভাবে জোড়া লাগে, যাতে তৈরি হয় প্লাইবোর্ড। আর এই বোর্ড দিয়েই যেকোনো আসবাব তৈরি সম্ভব।

 

যেসব আসবাব তৈরি হয়

গবেষণাগারে দেখা গেল, কাষ্ঠ যোজনা বিভাগের অধীনে চলছে বাঁশ নিয়ে গবেষণা ও আসবাব তৈরি। এখানে বাঁশ দিয়ে ২২-২৫ ধরনের আসবাব তৈরি হয়। গবেষক মাহবুবুর রহমানের কক্ষেও ব্যবহূত হচ্ছে নিজেদের কারখানায় তৈরি করা আসবাব। এর মধ্যে আছে চেয়ার, টেবিল, ডাইনিং টেবিল, ফ্লোর টাইলস, পার্টিকেল বোর্ড ইত্যাদি। সেগুন কাঠের চেয়ে অর্ধেক দামে পাওয়া যাবে এসব বাঁশের আসবাব। আর নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যাবে দুই-তিন যুগ।

 

ফেলনা যেন ফেলনা নয়

একটি বাঁশের ফালি তৈরির পর অন্তত ৭০ শতাংশ বাঁশ অবশিষ্ট থাকে। মসৃণ ফালি করার পর অবশিষ্ট ৭০ শতাংশ বাঁশের গুঁড়া পাঠানো হয় মিক্সচার মেশিনে। এসব গুঁড়ার সঙ্গে আঠা দিয়ে হটপ্রেস মেশিনের মাধ্যমে তৈরি হয় পার্টিকেল বোর্ড, যা প্যানেল বোর্ডের মতোই শক্ত।

 

বাঁশের আসবাবের সুবিধা কী?

বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান জানালেন, বাঁশের আসবাবের অপার সম্ভবনার সঙ্গে অশেষ সুবিধাও রয়েছে। দামে সাশ্রয়ী ও পরিবেশসম্মত। একটি পরিপক্ব সেগুনগাছের জন্য ৪০ বছর অপেক্ষা করতে হয়। আর চার বছরের মধ্যেই পাওয়া যায় বাঁশ। একটি বাঁশঝাড় থেকে ৩০-১০০ বছর পর্যন্ত বাঁশ উত্পাদন সম্ভব।

 

উদ্যোক্তাদের জন্য কী বার্তা?

বাঁশের আসবাবগুলো বিভিন্ন প্রদর্শনীকেন্দ্রে নেওয়ার পর ক্রেতারা ক্রয়ের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কিন্তু গবেষণার জন্য তৈরি করা এসব আসবাব বিক্রি হয় না। ফলে ক্রেতাদের নিরাশ হতে হয়। তবে এই নিরাশা দূর করতে পারেন উদ্যোক্তারা। বাঁশের আসবাবের চাহিদা দেশে প্রচুর আছে। আবার বিদেশেও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এমন সম্ভাবনাময় খাতকে এগিয়ে নিতে সরকারও উদ্যোগী হয়েছে। এ কারণে নীলফামারী জেলার ডোমার এলাকায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আঞ্চলিক বাঁশ গবেষণা ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। এর অন্যতম লক্ষ্য হলো, বাঁশের আসবাবের  জনপ্রিয়তা বাড়ানো গেলে বনের ওপর চাপ কমবে। একই সঙ্গে প্লাস্টিকের ব্যবহারও কমবে। এতে পরিবেশ সুরক্ষা পাবে।

এমন একটি শিল্পকে এগিয়ে নিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারেন উদ্যোক্তারা। প্রাথমিকভাবে একটি কারখানা গড়ে তুলতে যন্ত্রপাতি আমদানি করতে হতে পারে প্রায় কোটি টাকার। সব মিলিয়ে দেড় কোটি টাকার মধ্যে একটি কারখানা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এর বাইরে জমি ও কারখানা নির্মাণের ব্যয় যুক্ত হলে চার-পাঁচ কোটি টাকা বিনিয়োগে একটি কারখানা গড়ে তোলা সম্ভব। যদি উদ্যোক্তারা এ ধরনের শিল্প স্থাপনে এগিয়ে আসেন, তাহলে বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দেবেন এখানকার বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা।

মাহবুবুর রহমান জানালেন, ২০১৪ সালে একে খান শিল্প গ্রুপের উদ্যোগে একে খান প্লাইউড ফ্যাক্টরি গড়ে তোলা হয়। তারা বাঁশের আসবাব তৈরি ও ফ্লোর টাইলস তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা