kalerkantho

শনিবার । ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪১

এক যুগেও পুরোপুরি ডিজিটাল হয়নি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

২২ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এক যুগেও পুরোপুরি ডিজিটাল হয়নি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস

রাজস্ব আয়ে এককভাবে শীর্ষে থাকা চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি বা অটোমেশন চালু হয়েছে ২০০৮ সালে। উদ্দেশ্য ছিল সময় কমানো, হয়রানিমুক্ত করা এবং ঘরে বসেই আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ার কাজ অনলাইনে সম্পন্ন করা। সেই প্রক্রিয়ায় অনেক দূর এগিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস।

স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির বিশ্বে প্রচলিত ‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড’ যুগে এখন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। প্রতিদিন এই হাউসে আমদানি-রপ্তানি মিলিয়ে পাঁচ হাজার বিল অব এন্ট্রি এবং এক্সপোর্ট জমা হয়; সবই অনলাইনে। আর রাজস্ব জমা হয় দিনে গড়ে ১৫০ কোটি টাকা। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করলেও পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হতে পারেনি কাস্টমস।

‘অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড’ পদ্ধতিতে বিভিন্ন সেবার জন্য ২৮টি মডিউল সচলের কথা, কিন্তু এখন পর্যন্ত ২৪টি মডিউল চালু হয়েছে; বাকি চারটি মডিউল তৈরি হলেও পুরোপুরি চালু হয়নি। এই অবস্থায় আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রমে ডিজিটালের পাশাপাশি ম্যানুয়ালিও কাজ হচ্ছে। দীর্ঘ ১২ বছরেও রাজস্ব আয়ে শীর্ষ এই প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি ডিজিটাল করতে না পারার বিভিন্ন কারণের কথা বলছেন কাস্টমস স্টেকহোল্ডাররা।

তাঁরা বলছেন, পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল কাস্টমস গঠনে চট্টগ্রাম কাস্টমসের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে। কাস্টমস কর্মকর্তারা একটি নির্ধারিত মেয়াদের জন্য দায়িত্বে আসেন; ফলে নিয়মিত রুটিন কাজ নিয়েই তাঁরা ব্যস্ত থাকেন। অটোমেশন নিয়ে তাঁদের মধ্যেও দায়সারা ভাব রয়েছে। রয়েছে স্টেকহোল্ডারদের একটি চক্রের অনীহা; কারণ শিক্ষিত লোকজন এই পেশায় না আসা এবং তাদের বাড়তি আয়ের পথ রুদ্ধ হওয়ার শঙ্কা। এই কারণে স্বয়ংক্রিয় কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নে গতি পাচ্ছে না।

চট্টগ্রাম কাস্টমসে পণ্য আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে সরাসরি জড়িত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা। আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। তাঁরা কী ভোগান্তিতে পড়েন জানতে চাইলে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক গোলাম রাব্বানি রিগ্যান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনো আমাদের ফাইল নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে কিন্তু স্বয়ংক্রিয় শুল্কায়নের সময় ঘোষণা দেওয়া ছিল পেপারলেস কাস্টমস হবে, তবে সেটি আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ। আমার মতে, ৪০ শতাংশ কাজ এখন স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে হচ্ছে। বাকি কাজ ম্যানুয়ালি হচ্ছে; ফলে পুরো সুফল মিলছে না।

তবে কাস্টমস ব্যবহারকারীদের অনেকেই বলছেন, ‘মেশিন বিহাইন্ড দ্য ম্যান’, ফলে যতই স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেটেড সিস্টেম চালু করা হোক না কেন। সেই মেশিন পরিচালনাকারী পেছনের মানুষগুলো যদি সক্রিয় না হয় তাহলে পুরোপুরি সফলতা আসবে না। সেই মানুষগুলোর দক্ষতা, কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সততা নিশ্চিত না হলে ভোগান্তি-হয়রানি কমবে, তবে সফলতা মিলবে না, বলছেন স্টেকহোল্ডাররা।

স্বীকার করে সিঅ্যান্ডএফ নেতা গোলাম রাব্বানি রিগান বলছেন, ডিজিটাল কাস্টমসের জন্য শিক্ষিত এবং প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট যেমন দরকার তেমনি কাস্টমস কর্মকর্তাদেরও একই গুণের অধিকারী হতে হবে। এখন পর্যন্ত অনেক কাস্টমস কর্মকর্তা নিজের কম্পিউটারটি চালাতে জানেন না।

 

অকশন বা নিলামে এখনো সনাতনি পদ্ধতি

অনলাইনে নিলাম (ই-অকশন) সেবা চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে সিস্টেম অ্যানালিস্ট বিভাগ। এ সেবা চালু হলে নিলাম প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজের সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কাস্টমস সূত্র জানায়, সব কাস্টম হাউসের নিলাম কার্যক্রম অনলাইনে আনতে গত ২০১৮ সালের অক্টোবরে ই-অকশন সফটওয়্যার চালু করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। কিন্তু কারিগরি কিছু সমস্যার কারণে এখনো চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে এই সেবা পুরোপুরি চালু করতে পারেনি।

কাস্টমস আইন অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া কোনো পণ্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আমদানিকারক ডেলিভারি না নিলে তা নিলামে বিক্রি হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় জব্দ করা অবৈধ কিংবা ঘোষণা ছাড়া আমদানি করা পণ্যের একটি অংশও নিলামে বিক্রি হয়। বর্তমানে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে চলে এ নিলাম কার্যক্রম। চট্টগ্রাম বন্দর নির্মিত অকশন শেডে এ নিলাম কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। এ পদ্ধতিতে নিলামে অংশগ্রহণকারীদের নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়; অন্যদিকে নিলাম প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও নানা অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া আটক পণ্য নিলামে তোলার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নেওয়াসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষ করতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অনেক সময় ব্যয় হয়।

কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম বলেন, মডিউল চালু হয়েছে আগেই; অনেকেই ই-পেমেন্টে রাজস্ব জমা দিচ্ছেন। কিন্তু এটি এখনো বাধ্যতামূলক করা হয়নি বলে সবাই জমা দিচ্ছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এই ধরনের নির্দেশনা দিলেই সুফল মিলবে।

 

চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের কার্গো শাখায় স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অধীনে রয়েছে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের আমদানি-রপ্তানি। সেই সিস্টেমেও কিছু পরিবর্তন এসেছে। চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো শাখায় ২০১৯ সালের ২৭ অক্টোবর স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু করেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। আগে সনাতন পদ্ধতিতে এসব পণ্যের ছাড় হতো। আর এতে জালিয়াতির ঘটনা ঘটত, শুল্কফাঁকি হতো। নতুন নিয়ম চালুর ফলে পণ্য নিয়ে আসা যাত্রীরা শুল্ক কর পরিশোধ করে দ্রুত পণ্য ছাড় নিতে পারবেন; আর কাস্টমস কর্তৃপক্ষও শুল্কফাঁকি বা জালিয়াতি ঠেকাতে পারবেন।

চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে কর্মরত কাস্টমসের উপকমিশনার রিয়াদুল ইসলাম বলছেন, নতুন নিয়ম চালুর ফলে কোনো পণ্যের রাজস্ব পরিশোধের জন্য কাস্টমস হাউসে যেতে হবে না। বিমানবন্দর শাখার সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমেই রাজস্ব পরিশোধ করতে পারবেন যাত্রীরা। এতে যাত্রী ও ব্যবসায়ীর পণ্য চালান-খালাস দ্রুত করা যাবে। অন্যদিকে চালান-খালাসের ক্ষেত্রে জালিয়াতি রোধ হবে। রাজস্ব আহরণ বাড়বে, বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের পণ্যপ্রাপ্তিতে ভোগান্তি কমবে। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের পণ্যজটও কমে যাবে।

কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে, চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতি সপ্তাহে একটি কার্গোবাহী উড়োজাহাজ আসা-যাওয়া করে। আর নিয়মিত যাত্রীবাহী ফ্লাইটেও প্রচুর পণ্য আসে। প্রতি সপ্তাহে অন্তত ২০০ আমদানি চালান বিমানবন্দর থেকে ছাড় হয়। প্রবাস ফেরত যাত্রীরা পণ্য আনেন খুবই কম। মূলত রিয়াজউদ্দিন বাজারকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীরাই বিভিন্ন যাত্রীর নামে এসব পণ্য আমদানি করেন। এতে বিপুল চোরাচালানের ঘটনা ঘটে। এক পণ্যের নাম দিয়ে অবৈধ ও উচ্চ শুল্কের পণ্য নিয়ে আসেন। কাস্টমসের সঙ্গে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং বিমানবন্দরের কিছু কর্মচারী এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। কাস্টমস কর্মকর্তারা বদলি হলেও বিমানবন্দর ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা বছরের পর বছর সেখানে কাজ করছেন। ফলে এই চক্রকে কমিশন দিয়ে এবং চক্রের বাইরে কোনো সিঅ্যান্ডএফেরও পণ্যছাড় করার সুযোগ নেই।

শুধু চট্টগ্রাম বিমানবন্দর নয়; চট্টগ্রাম বন্দরের  ভেতর ইউব্যাগেজ সিস্টেমও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে কাজ হচ্ছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা