kalerkantho

শনিবার । ১০ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৮ জমাদিউস সানি ১৪৪১

চোরাচালান রোধে বাংলাদেশ কাস্টমস

অরুণ কুমার বিশ্বাস ,অতিরিক্ত কমিশনার, কাস্টমস ভ্যালুয়েশন অ্যান্ড ইন্টারনাল অডিট কমিশনারেট, ঢাকা

২২ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চোরাচালান রোধে বাংলাদেশ কাস্টমস

চোরাচালান কী, কেন এবং কিভাবে সংঘটিত হয়—বিষয়গুলো মানুষ জানতে চায়। এর প্রভাব যেমন ব্যাপক, তেমনি চোরাচালান নিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা করাও খুব সহজসাধ্য কাজ নয়। সাধারণত আমরা মনে করে থাকি যে আমদানি নিষিদ্ধ পণ্য, স্বর্ণ বা জনস্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর দ্রব্যাদি যেমন মাদক বা সাপের বিষের ন্যায় ভয়ংকর কিছু আনা-নেওয়া করাকে ‘চোরাচালান’ বলা হয়। কিন্তু ‘দ্য কাস্টমস অ্যাক্ট ১৯৬৯’ মোতাবেক চোরাচালানের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা রয়েছে।

 

চোরাচালান কী

দেশে বলবত্ আইনগুলোর মধ্যে কেবল কাস্টমস আইনেই ‘চোরাচালান’ বিষয়টি সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ফলে অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা মূলত কাস্টমস আইনের ভিত্তিতেই দেশব্যাপী চোরাচালান নিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এ আইনে চোরাচালান বলতে যেকোনো পণ্য তার ওপর আরোপযোগ্য শুল্ককর পরিশোধ ব্যতিরেকে আমদানি করা বুঝায়। তদুপরি বেশ কিছু আইটেম, যেমন—মাদকদ্রব্য, নেশাজাতীয় ওষুধ বা সাইকোট্রপিক বস্তু, সোনা ও রুপার বুলিয়ন, প্লাটিনাম, প্যালেডিয়াম, রেডিয়াম বা বহু মূল্যবান প্রস্তুরাদিও এর অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া শর্তযুক্ত বা অবাধে আমদানিযোগ্য পণ্যও যদি জাহাজ, নৌযান, উড়োজাহাজ, ব্যাগেজ বা দেহের কোথাও লুকিয়ে পরিবহন করা হয়, অর্থাত্ আরোপনীয় যথাযথ শুল্ককর পরিশোধ ব্যতিরেকে আনা হয়, তাও চোরাচালান বলে গণ্য হবে।

 

কিভাবে সংঘটিত হয়

বলা বাহুল্য, চোরাচালান কখনো এককভাবে সংঘটিত হয় না; এর পেছনে একটি বিশেষ চক্র ক্রিয়াশীল থাকে। কেননা বিদেশ থেকে কোনো পণ্য চোরাচালানের মাধ্যমে আনতে গেলে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন পড়ে। এই অর্থ দেশের ভেতরের নানা উত্স থেকে হুন্ডি, পণ্য আমদানির নামে ওভার-ইনভয়েসিং, মিসডিক্লারেশন বা অন্যবিধ উপায়ে পাচার করা হয়। অর্থাত্ চোরাচালান কার্যক্রমের সঙ্গে অর্থপাচারের বিষয়টিও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। এই চক্রটি নানা কৌশলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজর এড়িয়ে বিদেশে টাকা পাচার করে। তারপর সেই পাচারকৃত অর্থ দিয়ে সোনা ও মাদকদ্রব্যসহ নানা পণ্য ক্যারিয়ার বা বাহকের মাধ্যমে দেশে নিয়ে আসে।

 

কোন কৌশলে চোরাচালান ধরে ফেলে কাস্টমস

প্রসঙ্গত প্রশ্ন ওঠে, কাস্টমস ডিপার্টমেন্ট এসব ক্ষেত্রে কিভাবে চোরাচালান নিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা করে! কী কৌশলে বড় বড় সোনার চালান ডিটেক্ট করে এবং তার হোতাদের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পায়! প্রথমেই রিজনাল ইনটেলিজেন্স লিয়াজোঁ অফিস বা (আরআইএলও) এর নাম উল্লেখ করতে হয়। এটি মূলত ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অর্গানাইজেশন বা ডাব্লিউসিওর একটি অঙ্গসংগঠন। যার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী জোরদার ‘কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলা হয়। এন্টি-স্মাগলিং কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে ডাব্লিউসিওর সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে মোট ছয়টি জোন বা অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। এই নেটওয়ার্ক দিয়ে মূলত বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে ক্রিয়াশীল চোরাচালানকারীদের অবস্থান ও মুভমেন্ট বিষয়ে ডাটাবেজ তৈরি ও সদস্য দেশগুলোর মাঝে এসব তথ্য এক্সচেঞ্জ করা হয়। ফলে অনেকটা আগেভাগেই তাদের গতিবিধির ওপর কঠোর নজরদারি করা সম্ভব হয়।

অর্থপাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত অপরাধীদের ধরতে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে রয়েছে ‘বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট’ বা বিএফআইইউ। বাংলাদেশ কাস্টমস এই সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে কাজ করে আসছে। ফলে সম্ভাব্য চোরাকারবারিতে ব্যবহূত অর্থ লেনেদেনের বিষয়টি সহজে আঁচ করা সম্ভব হয়।

 

‘উড়োফোন’ বলে কিছু উড়িয়ে দেওয়া হয় না

যদি বিমানবন্দরকেন্দ্রিক চোরাকারবারের কথা বলি, তাহলে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে হয়, এমন অনেক কেস দেখেছি যেখানে অজ্ঞাত সোর্স থেকে গোল্ডস্মাগলিং বা ফরেন কারেন্সি আনা-নেওয়ার আগাম খবর পাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে ‘উড়োফোন’ বলে কিছু উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই। আবার কখনো কখনো দৈবচয়নের ভিত্তিতে অ্যাডভান্স প্যাসেঞ্জার্স লিস্ট পর্যালোচনা করেও স্মাগলিংয়ের তথ্য পাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন পুলিশ আমাদের গমনাগমনসংক্রান্ত তথ্য দিয়ে হেল্প করে। কোনো ব্যক্তি অকারণ বারংবার একটি নির্দিষ্ট দেশ কেন সফর করছে, তার সেই ‘আপ অ্যান্ড ডাউন’ মুভমেন্টের তথ্য বিশ্লেষণ করেও চোরাচালানকারীর অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

 

নেওয়া হয় তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তা

ইদানীং সোনা আমদানির বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা জারি হওয়ায় একটি অংশ অন্তত গোল্ড-স্মাগলিং থেকে বিরত থাকবে বলে আশা করা যায়। তবে এই প্রবণতা একেবারে কমবে না, কারণ সোনাকে বলা হয় বিশ্বজনীন পণ্য। সোনা দিয়ে কেবল গয়না নয়, অবৈধ অর্থের লেনদেনও হয়ে থাকে। তাই একে বলা হয় ইজি মানি। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কাস্টমসের গোয়েন্দা বিভাগ আরআইএলও এবং বিএফআইইউর সমন্বয়ে একটি সমৃদ্ধ ও কার্যকর ডাটাবেজ বা তথ্যভাণ্ডার মজুদ করতে সক্ষম হয়েছে। এর ভিত্তিতে তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে সময়ে সময়ে অভিযান পরিচালনা করে আন্তর্দেশীয় চোরাচালানের গতিবিধি শনাক্ত করা সম্ভব হয়ে থাকে।

 

ধরা পড়া সোনা কোথায় যায়

আরেকটি প্রশ্ন অনেকটা এ রকম—চোরাচালানের সোনা ধরা পড়ার পর তা যায় কোথায়? সহজ প্রশ্নের সরল উত্তর। কোনো সোনার চালান আটক হওয়ার পর আসামি গ্রেপ্তার হোক বা না হোক, তখনই সেই সোনা অস্থায়ী ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা করা হয়। কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কখনই মূল্যবান সোনা নিজের হেফাজতে রাখে না। পরে মামলা হলে সোনার দাবিদার উপযুক্ত দলিলাদি দাখিল করে নিজের মালিকানা প্রমাণ করতে পারলে কোর্টের আদেশের মাধ্যমে তা ফেরত পেতে পারে। আর যদি মামলা না হয় বা দাবিদার মামলা করে হেরে যায়, তাহলে সেই সোনার চালান বিধি মোতাবেক রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হয় এবং স্থায়ীভাবে তা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা পড়ে। এ ক্ষেত্রে কাস্টমস বিভাগের কোনো দায় বা করণীয় কিছু থাকে না।

কাস্টমসের পোশাকের মূল বৈশিষ্ট্য

প্রথমবারের মতো ইউনিফর্ম বা দাপ্তরিক পোশাক পেলেন শুল্ক ও ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। হালকা জলপাই রঙের শার্ট ও গাঢ় জলপাই রঙের প্যান্ট এই ড্রেসের মূল বৈশিষ্ট্য। কমিশনার বা মহাপরিচালকদের শার্টে একটি ‘সোনালি দ্বার’ এবং মধ্যবর্তী অংশে সিলভার রঙের তিনটি ‘গৌরব তারকা’ থাকবে। অতিরিক্ত কমিশনারের শার্টে থাকবে একটি সোনালি দ্বার ও দুটি গৌরব তারকা, যুগ্ম কমিশনার বা যুগ্ম পরিচালকের শার্টে একটি সোনালি দ্বার ও একটি গৌরব তারকা, উপকমিশনারের শার্টে কেবল একটি সোনালি দ্বার থাকবে। সহকারী কমিশনারদের পোশাকে থাকবে শুধু তিনটি গৌরব তারকা, তবে কোনো সোনালি দ্বার তাতে থাকবে না। রাজস্ব কর্মকর্তা বা আরওদের শার্টে দুটি গৌরব তারকা এবং সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাদের শার্টে একটি গৌরব তারকা খচিত থাকবে। সাব-ইন্সপেক্টর ও সিপাহিরা মাথায় গাঢ় জলপাই রঙের ‘বেরেই’ ক্যাপ পরবেন, যার সামনে পৌনে দুই ইঞ্চি ব্যাসের পিতলের চাকতির ওপর কাস্টমস অ্যান্ড ভ্যাট বিভাগের লোগো সাঁটা থাকবে। তা ছাড়া কর্মকর্তাদের ইউনিফর্মে জর্জেট প্যাঁচ থাকবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা