kalerkantho

সোমবার । ২০ জানুয়ারি ২০২০। ৬ মাঘ ১৪২৬। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

নিম্নমানের গুঁড়া দুধ আমদানি এ খাতের বিকাশে প্রতিবন্ধক

দুধ সংগ্রহের প্রতিটি ধাপে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ করে মিল্ক ভিটা

শেখ নাদির হোসেন লিপু
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড (মিল্ক ভিটা)

ফারজানা লাবনী   

১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুধ সংগ্রহের প্রতিটি ধাপে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ করে মিল্ক ভিটা

ছবি : মঞ্জুরুল করিম

ভোক্তাদের নিরাপদ ও বিশুদ্ধ দুধ সরবরাহের পাশাপাশি দেশের দুগ্ধজাত পণ্যের মোট চাহিদার বড় অংশ সরবরাহ করছে মিল্ক ভিটা। কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেডের (মিল্ক ভিটা) চেয়ারম্যান শেখ নাদির হোসেন লিপু বলেন, প্রতিষ্ঠার চার দশক থেকে মিল্ক ভিটা ভেজালের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে আছে। কোনোভাবেই ভেজাল বিষয়ে আপস করেনি।

আমি মনে করি দুগ্ধ উৎপাদনকারী খামারিদের দুগ্ধ সমবায় সমিতি গঠনের মাধ্যমে নির্ভেজাল দুগ্ধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে উৎসাহী, উদ্বুদ্ধ ও প্রশিক্ষণ প্রদান করে সচেতন করতে হবে। এ ছাড়া দুধের ভেজাল রোধের জন্য ফড়িয়া ও দালালচক্রের দৌরাত্ম্য কমাতে হবে। দুধ ও দুগ্ধপণ্যের ভেজাল প্রদানকারী অসত্চক্রকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

একমাত্র মিল্ক ইউনিয়ন রেজিস্টার্ড সমিতি ও সদস্য ব্যতীত অন্য কোনো উৎস থেকে দুগ্ধ সংগ্রহ করে না। ফলে মিল্ক ভিটার দুগ্ধ সংগ্রহ থেকে প্রক্রিয়াজাত পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফলে সংস্থাটি স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য বাজারে সরবরাহ করে থাকে। তিনি বলেন, দুধের সমন্বিত দুগ্ধনীতি প্রণয়ন করা, খামার ও খামারি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক ভেজালবিরোধী অভিযান সচল রাখা, মাঠপর্যায়ে দুগ্ধ সংগ্রহে নিবিড় তত্ত্বাবধান, স্থানীয় প্রশাসন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রভৃতি সংস্থার সঙ্গে সমন্বিত পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

তিনি বলেন, মিল্ক ভিটা গবাদি পশুর চিকিৎসা শুধু নিজস্ব রেজিস্টার্ড প্রাণী চিকিৎসক দ্বারা সম্পন্ন করে থাকে। যার ফলে চিকিৎসাকৃত প্রাণী নিবিড় তত্ত্বাবধানে রাখা সম্ভব হয়। খামার পর্যায়ে সরেজমিন পরিদর্শনে খামারিদের প্রতিনিয়ত স্বাস্থ্যসম্মত দুগ্ধ দোহন ও সচেতনামূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়ে থাকে। মিল্ক ইউনিয়ন দুগ্ধ সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দুগ্ধ সংগ্রহ করে থাকে। এ ছাড়া মাঝে মধ্যেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিকমানের ল্যাব থেকে দুধে অ্যান্টিবায়োটিক ও বিভিন্ন ভারী ধাতু শনাক্তকরণের মাধ্যমে মিল্ক ইউনিয়ন দুধের মাননিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

তিনি বলেন, সারা দেশে দুধের চাহিদা ১৫০.২৯ লাখ টন, উৎপাদন ৯৪.০৬ লাখ টন, ঘাটতি ৫৬.২৩ লাখ টন। এর মধ্যে মিল্ক ইউনিয়ন পূরণ করছে ৫১.৪৩২ টন, মিল্ক ভিটার মার্কেট শেয়ার তরল দুধে ৪৬ শতাংশ, গুঁড়া দুধে ৬৫ শতাংশ এবং বাটারে ৭২ শতাংশ।

শেখ নাদির হোসেন লিপু বলেন, দেশের উদীয়মান ডেইরি খাতের সম্ভাবনা খুবই ভালো। এই খাতে বিনিয়োগ হাজার কোটি টাকার ওপরে। একদিকে যেমন আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেকারত্ব দূর হচ্ছে, অন্যদিকে দেশ দ্রুত দুগ্ধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা উচ্চশিক্ষিত বেকার যুবক, যুব মহিলা খামার তৈরিতে প্রচুর বিনিয়োগ করছেন। এ খাতের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে অধিক পরিমাণে নিম্নমানের গুঁড়া দুধ আমদানি করা। দানাদার গো-খাদ্যে উপাদানের ক্রয়মূল্য অধিক থাকা। গো চারণ ভূমির অভাব ও সবুজ ঘাস চাষের অপর্যাপ্ততা।

তিনি বলেন, দুধে ব্যাকটেরিয়া বা ক্ষতিকর উপাদান যাতে না থাকে এ জন্য প্রতিটি দুগ্ধ শীতলীকরণ কেন্দ্রে ব্যাপিড মিল্ক চিলার স্থাপন করেছি। খামার পর্যায়ে সাব-ক্লিনিক্যাল ম্যাসটাইটিস রোগ নির্ণয়ে বিভিন্ন টেস্ট আমরা করে থাকি। খামারের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে খামারিদের সচেতন করা হয়। খামার পর্যায়ে দুগ্ধ দোহন, দুগ্ধ উৎপাদন, পরিবহন, কারখানায় গ্রহণ বিষয়ে স্বাস্থ্যসম্মত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। পাস্তুরাইজেশনের পর দুধ সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ইউএইচটি মিল্ক তৈরির জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় খাতে একমাত্র মিল্ক ইউনিয়ন দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন করে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় মিল্ক ইউনিয়ন বৈচিত্র্যময় পণ্যসামগ্রী অতিসম্প্রতি বাজারেও এনেছে। যেমন : মাঠা, পনির, লাবাং, রসগোল্লা, প্যারা সন্দেশ, টোন্ড মিল্ক, ফ্লেভার্ড মিল্ক ইত্যাদি। এ ছাড়া বর্তমানে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মিল্ক ভিটা বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদনে সচেষ্ট রয়েছে।

শেখ নাদির হোসেন লিপু বলেন, মিল্ক ইউনিয়নে স্থায়ীভাবে এক হাজার ১২১ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী আছেন। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে ৭৬০ জন শ্রমিক-কর্মচারী চুক্তি ভিত্তিক হিসেবে আছেন। ৪৮টি চিলিং সেন্টার বর্তমানে চালু আছে এবং আরো ১৫টি চালু করার পরিকল্পনা আছে। বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুগ্ধ খামার সৃষ্টি, প্রাথমিক দুগ্ধ সমিতি ও দুগ্ধপণ্য বিপণন সমিতি গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ঢাকার বাইরে প্যাকেটজাত তরল দুধসহ অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্য সরবরাহের জন্য প্রতিটি চিলিং সেন্টারে সেলস কর্নার গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। উপযুক্ত সাপ্লাই চেইনের জন্য পরিবহন ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত রয়েছে। তবে পরিবহন ব্যবস্থা যুগোপযোগী করার জন্য মিল্ক ইউনিয়ন ইতিমধ্যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। খামারিদের ন্যায্য পাওনা নিয়ে তিনি বলেন, মিল্ক ইউনিয়ন সর্বদাই খামারির ন্যায্য মূল্য পরিশোধে সচেষ্ট রয়েছে। দুগ্ধ মূল্য পরিশোধে মিল্ক ইউনিয়ন দুধের ননির ওপর ভিত্তি করে দুগ্ধ মূল্য পরিশোধ করে থাকে। সমিতি পর্যায়ে দুধের মূল্য পরিশোধে দুধের মানভেদে দুগ্ধ মূল্য ২৮.৬৮ টাকা থেকে ৫৫.২৩ টাকা পর্যন্ত দিয়ে থাকে। এ ছাড়া দূরত্ব অনুসারেও দুগ্ধ পরিবহন খরচ প্রদান করা হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা