kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

রাজস্ব আদায়ের প্রধান খাত ভ্যাট

৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বেচাকেনায় ভ্যাট নেই

ফারজানা লাবনী   

৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রাজস্ব আদায়ের প্রধান খাত ভ্যাট

ছবি : শেখ হাসান

নব্বইয়ের দশকে এ দেশে ভ্যাট বা মূসক (মূল্য সংযোজন কর) ব্যবস্থা প্রচলন করা হয়। শুরু থেকেই ভ্যাট রাজস্ব আদায়ের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ক্রেতা পণ্য কিনতে গিয়ে মূল্যের সঙ্গে ভ্যাট পরিশোধ করে থাকে। উত্পাদনকারী, আমদানিকারক থেকে শুরু থেকে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা সবাইকে ভ্যাটের ক্ষেত্রে রেয়াত নেওয়ার সুবিধা দেওয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত পণ্য ভোগকারীর ওপর ভ্যাটের ভার পড়ে। অর্থাৎ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভোক্তাকেই ভ্যাট পরিশোধ করতে হয়।

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ভ্যাট রাজস্ব আদায়ের প্রধান খাত হিসেবে বিবেচিত। সবার জন্য সহনীয়ভাবে ভ্যাট আদায়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে। নতুন করে আরোপ নয়, ভ্যাটের জাল বিস্তারে জোর দেওয়া হয়েছে নতুন আইনে। অনলাইনভিত্তিক ভ্যাট আদায় আমাদের প্রধান লক্ষ্য। এতে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী উভয়ের সুবিধা হবে। আবার রাজস্ব আদায়ও বাড়বে।

ভ্যাট প্রদানে উৎসাহ দিতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রতিবছর ব্যাপক আয়োজনে ভ্যাট দিবস পালন করা হয়। এক বছরের জন্য সর্বোচ্চ ও দীর্ঘমেয়াদি ভ্যাট প্রদানকারীদের সম্মাননা দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষকে ভ্যাট প্রদানে উৎসাহ দিতে প্রতিবছরের মতো এবারেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সারা দেশে ১০ ডিসেম্বর জাতীয় ভ্যাট দিবস পালন করতে যাচ্ছে। ভ্যাট দিবস ও ভ্যাট সপ্তাহ উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

বিগত দিনের ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরেও ভ্যাট রাজস্ব আদায়ের প্রধান খাত। প্রতিবছরই ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৮৩ হাজার কোটি টাকা থেকে ৩২.৫৩ শতাংশ বাড়িয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ভ্যাট খাতে লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয় এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা আরো বাড়ানো হয়েছে।

প্রায় সাত বছর থেকে ভ্যাট আইন ২০১২ নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিরোধ ছিল সরকারের। আইনটির কিছু ধারা সংশোধনে ব্যবসায়ীরা দাবি জানান। বিগত দিনে বিষয়টি আমলে না আনলেও চলতি বছর বিষয়টি বিবেচনায় এনে বহু আলোচিত ভ্যাট আইন ২০১২ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভ্যাট আইন ২০১২ তে কিছুটা সংশোধন করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর আ হ ম মুস্তফা কামাল ভ্যাট আইন ২০১২ সম্পর্কিত ব্যবসায়ীদের দাবি নিয়ে গত ৩১ মার্চ দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সঙ্গে আলোচনায় বসেন। ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে একক হারের পরিবর্তে একাধিক হার, ভ্যাট অব্যাহতির সীমা ৩৬ লাখ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৫০ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়। চলতিবারে ভ্যাটের হার ৫ শতাংশ, ৭.৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ এবং ১৫ শতাংশ করা হয়। এর বাইরে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান শূন্য হারে ভ্যাট দেওয়ার সুযোগ পায়। ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিলে রেয়াত নেওয়ার সুবিধা পায়। চলতি অর্থবছরে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বেচাকেনায় একজন ব্যবসায়ীকে ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে না।

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তাঁর বাজেট বক্তৃতায় বলেছিলেন, সারা দেশে ভ্যাট প্রদানে সক্ষম প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। অথচ এনবিআরের হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এনবিআরে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা গড়ে সাড়ে ৭ লাখ। এর মধ্যে রিটার্ন দাখিল করছে গড়ে ৩২ হাজার। মোট ভ্যাটের ৫৬ শতাংশ পরিশোধ করছে মাত্র ১৫৭ প্রতিষ্ঠান।

বড় মাপের ১৫৭ প্রতিষ্ঠান প্রত্যেকটি বৃহৎ করদাতা ইউনিট (ভ্যাট) এলটিইউ-এর আওতায় রাজস্ব পরিশোধ করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভ্যাট পরিশোধ করছে সিগারেট, মোবাইল, কোমল পানীয়, ওষুধ, সিমেন্ট, ব্যাংক, সিরামিক, টয়লেট সোপ ও প্রাকৃতিক গ্যাস খাতের প্রতিষ্ঠান।

এনবিআরে সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশব্যাপী লাখ লাখ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট প্রদানে সক্ষম হলেও কৌশলে ফাঁকি দিচ্ছে। ভ্যাটের জাল বাড়ানো সম্ভব হলে আদায় বাড়বে।’

ক্রেতা পণ্যের মূল্যের সঙ্গে হিসাব কষে ভ্যাট প্রদান করলেও অনেক সময় সঠিক হিসাবে আদায় হয় না। বছরের পর বছর ভ্যাট ফাঁকির মহোৎসব চললেও এনবিআরের লোকবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাবে নজরদারি সম্ভব হয়নি। এ পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে অনলাইনভিত্তিক ভ্যাট ব্যবস্থায় জোর দিয়েছে এনবিআর।

ভ্যাট আইন ২০১২ বাস্তবায়নের শর্ত হিসেবে প্রত্যেক বিক্রয় কেন্দ্রে ইএফডি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন নিয়ে আমদানি-রপ্তানিসংক্রান্ত সব কাজ অনলাইনে সম্পন্ন করতে নির্দেশ দিয়েছে। ইএফডি ব্যবহার করা হলে ভ্যাট আদায়ে স্বচ্ছতা আসবে। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী অর্থবছরে আবাসিক হোটেল, রেস্তোরাঁ, ফাস্টফুডের দোকান, মিষ্টির দোকান, আসবাবপত্রের বিক্রয় কেন্দ্র, পোশাক বিক্রির কেন্দ্র, বুটিক শপ, বিউটি পার্লার, ফ্রিজ, টেলিভিশন, মোবাইল ও মোবাইলের যন্ত্রাংশ বিক্রির দোকান, গৃহস্থালি সামগ্রী বিক্রি কেন্দ্র, অলংকার বিক্রি কেন্দ্রসহ আরো ১১টি অধিক ব্যবহৃত খাতে ‘ইএফডি’ যন্ত্র ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে। এসব খাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে পর্যায়ক্রমে ইএফডি সরবরাহ করা হবে। ব্যবহারকারীকে ইএফডি কিস্তিতেও কেনার সুযোগ দেওয়া হবে। ইএফডি যন্ত্র ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের বেচাকেনা, ভ্যাট পরিশোধের তথ্য এনবিআর কর্মকর্তারা অফিসে বসেই জানতে পারবেন। এক মাসের ভ্যাট পরের মাসের নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে পরিশোধ না করলে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বসে রাজস্ব কর্মকর্তারা ইএফডি যন্ত্রের মাধ্যমে অনলাইনে পরিশোধের সুযোগ স্থগিত করে দিতে পারবে। ভ্যাট পরিশোধের নির্দিষ্ট সময়ের এক মিনিট পরও অনলাইনে ভ্যাট পরিশোধ করতে পারবে না। এসব যন্ত্র ভ্যাট অনলাইন কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবে। এ যন্ত্র ব্যবহারে ইন্টারনেট প্রয়োজন হবে। তাই এনবিআরসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দপ্তরে বসেই এসব যন্ত্র কার্যকর বা অকার্যকর করতে পারবেন। ইএফডি যন্ত্রের বিপরীতে বিআইএন নম্বর দেওয়া হবে। একই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে একাধিক যন্ত্র থাকলেও বিআইএন একটিই হবে। তবে প্রত্যেক যন্ত্রের জন্য এনবিআর থেকে বিশেষ কোড দেওয়া হবে। এই সংখ্যা উল্লেখ করে পরিশোধের রসিদ লেনদেন করা হবে। এসব যন্ত্র ঠিকমতো কাজ করছে কি না বা সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না তা দেখভালে ৫০০ জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

অনলাইনে ভ্যাট আদায়ে হেল্প ডেস্ক, কল সেন্টার, মোবাইল অ্যাপসসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। অনলাইনে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের আমদানি-রপ্তানি সম্পর্কিত সব তথ্যও এনবিআর প্রয়োজনে অনলাইনে দেখতে পারবে। ভ্যাট আইন ২০১২ অনুসারে অনলাইনে ভ্যাট পরিশোধকারী প্রতিষ্ঠান এক মাসের ভ্যাট পরের মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অনলাইনে যুক্ত কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এক মাসের ভ্যাট পরের মাসের ১৬ তারিখে পরিশোধের সুযোগ পাবে না। এনবিআরসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রয়োজনে ওই প্রতিষ্ঠানের অনলাইনের পরিচালিত আমদানি-রপ্তানি, বেচাকেনাসহ সব কার্যক্রম বন্ধ (ব্লক) করে দিতে পারবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা