kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

আয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সোনার চাহিদা

আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে দেশে দাম বেশি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সোনার চাহিদা

ছবি : শেখ হাসান

বহুল প্রচলিত প্রবাদ ‘সোনার হাতে সোনার কাঁকন, কে কার অলংকার’। সোনা যেন এ দেশের প্রকৃতিসুন্দর নারীদের রূপ-লাবণ্যকে আরেক ধাপ বাড়িয়ে দেয়। তাই সাজসজ্জার উপকরণ, উত্সব উপহার কিংবা আপত্কালীন সম্পদ হিসেবে বাংলাদেশের নারীদের কাছে সোনার চাহিদা ঐতিহ্যগতভাবেই। ফলে উচ্চমূল্যের বাজারেও সোনা ব্যবহারে আগ্রহের কমতি নেই। দেশীয় জুয়েলারির পাশাপাশি সাধ্য অনুযায়ী বিদেশ থেকেও সোনার গহনা আমদানি করেন অনেকে।

জানা যায়, বিশ্ববাজারের তুলনায় দেশে সোনার দাম বেশি। এ কারণেই বিদেশ থেকে সোনা আনার প্রবণতা বেশি। নীতিমালা না থাকায় সোনার ব্যবসা থাকলেও এত দিন তা ছিল অনেকটাই অসংগঠিত। সম্প্রতি নীতিমালা হওয়ায় বাজারে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা চলছে। অবৈধ সোনা বৈধ করার সুযোগ দেওয়ার ফলে অনেক ব্যবসায়ীই হিসাবের মধ্যে এসেছেন। তবে ভবিষ্যতে ক্রেতা ধরে রাখতে আরো আধুনিক মানের গয়না তৈরি ও দামের বিষয়ে সচেতন হতে হবে বলে মনে করছেন দেশের সোনা ব্যবসায়ীরা।

স্বর্ণ নীতিমালার তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে প্রতিবছর দেশে ২০ থেকে ৪০ মেট্রিক টন সোনার চাহিদা তৈরি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, মানুষের আয় ও ক্রয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়েই বাড়ছে মূল্যবান এ ধাতুর চাহিদা। সাজসজ্জার পাশাপাশি দ্রুত নগদ অর্থে রূপান্তর, আপত্কালীন সঞ্চয় হিসেবেও সোনা জনপ্রিয়। তবে ব্যবসায়ীদের কোনো ধরনের গবেষণা না থাকার কারণে প্রতিবছর সোনার বাজার ঠিক কী পরিমাণে বড় হচ্ছে তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। ২০১৮ সালে স্বর্ণ নীতিমালা হওয়ার আগ পর্যন্ত বৈধভাবে সোনা আমদানি হয়নি। যে কারণে বেচা-বিক্রির হিসাবটাও ছিল লুকোচুরির মধ্যে। তবে বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিবছর তিন-চার হাজার ভরি সোনা বেচাকেনা হয়।

এদিকে বিশ্ববাজারে অস্থিরতার কারণে দেশে সোনার দাম বেশ চড়া। সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনা কিনতে গ্রাহককে ৫৬ হাজার ৮৬২ টাকা খরচ করতে হচ্ছে। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার জন্য গুনতে হচ্ছে ৫৪ হাজার ৫২৯ টাকা। ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনা বিক্রি হচ্ছে ৪৯ হাজার ৫১৩ টাকা। তবে সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনা কিনতে ২৯ হাজার ১৬০ টাকা হলেই চলবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিশ্ববাজারের সঙ্গে তুলনা করে দাম নির্ধারণ করা হলেও দেশে সব সময়ই সোনার দাম বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি থাকে।

গত সপ্তাহে বিশ্ববাজারে স্পট সোনার দাম ছিল আউন্সপ্রতি এক হাজার ৪৬২ ডলার, যুক্তরাষ্ট্রের সোনার দাম এক হাজার ৪৬৩ ডলার। বাণিজ্যযুদ্ধের উত্তাপে গত আগস্টে দাম এক হাজার ৫০০ ডলারও ছাড়িয়েছিল, যদিও পরে কিছুটা কমে আসে। বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং ইকোনমিকসের হিসাব অনুযায়ী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় গত এক বছরে বিশ্ববাজারে সোনার দাম বেড়েছে ২১ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের এক পূর্বাভাসে বলা হয়, আগামী বছর সোনার দাম বেড়ে প্রতি আউন্স এক হাজার ৬০০ ডলার হবে।

দেশে সোনার অলংকারের বড় বাজার রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মার্কেট। সেখানে ১১০টি জুয়েলার্স আছে। তারা বলছে, বিশ্ববাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে দেশে সোনার দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় ক্রয়াদেশ কমেছে। ক্রেতারা প্রতিদিনই সোনার দাম জানতে ফোন করছে। তবে সে অনুযায়ী ক্রয়াদেশ আসছে না।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সোনার দাম কমানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা এ দেশে কারিগরদের মজুরি অতিরিক্ত। প্রচুর দক্ষ কারিগর থাকার পরও তাঁদের পুরোপুরি ব্যবহার করার মতো সক্ষমতা বাংলাদেশের হয়নি। যে কারণে কারিগরদের ৩০-৩৫ শতাংশ সপ্তাহের বেশির ভাগ সময়ই কলকাতায় গিয়ে কাজ করে আসে। বাংলাদেশে প্রতি ভরিতে ১২ শতাংশ হারে কারিগরদের মজুরি দেওয়া হয়। যেখানে ভারতে কারিগররা নেয় ৬ শতাংশ হারে।

বাজুসের সভাপতি এনামুল হক খান দোলন বলেন, ‘স্থানীয় বাজারে সোনার দাম বেশি হওয়ার কারণ আমরা এখনো আন্তর্জাতিক দামে কোনো সোনা আমদানি করতে পারি না। এখন নীতিমালা হয়েছে, আমদানির জন্য দ্রুতই ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, ‘হাজার হাজার কারিগর কলকাতায় গিয়ে কাজ করছে। যাদের তৈরি করা গয়না ভারত রপ্তানি করছে। আমাদের এখন নীতিমালা হয়েছে। আমরাও এখন রপ্তানির লক্ষ্যে কাজ শুরু করছি। এতে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে তেমনি আমাদের কারিগরদেরও যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাবে।’

বাজুসের সাধারণ সম্পাদক  দিলীপ কুমার আগারওয়ালা বলেন, দেশের সোনা ব্যবসায়ীরা ৪৮ বছর পর একটি নীতিমালা পেয়েছে। এই নীতিমালার ফলে কিছুটা হলেও এই খাতের ব্যবসায়ীদের চাহিদা পূরণ করেছে সরকার। ২০১৮ সালের নীতিমালার পর ২০১৯ সালের জুলাই মাসে ‘স্বর্ণ আয়কর মেলা’ হয়। ওই মেলায় ব্যবসায়ীরা ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার খুবই ব্যবসাবান্ধব। বিদেশি বিনিয়োগ উত্সাহী করার জন্য সারা দেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করেছে। ব্যাংকঋণের হারেও ইতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছে। সে ক্ষেত্রে জুয়েলারি শিল্পের জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করে জমি বরাদ্দ ও অবকাঠামো নির্মাণে সাহায্য করতে হবে এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা ও সহজে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে জুয়েলারি শিল্পের জন্য করা নীতিমালা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া। যাতে এই খাতের ব্যবসায়ীরা নিরাপদে ও সহজে এ ব্যবসার প্রসার ঘটাতে পারেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা