kalerkantho

সোমবার। ২৭ জানুয়ারি ২০২০। ১৩ মাঘ ১৪২৬। ৩০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

বিশ্বমানের সোনার অলংকার তৈরি হচ্ছে যশোরে

ফখরে আলম, যশোর   

২০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




বিশ্বমানের সোনার অলংকার

তৈরি হচ্ছে যশোরে

যশোরের একটি কারখানায় গয়না তৈরি করছেন কারিগররা। ছবি : কালের কণ্ঠ

আনা-রতি, বাকনল, মোমের প্রদীপ সব স্মৃতি হয়ে গেছে। স্বর্ণশিল্পে আধুনিক প্রযুক্তির আগমন ঘটেছে। এর ফলে মফস্বল শহর যশোরেও তৈরি হচ্ছে বিশ্বমানের সোনার অলংকার। কম খরচে, কম সময়ে তৈরি এই গয়নার অপার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এই গয়না বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

যশোর শহরের সোনাপট্টি ঘুরে স্বর্ণশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সনাতন সোনার কারবার একরকম বন্ধ হয়ে গেছে। চিরচেনা শত বছরের গয়না তৈরির সনাতন পদ্ধতিরও মৃত্যু ঘটেছে। এখন অনলাইন থেকে ডিজাইন নামিয়ে নানা ধরনের অত্যাধুনিক মেশিনের সাহায্যে তৈরি করা হচ্ছে নজরকাড়া সব গয়না। সোনাপট্টির ২২৫টি সোনার দোকানের সবটিতেই গয়না তৈরিতে যন্ত্রের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। আনা-রতির বদলে গ্রাম ও সনাতন সোনার বদলে ক্যারেট সোনার আবির্ভাব ঘটেছে। পাশাপাশি এই শিল্পে কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এর ফলে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

সরেজমিনে সোনাপট্টি ঘুরে দেখা গেছে, ডিজিটাল পদ্ধতিতে গয়নার ডিজাইন করা হচ্ছে। ছিলা মেশিন দিয়ে গয়নার ওপর নানা রকম কারুকাজ করা হচ্ছে। রোরাল মেশিনের সাহায্যে তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন গয়নার তার। পলিশ মেশিন দিয়ে তৈরীকৃত অলংকার চকচকে করা হচ্ছে। স্বর্ণশিল্পে ডিজিটাল প্রযুক্তিরও আবির্ভাব ঘটেছে। সোনার অলংকারের মান নির্ণয়ে হল মার্ক করা হচ্ছে। ডিজিটাল প্রেস কাটাই মেশিন দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে অত্যাধুনিক সব ডিজাইন করা হচ্ছে।

ব্রিটিশ ভারতের প্রথম জেলা যশোরের সোনার কারবারের অতীত ঐতিহ্য রয়েছে। ভারতের পাশের এ জেলায় সোনার গয়নার ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি বলে এখানে অনেক সোনার অলংকারের দোকান গড়ে উঠেছে। বর্তমানে অনেক বড় এলাকাজুড়ে শহরের এই সোনাপট্টিতে ২২৫টি ছোট-বড় সোনার দোকান রয়েছে। জেলায় রয়েছে ৫০০টি দোকান। বিদেশি বলে কম ওজনের যেসব শিকল চেন, পাতি চেন, পাক চেন বিক্রি হচ্ছে, তা যশোরেই তৈরি।

কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, আগের মতো মাটিতে বসে নয়, কারিগররা চেয়ার-টেবিলে বসে আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে গয়না তৈরির কাজ করছেন। যন্ত্রের সাহায্যে গয়নার কাঠামো দাঁড় করানোর পর কারিগররা গ্যাস ল্যাম্পের সাহায্যে কম সময়ের মধ্যে ‘সেটিং’ করে গয়নার কাজ শেষ করছেন। যশোর সদর উপজেলার শেখহাটি গ্রামের হারাধন রায় (৫০) দীর্ঘ ৩০ বছর সোনার অলংকার তৈরি করছেন। তিনি হাতের রুলি, বালা তৈরির বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘আগে দুই ভরি ওজনের সোনা দিয়ে যে গয়না তৈরি করেছি এখন যন্ত্রের সাহায্যে এক ভরি সোনা দিয়ে তার চেয়ে অনেক সুন্দর ডিজাইনের নজরকাড়া গয়না তৈরি করছি।’ শহরের বেজপাড়ার বিদ্যুৎ কুমার (৪২) ২৮ বছর ধরে গয়না তৈরি করছেন। তিনি বলেন, ‘আগে বাকনলের সাহায্যে মোমের প্রদীপে ফুঁ দিয়ে সোনা নরম করেছি। এখন গ্যাস ল্যাম্প দিয়ে সোনার কাজ করছি আগের চেয়ে অনেক কম সময়ে।’

সোনাপট্টির অন্যতম বৃহৎ সোনার দোকান ‘চৌধুরী গোল্ড’-এর বিক্রয়কর্মী আব্দুল হালিম বলেন, ‘এখন বিশ্বমানের নানা ধরনের গয়না আমাদের এখানে তৈরি হচ্ছে। ব্যবসায়ী, চাকরিজীবীরা বেশি সোনার অলংকার কিনছেন। বিয়ে, খতনা, জন্মদিন, মুখেভাতসহ বিভিন্ন পালা-পার্বণে গয়না বিক্রি হচ্ছে।’ যশোর শহরের বেজপাড়া এলাকার গৃহবধূ আফরোজা সুলতানা বলেন, ‘সোনার অলংকারের প্রতি আমার খুব আকর্ষণ রয়েছে। কিন্তু দাম বাড়ার কারণে ইচ্ছামতো গয়না কিনতে পারি না।’ বেজপাড়া এলাকার গৃহবধূ সুমি কুণ্ডু বলেন, ‘আমাদের মধ্যে বিয়েতে মেয়েকে সোনা উপহার দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। আমার শিশুকন্যাকে আত্মীয়-পরিজন বেশ কিছু সোনার অলংকার উপহার দিয়েছে।’

সঞ্জয় চৌধুরী

সভাপতি, বাংলাদেশ জুয়েলারি মালিক সমিতি, যশোর

সোনার ব্যবসার সঙ্গে ২৮ বছর ধরে যুক্ত বাংলাদেশ জুয়েলারি মালিক সমিতির যশোর জেলা শাখার সভাপতি সঞ্জয় চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে আমরা এখন বিশ্বমানের গয়না তৈরি করছি। আমাদের এখানে সস্তায় শ্রমিক পাওয়া যায়। এ জন্য আমরা কম মজুরিতে বিশ্বমানের গয়না তৈরি করতে পারছি। ভারতে ১০ গ্রাম ওজনের গয়না তৈরির মজুরি আট হাজার টাকা, মালেশিয়ায় ১০ হাজার টাকা, দুবাইয়ে ১৫ হাজার টাকা। কিন্তু এখানে মজুরি পাঁচ-ছয় হাজার টাকা। যে কারণে আমরা কম দামে গয়না বিক্রি করতে পারছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা সহজে সোনা আমদানি ও গয়না রপ্তানির দাবি জানাচ্ছি। দেশে কোনো জুয়েলারি নীতিমালা নেই। বৈধভাবে সোনা ও সোনার অলংকার বিক্রির স্বার্থে একটি নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। সোনার অলংকার তৈরির সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের ঋণ প্রদানের পাশাপাশি তিনি গয়না তৈরির জন্য শহরসংলগ্ন এলাকায় জমি বরাদ্দেরও দাবি জানান। তিনি বলেন, কিছুদিন আগে শহরে একটি সোনার দোকানে ডাকাতি হয়েছে। একটি দোকানে দুর্ধর্ষ চুরি হয়েছে। আমরা সব সোনার দোকানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা