kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

পোশাকের পরই সম্ভাবনাময় খাত হবে সোনা

ডা. দিলীপ রায়, চেয়ারম্যান, গ্রামীণ জুয়েলার্স

জিয়াদুল ইসলাম   

২০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পোশাকের পরই সম্ভাবনাময় খাত হবে সোনা

বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বাজারে সোনার দাম অনেক বেশি। এতে মন্দাভাব যাচ্ছে বাজারে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জুয়েলারি সমিতির দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্বর্ণ খাতের জন্য যে নীতিমালা দিয়েছেন, সেটি বাস্তবায়ন হলে সবাই নিয়ম-নীতির মধ্যে ব্যবসা করবে। ব্যবসায়ীদের ভয়-ভীতি দূর হবে। সোনার বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। জুয়েলারি শিল্প তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে। বৈধ আমদানি শুরু হলে আগামীতে দেশের চাহিদা মিটিয়ে আমাদের তৈরি অলংকার বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির (বাজুস) সাবেক সভাপতি ও গ্রামীণ জুয়েলার্সের চেয়ারম্যান ডা. দিলীপ রায় একান্ত সাক্ষাত্কারে কালের কণ্ঠকে এসব কথা বলেন।

দিলীপ রায় বলেন, ‘আমাদের দেশে সোনার একটা ঐতিহ্য রয়েছে। আমাদের সংস্কৃতি, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানসহ বাঙালি জাতির প্রত্যেকটি পর্বেই সোনার প্রয়োজন হয় এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সবাই এটি ক্রয় করে থাকে। কিন্তু নীতিমালা না থাকার কারণে সোনাশিল্পের কারিগরদের আমরা ঠিকমতো কাজ দিতে পারিনি। ফলে আমাদের অনেক কারিগর বিদেশে চলে গেছে। তারা সেখানে ভালো ভালো ডিজাইনের অলংকার তৈরি করছে।

দেশে বৈধভাবে সোনা আমদানির অনুমতি নেই। তাহলে কিভাবে চাহিদা পূরণ হচ্ছিল—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশে বৈধভাবে সোনা আমদানি হয় না—এ বক্তব্যের সঙ্গে আমি একমত নই। হয়তো ডিলারের মাধ্যমে আমদানি হয় না। কিন্তু ব্যাগেজ রুলস তো চালু আছে। বিদ্যমান ব্যাগেজ রুলসের আওতায় আমাদের শ্রমজীবীরা দেশে আসার সময় সোনা নিয়ে আসে। ওই সোনার সবটাই তারা ব্যবহার করে না, প্রয়োজনের অতিরিক্ত অংশ জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে। দেশের সোনার চাহিদা মেটানোর এটা অন্যতম উত্স। আরেকটা উত্স হলো রি-সাইক্লিন সোনা। অর্থাৎ আমার-আপনার ব্যবহূত সোনা, যেটা ফেরত দেওয়া হয়, সেই অংশটাকে আমরা রিফাইন করে খাঁটি সোনায় পরিণত করে অলংকার তৈরি করি। স্বর্ণ নীতিমালার আওতায় বৈধভাবে সোনা আমদানি শুরু হলে, আমদানি সোনা দিয়েই এই চাহিদা মেটানো হবে।

চোরাচালানের মাধ্যমে আসা সোনার অবৈধ কারবার নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশে অবৈধভাবে সোনা আসছে এবং তা কেনাবেচাও হয়—এটা বাস্তব কথা। তবে এর সঙ্গে প্রকৃত জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা জড়িত নয়। এই চক্র অনেক আগে থেকেই তত্পর রয়েছে। বিগত ১০-২০ বছরের পরিসংখ্যান নিয়ে দেখবেন, ওই সময় পর্যন্ত শুল্ক গোয়েন্দা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে যত সোনা ধরা পড়েছে, সেখানে কিন্তু কোনো জুয়েলারি ব্যবসায়ীকে পাইনি। আমরা যারা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী রয়েছি, তারা সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত এ রকম কোনো তথ্য-প্রমাণ মেলেনি। যদি কেউ প্রকৃতপক্ষেই জড়িত থাকত, তবে একজন না একজন ধরা পড়ত। তার মানে এর সঙ্গে একটা মাফিয়াচক্র জড়িত। তিনি বলেন, সোনা বহন করা খুব সহজ, অল্প জিনিসে অনেক টাকা হয়, দেখা যায় এই দেশ থেকে সোনা নিয়ে অন্য দেশে বিক্রি করে। বাংলাদেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিনিময়ে ড্রাগ আসে, হেরোইন আসে, গরু আসে ইত্যাদি। এটাও এক ধরনের মানি লন্ডারিংয়ের মধ্যে পড়ে। তবে বর্তমান সরকারের সময় প্রচুর সোনা ধরাও পড়ছে। তার মানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

দেশে বৈধভাবে সোনা আমদানি না হলেও আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দাম বাড়ানো-কমানোর যৌক্তিকতা নিয়ে তিনি বলেন, ব্যাগেস রুলসের আওতায় দেশে যে সোনা আসে, সেটা বিদেশ থেকে আন্তর্জাতিক দামেই কিনে আনা হয়। যখন দেশের বাজারে ওই সোনা কেনাবেচা হবে সে ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক দামই অনুসরণ করা হয়। এ জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সংগতি রেখে দেশের বাজারে সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের বাজারে বাড়ানো হয়, আবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশের বাজারে কমানো হয়। এটা সমন্বয় না করলে দেশের সোনা অন্য দেশে পাচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী দেশে আমাদের তুলনায় দাম বেশি হলে সোনা পাচারের ঘটনা ঘটে।

দেশে সোনার দাম তুলনামূলক বেশি। এই উচ্চমূল্যের বাজার সম্প্রসারণ কতটা সম্ভব জানতে চাইলে তিনি বলেন, সোনার দাম বেশি হলে বাজার সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয়। কারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে দাম থাকলেই সোনার চাহিদা বাড়ে। আজকে যদি দাম কম হয়, তবে আমি আমার ছেলে-মেয়ের বিয়েতে ১০ ভরির একটা চেইন দেব। আর যদি দাম বেশি হয়ে যায় তখন আমি ১০ ভরি না দিয়ে ৬ ভরির চেইন দেব। অর্থাৎ যখন বাজার স্থিতিশীল থাকে বা দাম কমের দিকে যায়, তখন ক্রেতারও ক্রয় ক্ষমতা বেড়ে যায়। এভাবে দামের সঙ্গে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ে-কমে।

পার্শ্ববর্তী দেশে আমাদের চেয়ে দাম কম কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের ভ্যাট বেশি দিতে হয়, তাই দাম একটু বেশি। কিন্তু পার্শ্ববর্তী দেশে ভ্যাট কম, তাই দামও কম। অর্থাৎ ভ্যাট-ট্যাক্সের কারণে দামের পার্থক্য তৈরি হয়।’

স্বর্ণ খাতে ভ্যাট নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে ভ্যাট ১ শতাংশ। কিন্তু আমরা ৫ শতাংশ দিচ্ছি। স্বাভাবিক কারণে আমাদের মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ-মধ্যবিত্তরা পার্শ্ববর্তী দেশে গিয়ে মার্কেটিং করে আসছে। এতে আমরা ক্রেতা হারাচ্ছি। আমি মনে করি স্বর্ণ নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে এবং এ খাতে ভ্যাট-ট্যাক্স জুয়েলার্স সমিতির প্রস্তাবনা অনুযায়ী হলে স্বর্ণশিল্প তার হারানো ঐতিহ্য আবার ফিরে পাবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা