kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেছে প্রামাণিক জুয়েলার্স

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

২০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেছে প্রামাণিক জুয়েলার্স

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের আগেই নগরীর মালোপাড়া এলাকায় স্বর্ণালংকারের ব্যবসা শুরু করেছিলেন রাজশাহীর নিত্যানন্দ প্রামাণিক। সে সময় ছোট একটি টেবিল, একটি গদি আর একটি সিন্দুকের মাধ্যমে নগরীর মালোপাড়া এলাকায় ব্যবসায় পরিচালনা করতেন নিত্যানন্দ প্রামাণিক ও তাঁর ঠাকুর-কাকারা। এর পর থেকে ধীরে ধীরে প্রসার ঘটে তাঁদের ব্যবসায়। সে সময় ব্যবসায়ের মূল গ্রাহক ছিলেন কৃষক শ্রেণি। কৃষকরা জমির নতুন ধান বিক্রি করে সে অর্থ চুরি বা লুট হওয়ার ভয়ে অলংকার বানাতেন। আবার নতুন ফলনের জন্য সে সোনা ফের বিক্রি করতেন। এভাবেই ক্রমাগত ব্যবসার প্রসার ঘটান নিত্যানন্দ প্রামাণিক।

তারপর এ ব্যবসার হাল ধরেন ছেলে রসময় প্রামাণিক। এরপর স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সবাই যে যার মতো দেশ ত্যাগ করে অথবা নিরাপদে আশ্রয় নেয়। যুদ্ধের পর শখের দোকান ‘প্রামাণিক জুয়েলার্সে’ এসে রসময় প্রামাণিক দেখেন, দোকানটি পুরোই ভেঙে চৌচির হয়ে আছে। নেই সিন্দুকের গয়নাগাঁটিও। ফলে ব্যবসাও গুটিয়ে ফেলতে হয় তাঁকে। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে কিছুদিন পরে মারাও যান তিনি। রসময় প্রামাণিকের মৃত্যুর পর প্রামাণিক জুয়েলার্সের দায়িত্ব নেন ছেলে শংকর প্রসাদ প্রামাণিক। তিনি তাঁর বাবার হারানো ব্যবসাকে ফের চালু করেন। বাড়ি থেকে মহিলাদের সোনার অলংকারগুলো নিয়ে আসেন। এরপর সেই অলংকারকে পুঁজি করে নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করেন। তত দিনে এই অঞ্চলে সোনার ব্যবসার প্রসার ঘটে। প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। একপর্যায়ে শংকর প্রসাদ প্রামাণিকের মৃত্যু হয় ১৯৯২ সালের ৯ ডিসেম্বর। মৃত্যুকালে রেখে যান সাত ছেলে। এর মধ্যে সুকুমর প্রামাণিক, রবীন্দ্রনাথ প্রামাণিক এবং সত্যজিৎ প্রামাণিক তিনজন প্রামাণিক জুয়েলার্সের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন।

সুকুমর প্রামাণিকের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘এই জুয়েলারি ব্যবসা আমাদের পূর্বপুরুষেরা করে গেছেন। তাঁদের পরম্পরা আর সুনাম ধরে রাখার জন্য আমরা এখনো এই ব্যবসা করে যাচ্ছি। ৯২ সালের আগে রাজশাহীতে কোনো সোনার দোকানে এসি ছিল না। আমরাই প্রথম সোনার দোকানে ডেকোরেশন করি। আমরাই সোনার তৈরি বিভিন্ন গহনা সাজানোর ব্যবস্থা করি।’

সুকুমর প্রামাণিক বলেন, ‘আগে কৃষকরাই ছিলেন এ ব্যবসার মূল গ্রাহক। সে সময় কৃষকরা জমির ফসল ফলিয়ে গহনা বানাত আবার গহনা বিক্রি করে ফসল ফলাত। বলা যায় সোনার সঙ্গে জমির অন্তর্বর্তী লেনদেন সম্পন্ন হতো। বিশেষ করে ধানকে সোনার সঙ্গেই তুলনা করা হতো। আগে বিয়ের জন্য মেয়েকে সোনা দিয়ে বাসায় আনতে হতো। যার ফলে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় অনেক আগে থেকেই মেয়ের জন্য গহনা তৈরি করার প্রয়োজন পড়ত। সে সময় কারিগররা সোনার তৈরি মাকড়ি, হাঁসুলি, তাবিজ, পদক, কাটাই মালা, নকশী মালা, কানের মাকুলি, ঘটি দুল, পায়ের তোড়া, নোলক, মন ইত্যাদি তৈরি করত। কিন্তু আধুনিকতার ছোঁয়ায় এসব জিনিস এখন হারিয়ে গেছে। মানুষের রুচি ও চোখের চাহিদার ভিন্নতায় নিত্যনতুন ডিজাইন দিয়ে তৈরি হচ্ছে অলংকার। আর আধুনিকতার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে চাহিদা বাড়ছে সোনার। সেই সঙ্গে নিজেই জুয়েলারি ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন অনেক কারিগররা। যদিও আগে একটি দোকানে প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন কারিগর কাজ করতেন। কিন্তু বর্তমানে কারিগররা ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে নিজেরা বিভিন্ন দোকানের অর্ডার নিয়ে তা তৈরি করছেন। ফলে এখন কারিগরের সংকট চলছে বেশ।’

সোনার মূল্যবৃদ্ধি, আধুনিক ইমিটেশন জুয়েলারির আগমন আর সোনা ব্যবসার প্রসারতার কারণে আগের মতো ব্যবসা ভালো নেই বলেও জানান তিনি। প্রতিযোগিতার বাজারে যারা বিশ্বাসযোগ্য তাদের ব্যবসা এখনো টিকে আছে। এ কারণে আগের চেয়ে এখন কিছুটা ভাটা থাকলেও সততা আর সুনামের কারণে বংশপরম্পরায় এগিয়ে যাচ্ছে রাজশাহীর এই ঐতিহ্যবাহী ‘প্রামাণিক জুয়েলার্স’।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা