kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

বিশ্লেষণ

করের সক্ষমতা বাড়লেও আদায় কম

ফারুক মেহেদী   

১৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করের সক্ষমতা বাড়লেও আদায় কম

রূপান্তরপর্বে বাংলাদেশের অর্থনীতি। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশ। বাড়ছে মাথাপিছু আয়। বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রেমিট্যান্স, রাজস্ব—সব সূচকেই কমবেশি সাফল্য। পোশাক রপ্তানিতেও বিশ্বে অন্যতম শীর্ষস্থানে। সরকারি খাতের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ব্যবসা-বাণিজ্য-উদ্যোগে ব্যাপকভাবে অংশ নিচ্ছে। এর প্রভাবে বাড়ছে কর্মসংস্থানও। সব কিছু মিলিয়েই অর্থনীতি দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার শক্তিতে বলীয়ান আছে। তবে অর্থনীতিতে যে গতি এবং চাঞ্চল্য তার প্রকৃত প্রভাব নেই রাজস্ব আয়ে। ব্যক্তির আয় বাড়ছে, মানুষের জীবনযাত্রায় তার প্রভাব আছে। তবে সরকারের অভ্যন্তরীণ আয় সেভাবে বাড়ছে না। যেমন—উন্নয়নের ছোঁয়া লাগছে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত, সেখানে ক্ষুদ্র, মাঝারি থেকে বৃহত্ শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে। বিদ্যুত্, অবকাঠামোর ব্যাপক বিস্তারে সব স্তরের মানুষেরই কমবেশি আয় বেড়েছে। শিক্ষার প্রসারের ফলে ঘরে ঘরে আয়যোগ্য মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কাজের খোঁজে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। সেখান থেকে রেমিট্যান্স আসছে। এর ইতিবাচক প্রভাব আছে তাদের ক্রয়ক্ষমতায়। প্রতিটি জেলা, উপজেলাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গ্রোথ সেন্টার গড়ে উঠছে। তবে মানুষের কর দেওয়ার স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআরের সব শেষ হিসাবে দেখা যায়, দেশে কর দেওয়ার জন্য ট্যাক্স আইডেনটিফিকেশন নম্বর বা টিআইএন নিয়েছেন প্রায় ৪৫ লাখ করদাতা। অথচ বছর শেষে দেখা যাচ্ছে রিটার্ন দাখিল করেছেন মাত্র ১৯ লাখ করদাতা। এঁদেরও সবাই যে কর দেন তা-ও নয়। তার মানে ১৭-১৮ কোটি মানুষের দেশে কর দেওয়ার মতো সক্ষম মানুষের সংখ্যা খুবই কম। ফলে কর-জিডিপি অনুপাতের দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম পেছনের সারির একটি দেশ। এনবিআর বলছে, বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত ১১.৬ শতাংশ। এক দশক আগেও তা ছিল মাত্র ৭ শতাংশ। এখন বাড়লেও কোনোভাবেই এটা সন্তোষজনক নয়। এনবিআরের তৈরি সব শেষ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশে প্রত্যক্ষ করের হার ৩৫ শতাংশ। অথচ একটি উচ্চ জিডিপি অর্জনকারী দেশের উন্নয়নের প্রধান শক্তিই হলো প্রত্যক্ষ করের ওপর নির্ভরতা। যা এখনো বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। সরকারের চলতি অর্থবছরের মোট তিন লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয়কর আদায় করার কথা এক লাখ ১৫ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। শতাংশের হিসাবে যা ৩৫.৫০ শতাংশ। অথচ এ হারে আয়কর আদায় করা যাচ্ছে না। এনবিআরের হিসাবে গেল সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে আয়কর আদায়ের প্রবৃদ্ধি মাত্র ১১.৫৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব কম আয় হয়েছে দুই হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। যদিও গেল তিন বছরে শুল্ক, ভ্যাট থেকে রাজস্ব আয়ের তুলনায় আয়করের প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি।

প্রথমত এ দেশের মানুষের কর ফাঁকির প্রবণতা বেশি। কর সচেতনতার অভাব আছে। কর অফিসে হয়রানি আতঙ্কে করভীতিও বিদ্যমান। তথ্য-প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্তি কম, তাই কর ফাঁকি দেওয়ার সহজ সুযোগ নেন মানুষ। অনেক বছর ধরে আলোচনা, চেষ্টার কথা জানা গেলেও অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের পুরো প্রক্রিয়াটি এখনো সম্পন্ন হয়নি। অনলাইনে টিআইএন দেওয়ার পদ্ধতি চালু হয়েছে, তবে এটা হ্যাকিং করা বা এর অপব্যবহার রোধ করা যাচ্ছে না। জ্বালানি, বিদ্যুত্ খাতসহ বিভিন্ন শিল্প খাতে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ছাড় দেওয়া হয়েছে। কর অবকাশের নামে এ সুযোগ দেওয়া হলেও তা পর্যালোচনা কম। বিশেষ করে যেসব খাতের সক্ষমতা বাড়লেও এ সুযোগ বাতিল করা হচ্ছে না। ফলে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। কর অব্যাহতি ও মওকুফের পরিমাণও বিশাল।

বাজেট তৈরির আগে দেখা যায়, দেশের কমবেশি সব স্টেকহোল্ডার, ব্যবসায়ী সংগঠন, উদ্যোক্তারা এনবিআরে ভিড় করেন নানা খাতে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের করছাড়ের প্রস্তাব নিয়ে। অথচ একই সময়ে তাঁরা সরকারের কাছে সড়ক, মহাসড়ক, ব্রিজ, ফ্লাইওভার, বিদ্যুত্, জ্বালানিসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির দাবি জানান। অথচ এসব সরকারকে নিজস্ব উত্স থেকে আয়ের অর্থ দিয়েই করার কথা। যেহেতু সবাই সুযোগ-সুবিধা চান, সরকারকে এসবে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হয়। ফলে রাজস্ব আয়ে অনেক ছাড় দিতে হয়। এ সংস্কৃতির ফলে অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে রাজস্ব আয় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হয় না।

গেল পাঁচ বছরের আয়কর আদায়ের চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আয়কর আদায়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬.২৮ শতাংশ। এর পরের বছর মানে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা ছিল ১০.২৭ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা অনেক কমে নেমে আসে ৮.২৬ শতাংশে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এসে আরো কমে যায় প্রবৃদ্ধি। নেমে আসে ২.৮০ শতাংশে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেশ ভালো একটা উলম্ফন হয়। প্রবৃদ্ধি পৌঁছে যায় ২২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশে। এর পরের অর্থবছর অর্থাত্ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা এসে ঠেকে ১৬.৯৪ শতাংশে। অর্থাত্ আয়কর মোটামুটি ১৪ থেকে ১৭ শতাংশের মধ্যেই বেশি অবস্থান করছে বলা যায়। ২২ শতাংশ যেমন স্থির থাকেনি, তেমনি ২ শতাংশও গ্রহণযোগ্য নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, মানুষের কর দেওয়ার সামর্থ্য আছে। তবে তা স্বেচ্ছায় আদায় হচ্ছে না। আবার করদাতাদের ঘরে ঘরে গিয়ে রাজস্ব আদায় করা হবে—এমন সক্ষমতাও এনবিআরের নেই। যদিও বর্তমান অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকে এনবিআরের সক্ষমতা ও জনবল বাড়ানোর পক্ষে কথা বলেছেন এবং তা তিনি করার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে তা কবে নাগাদ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে সেটাই বড় কথা।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মানুষের স্বেচ্ছায় কর দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়নি। গেল প্রায় এক দশকে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে করদাতারা হয়রানিমুক্তভাবে কর দিতে চান। আয়কর মেলায় তা প্রমাণ হয়েছে। এ সংস্কৃতি চালু করার প্রয়োজনীয়তা এখনো আছে। এ সংস্কৃতি শুধু মেলায় নয়, সব সময় কর অঞ্চল ও কর সার্কেলেও যেন এভাবে হয়রানিমুক্তভাবে কর দেওয়া যায় এর নিশ্চয়তা চায় মানুষ।

আবারও আয়কর মেলা শুরু হচ্ছে। এবারও ব্যাপক পরিসরে হচ্ছে এ মেলা। এবারও আশা করা যাচ্ছে, আগের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে কর আহরণ ও রিটার্ন দাখিলে। তবে এনবিআরকে এমন একটা সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে, যাতে কর দেওয়া কোনো ভীতির বিষয় নয়; এটি যেন হয় সত্যিকার অর্থে কর উত্সব! মানুষ রাষ্ট্রকে কর দেবে আনন্দ ও গর্বের সঙ্গে। এটি যেদিন সম্ভব হবে, সেদিনই এনবিআরের আয়কর মেলার পূর্ণতা আসবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা