kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০২২ । ১৬ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

ঋণের ভার বইতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা

শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি   

১৩ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ঋণের ভার বইতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা

দুর্যোগে বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে এসে দীর্ঘদিন ধরে ঘাটে অবস্থান করছে সারি সারি মাছ ধরার ট্রলার। গত বুধবার বিকেলে বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলা সদরের রায়েন্দা খাল থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটের শরণখোলার মৎস্য আড়ত ও জেলেপল্লীতে চলছে হাহাকার। কয়েক বছর ধরে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন গভীর সমুদ্রে ইলিশ আহরণকারী ট্রলার মালিক ও মহাজনরা। গত তিন-চার বছরে প্রায় অর্ধশত ট্রলার মালিক ও ব্যবসায়ী ঋণের চাপ ও লোকসানে দেউলিয়া হয়েছেন। তা ছাড়া এ বছর আবার জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে নতুন করে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে ইলিশ খাতে।

বিজ্ঞাপন

ফলে কেউ দেনাগ্রস্ত হয়ে কম দামে বিক্রি করে দিয়েছেন জাল-ট্রলার ও শেষ সম্বল বসতভিটা। কেউ বা হয়েছেন নিরুদ্দেশ। অভাবে পড়ে কারো কারো লাখ লাখ টাকা মূল্যের জাল-ট্রলার ঘাটে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে উঠে আসে শরণখোলার সমুদ্রগামী ট্রলার মালিক-মহাজনদের এই দুর্বিষহ চিত্র।

এ ব্যাপারে কথা হয় মৎস্যজীবী সংগঠনের নেতাসহ ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন ট্রলার মালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীর সঙ্গে। এদের মধ্যে উপজেলার রায়েন্দা ইউনিয়নের কদমতলা গ্রামের মৎস্য ব্যবসায়ী আলামিন ঘরামী ১০ থেকে ১২ বছর ধরে নিজের ট্রলারে সাগরে ইলিশ আহরণ করে আসছিলেন। প্রথম দিকে ভালো মাছ পাওয়ায় ব্যবসাও হয় রমরমা; কিন্তু গত তিন-চার বছরে মৌসুমের শুরু থেকেই কয়েক দফা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, করোনা প্রভাব আর মৌসুমের অর্ধেক সময় নিষেধাজ্ঞা চলায় ব্যবসায় ধস নামতে থাকে। এক পর্যায়ে মহাজন ও বিভিন্নজনের কাছ থেকে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ঋণ নেন। শেষমেশ কোনো উপায় না পেয়ে অল্প দামে জাল-ট্রলার বিক্রি করে কিছু দেনা শোধ করেন; কিন্তু বড় অঙ্কের পাওনাদারদের চাপে গত দুই মাস আগে হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যান তিনি।

আলামিন ঘরামীর ছেলে আরিফুল ইসলাম জানান, দেনার চাপে তাঁর বাবা দুই মাস ধরে নিখোঁজ। ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না তাঁকে। ব্যবসা না থাকায় এখন অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটছে তাঁদের।

মধ্য খোন্তাকাটা গ্রামের একসময়ের প্রভাবশালী মৎস্য ব্যবসায়ী আ. মালেক মোল্লা জানান, কয়েক বছর ধরে ব্যবসায় লোকসান হওয়ায় প্রায় ৬০ লাখ টাকা দেনা হয়েছেন। এরই মধ্যে ৩০ লাখ টাকায় তাঁর বসতবাড়ি বিক্রি করে ইসলামী ব্যাংকের ১৮ লাখ টাকা ঋণ শোধ করেছেন। এখনো প্রায় ৪০ লাখ টাকার দেনা আছেন। তাঁর এফবি হাসিনা-সামাদ নামের ফিশিং ট্রলারটি এখন ঘাটে পড়ে আছে। টাকার অভাবে এ বছর সাগরে যেতে পারেননি তিনি।

রায়েন্দায় বলেশ্বর নদের পারের বাসিন্দা কামাল হাওলাদার জানান, পুঁজির অভাবে সাগরে যেতে না পারায় তাঁর ৩০ লাখ টাকা দামের ট্রলারটি ঘাটে বসেই নষ্ট হচ্ছে। একই এলাকার রসু ঘরামী জানান, গত বছর বন্যায় তাঁর ট্রলারটি মারত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে তাঁর ১২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। ট্রলার না থাকায় ইলিশের ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কদমতলা গ্রামের আমিনুর হাওলাদার ৩০ লাখ টাকা ও ইউনুচ হাওলাদার ১৫ লাখ টাকা দেনার বোঝা মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। রাজেশ্বর গ্রামের রফিকুল মিয়া দেনার চাপে তাঁর ১৫ লাখ টাকা মূল্যের ট্রলারটি বিক্রি করেছেন মাত্র চার লাখ টাকায়। এ ছাড়া সোবাহন মৃধা, রহমান মৃধা, আবু মৃধা, কামাল মৃধা টাকার অভাবে এখনো ট্রলার খুলতে পারেননি।

শরণখোলার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আড়তদার কবির হাওলাদার জানান, তাঁর ছয়টি ট্রলারের মধ্যে এ বছর মাত্র দুটি ট্রলার সাগরে গেছে। টাকার অভাবে অন্যগুলো পাঠাতে পারেননি। একেকটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে তিন-চার লাখ টাকা পুঁজি বিনিয়োগ করতে হয়েছে; কিন্তু তিন ট্রিপের মাছ বিক্রি করে তেলের দামও ওঠেনি। এভাবে প্রত্যেক ট্রলার মালিক ও মহাজন লোকসানে রয়েছেন।

উপজেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন জানান, এ বছর আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক থেকে ১৫ লাখ, ব্র্যাক থেকে দুই লাখ এবং মহাজনের আড়ত থেকে ১৫ লাখসহ মোট ৩২ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছেন; কিন্তু সাগরে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশ পড়ছে না। আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুরু হওয়ায় কোনো ব্যবসায়ীই এখন পর্যন্ত লাভের মুখ দেখতে পারেননি।

শরণখোলা উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা বিনয় কুমার রায় বলেন, ‘ইলিশ উন্নয়ন ফান্ড নামের একটি তহবিল গঠনের প্রক্রিয়া সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে। এটি পাস হলে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ট্রলার মালিক ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক সহায়তা করা সম্ভব হবে। ’

 



সাতদিনের সেরা