kalerkantho

শনিবার । ২০ আগস্ট ২০২২ । ৫ ভাদ্র ১৪২৯ । ২১ মহররম ১৪৪৪

উলিপুরে আশ্রয়ণ প্রকল্প

জায়গা ছেড়ে দিয়েও ঘর পাননি অসহায় বৃদ্ধা

♦ বন্দোবস্ত নেওয়া জমিতে প্রকল্পের ঘর
♦ বৃদ্ধার শেষ আশ্রয় ভেঙে গৃহ নির্মাণ
♦ সচ্ছল পরিবারকে সেই ঘর বরাদ্দ
♦ বাস্তুহারা বৃদ্ধার মানবেতর জীবনযাপন

উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি   

৭ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জায়গা ছেড়ে দিয়েও ঘর পাননি অসহায় বৃদ্ধা

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার পাণ্ডুল ইউনিয়নের আপুয়ারখাতা গ্রামে বৃদ্ধা বিবিজন বেওয়ার (মাঝে) ঘর ভেঙে তৈরি করা হয় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর। ছবি : কালের কণ্ঠ

কুড়িগ্রামের উলিপুরে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর তৃতীয় পর্যায়ে ঘর বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ঘরের আশ্বাস দিয়ে বিবিজন বেওয়া (৭৫) নামে এক অসহায় বৃদ্ধার বন্দোবস্ত নেওয়া জমিতে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রকল্পের ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এ কাজ করতে গিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে ওই বৃদ্ধার শেষ আশ্রয় ঝুপড়ি ঘরটি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের ঘর বরাদ্দ পাননি ওই বৃদ্ধা।

বিজ্ঞাপন

ফলে বাস্তুহারা হয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তিনি।

এদিকে একই পাড়ায় দুই ধনাঢ্য বক্তি পেয়েছেন আশ্রয়হীনদের ঘর। এ ঘটনায় ওই এলাকার মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার পাণ্ডুল ইউনিয়নের আপুয়ারখাতা গ্রামে। আর এসব অনিয়মের সঙ্গে ওই ইউনিয়নের ভূমি সহকারী (তহশিলদার) মন্টু কুমারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাণ্ডুল ইউনিয়নের আপুয়ারখাতা নয়াবন্দর গ্রামের মৃত নছর উদ্দিনের স্ত্রী বিবিজন বেওয়া (৭৫)। ১৯৯৪ সালের ৯ মার্চ কবুলিয়ত দলিলে নিজ নামে ২২ শতাংশ খাসজমি বন্দোবস্ত করে নেন। এর পর থেকে বিবিজন ও তাঁর এক মেয়ে ওই জমিতে বসবাস করে আসছেন। সেখানেই ভিক্ষবৃত্তি করে জীবন চলত তাঁর। কিন্তু ওই জমিতে নজর পড়ে ইউনিয়নের ভূমি সহকারী মন্টু কুমারের। নিয়ম-নীতি না মেনে বন্দোবস্ত নেওয়া ওই জমিতে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেখানে বিবিজনকেও একটি ঘর দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। তবে বন্দোবস্ত নেওয়া জমিতে আশ্রয়ণের ঘর নির্মাণ করা হলেও বিবিজনকে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি। ঘরের আশ্বাস দিয়ে বিবিজনের একমাত্র সম্বল ঝুপড়ি ঘরটিকে উচ্ছেদ করা হয়। প্রায় দুই মাস ধরে চলে সেখানে নির্মাণকাজ। দীর্ঘ এই সময় তিনি খোলা আকাশের নিচে বসবাস করেছেন। গত ২৬ এপ্রিল আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর তৃতীয় পর্যায়ের ঘর ভূমিহীনদের মধ্যে হস্তান্তর করা হলেও বিবিজনের নামে কোনো ঘর বরাদ্দ হয়নি। বিষয়টি জানাজানি হলে এলাকার মানুষজনের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করে।

এ বিষয়ে বিবিজন বেওয়ার কাছে জানতে চাইলে হাউমাউ করে কান্না শুরু করেন। এক পর্যায়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন ওই বৃদ্ধা। এ সময় বিবিজনের মেয়ে মালেকা বেগম বলেন, ‘তহশিলদার মন্টু হামাক একটা ঘর দিবের চাইছে। সেই আশায় হামরা ঘরের মিস্ত্রির সাথে জোগালি করছি। ঘরের চালের টিন ভাঙরি হিসেবে বেঁচাইছি। ভিক্ষা করি চাউল আনি মিস্ত্রিক খোওয়াইছি। হামার বোন দেনা করি পাঁচ হাজার টেকা আনি ওমারগুলেক দিছে। কিন্তু চাহিদামতো টেকা দিবের পাই নাই জন্য ওমরা হামাক ঘর দিলে না। এই জমি হামার মায়ের নামে। মেলাবার ওমাক (ইউএনও-তহশিলদার) কাগজ দেখপার চাছি; কিন্তু ওমরা হামার কোনো কথা শোনে নাই। বুড়া মাক নিয়ে এলা হামরা কন্টে যামো?’

এদিকে বিবিজনের মতো অসহায় মানুষ ঘর না পেলেও তহশিলদার মন্টু কুমারকে ম্যানেজ করে ভূমিহীন সেজে ঘর পেয়েছেন একই পাড়ার ধনাঢ্য শ্যামল চন্দ্র বর্মণ ও ধনঞ্জয় কুমার বর্মণ।

এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা বেলাল উদ্দিন বলেন, এই জায়গাটি বিবিজনের নামে বন্দোবস্ত করা। জমির সব কাগজপত্রও তাঁর কাছে আছে। এই ঘর বিবিজনের পরিবর্তে সচ্ছল পরিবারের সন্তান ইমাম হোসেনকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

ইউনিয়ন ভূমি সহকারী মন্টু কুমার বলেন, ‘বিবিজন ও তাঁর মেয়ে মালেকার কাগজপত্র আমি জমা দিয়েছি। এখন কাগজপত্র যাচাই-বাছাই ইউএনও স্যার করবেন। ’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিপুল কুমার বলেন, ‘আমরা কাগজপত্র দেখেছি। ওই জমি কখনো বন্দোবস্ত দেওয়া হয়নি, পুরোটাই খাস। এখন ঘর না পাওয়ায় তাঁরা বলছে ওটা বন্দোবস্ত নেওয়া জমি। ’

 



সাতদিনের সেরা