kalerkantho

সোমবার । ৩ মাঘ ১৪২৮। ১৭ জানুয়ারি ২০২২। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

রোগীর ক্ষতি সাড়ে ৯ কোটি টাকা

আব্দুল হালিম, ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ)   

৩০ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রোগীর ক্ষতি সাড়ে ৯ কোটি টাকা

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১১ বছর ধরে এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম ও ইসিজি পরীক্ষা না হওয়ায় সরকার রাজস্ব হারিয়েছে কমপক্ষে ছয় কোটি টাকা। বিপরীতে হাসপাতাল থেকে রোগীদের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গুনতে হয়েছে অন্তত সাড়ে ১৫ কোটি টাকা। ফলে রোগীদের অতিরিক্ত গুনতে হয়েছে সাড়ে ৯ কোটি টাকা।

কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক্স-রে মেশিনটি ১১ বছর ধরে বিকল। একই সময় ধরে বাক্সবন্দি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনটি। তা ছাড়া দুই বছর ধরে হাসপাতালের ইসিজি মেশিনটিও নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে।

ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগের রেজিস্টার খাতা এবং চিকিৎসকদের কথা অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ৩০০-৩৫০ জন রোগী এই হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিয়ে থাকে। সে হিসাবে, গত ১১ বছরে ১৪ লাখেরও বেশি রোগী হাসপাতাল থেকে সেবা নিয়েছে। এর মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ১০০ জন রোগীকে এক্সে-রে, আলট্রাসনোগ্রাম ও ইসিজি পরীক্ষা করতে দিয়েছেন চিকিৎসকরা। গড়ে প্রতিদিন ৩০-৪০ জনকে এক্স-রে, ২৫-৩০ জনকে আলট্রাসনোগ্রাম ও ২০-৩০ জনকে ইসিজি পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়েছে।

হিসাব অনুযায়ী, গত ১১ বছর ধরে এক্স-রে মেশিন বিকল, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন বাক্সবন্দি ও দুই বছর ধরে ইসিজি মেশিন নষ্ট থাকায় হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে পারেনি অন্তত তিন লাখ দুই হাজার ৯৫০ জন রোগী। তাদের মধ্যে দুই লাখ ৮১ হাজার ৫০ জন রোগীকে অন্যত্র এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা করতে হয়েছে। আর দুই বছরে ২১ হাজার ৯০০ জন রোগীকে অন্য কোথায়ও ইজিসি পরীক্ষা করতে হয়েছে।

জানা গেছে, ডিজিটাল এক্স-রে করাতে হাসপাতালে সরকারি ফি ১৫০-২০০ টাকা। একই পরীক্ষা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করতে গেলে রোগীদের খরচ হয় ৩৫০-৪০০ টাকা। হাসপাতালে আলট্রাসনোগ্রাম করতে রোগীদের সরকারি খরচ হয় ১১০-২০০ টাকা। একই আলট্রাসনোগ্রাম ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করতে গেলে খরচ হয় ৬০০-৭০০ টাকা। অন্যদিকে হাসপাতালে ইসিজি করালে ফি লাগে ৮০ টাকা। আর ডায়াগনস্টিক সেন্টারে খরচ হয় ১৫০-২০০ টাকা। ফলে গত ১১ বছরে তিন লাখ দুই হাজার ৯৫০ জন রোগী হাসপাতালে এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম ও ইসিজি করালে সরকারের আয় হতো কমপক্ষে ছয় কোটি টাকা। কিন্তু এক্স-রে, আলট্রাসনোগ্রাম ও ইসিজি করা বন্ধ থাকায় ছয় কোটি টাকার রাজস্ব হাতছাড়া হয়েছে সরকারের। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে এসব পরীক্ষা করাতে গিয়ে রোগীদের খরচ হয়েছে কমপক্ষে সাড়ে ১৫ কোটি টাকা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সাল থেকে হাসপাতালের আধুনিক এক্স-রে মেশিনটি বিকল রয়েছে। একাধিকবার এক্স-রে মেশিনটি মেরামতের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় কর্তৃপক্ষ। এরপর ২০১৭ সালে মেশিনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। নতুন ডিজিটাল এক্সে-রে মেশিনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চাহিদাপত্র পাঠালেও কোনো কাজ হয়নি।

এদিকে ২০১১ সালে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণের সময় হাসপাতালে অত্যাধুনিক একটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু মেশিনটি তখন থেকেই নতুন ভবনের একটি কক্ষে বাক্সবন্দি রয়েছে। জনবল সংকটের কারণে এক দিনের জন্যও সেটি ব্যবহার করা হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ১১ বছর ধরে বাক্সবন্দি থাকায় আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনটি নষ্ট হয়ে গেছে। তা ছাড়া দুই বছর ধরে হাসপাতালের ইসিজি মেশিনটিও নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে।

ফুলবাড়িয়া উপজেলায় প্রায় ছয় লাখ মানুষের বসবাস। ৫০ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতালটিতে শুরু থেকেই চিকিৎসক ও জনবল সংকট রয়েছে। এখন এই হাসপাতালে মাত্র ১৬ জন চিকিৎসক রয়েছেন। এর মধ্যে ডা. লুত্ফুর রহমান অন্যত্র ডেপুটেশনে ও ডা. জয়ন্ত দেবনাথ চিকিৎসার ওপর একটি কোর্স করতে সিলেটে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রয়েছেন। হাসপাতালে চারজন মেডিক্যাল কর্মকর্তাসহ ১৯ জন চিকিৎসকের পদ খালি রয়েছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি থাকার পরও চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে অস্ত্রোপচার কক্ষ (ওটি) বন্ধ রয়েছে প্রায় ১১ বছর ধরে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বিধান চন্দ্র দেবনাথ বলেন, ‘টেকনিশিয়ান না থাকায় আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনটি চালানো যাচ্ছে না। এক্স-রে মেশিনটি নষ্ট প্রায় এক যুগ ধরে। নতুন এক্স-রে মেশিন ও জনবলের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকের কাছে একাধিকবার চাহিদাপত্র পাঠিয়েছি, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।’ ময়মনসিংহ জেলা সিভিল সার্জন ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এ ব্যাপারে ইউএইচএফপিওর সঙ্গে কথা বলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



সাতদিনের সেরা