kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৯ ডিসেম্বর ২০২১। ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

উত্তরাঞ্চলের মহাসড়কে নিষিদ্ধ গাড়ি চলছেই

মহাসড়কে চাঁদায় চলে তিন চাকার যান

লিমন বাসার, বগুড়া   

২৯ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মহাসড়কে চাঁদায় চলে তিন চাকার যান

নিয়ম অমান্য করে মহাসড়কে বেপরোয়া গতিতে চলছে তিন চাকার গাড়ি। বগুড়ার বনানী থেকে গত বুধবার তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

উত্তরাঞ্চলের মহাসড়কে পুলিশ নিষিদ্ধ তিন চাকার (থ্রি-হুইলার) গাড়ি দেখলেই মামলা করে। তবে কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, এই মামলা অনেকটা লোক-দেখানো। তলে তলে পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করেই তিন চাকার গাড়িগুলো মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়ায়।

চলে প্রশিক্ষণ

রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলা নিয়ে হাইওয়ে পুলিশ বগুড়া অঞ্চল গঠিত। এর অধীনে হাইওয়ে থানা সাতটি, ফাঁড়ি সাতটি ও ক্যাম্প রয়েছে একটি। মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ২৯০টি প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে। এতে বাস-ট্রাকের তিন হাজারের অধিক চালক-সহকারী অংশ নেয়।

পুলিশ সূত্র জানায়, বাস-ট্রাকের যেসব চালক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তাঁরা কিছুটা আইন মানেন। কিন্তু তিন চাকার গাড়ি নিষিদ্ধ থাকায়, এদের চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় না।

মামলা-জরিমানা

পুলিশের তথ্যে দেখা গেছে, হাইওয়ে পুলিশ বগুড়া অঞ্চলের অধীনে মহাসড়কে অবৈধ থ্রি-হুইলারসহ অন্যান্য যানবাহনের ওপর চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২ হাজার ৭৪২টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে এক হাজার ৩৩৬টি, ফেব্রুয়ারিতে দুই হাজার ১৮০টি, মার্চে দুই হাজার ৫২১টি, এপ্রিলে এক হাজার ৪৯০টি, মেতে এক হাজার ৪৩৫টি, জুনে এক হাজার ৩৩৩টি, জুলাইতে ৬৮১টি, আগস্টে ৭৫০টি ও সেপ্টেম্বরে এক হাজার ১৬টি। এসব মামলার বিপরীতে সরকারি কোষাগারে জরিমানার অর্থ জমা হয়েছে তিন কোটি ২৭ লাখ ১৬ হাজার ৬৫০ টাকা।

ঘটছে প্রাণহানি

হাইওয়ে পুলিশের তথ্য ও স্থানীয় পত্রিকার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উত্তরবঙ্গ মহাসড়কে গত ৯ মাসে ৫৩ জন প্রাণ হারিয়েছে তিন চাকার গাড়িতে চড়ে। নিহতদের মধ্যে বগুড়া ছাড়াও সিরাজগঞ্জের বাসিন্দা রয়েছে।

বগুড়া মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সামসুদ্দিন শেখ হেলাল বলেন, ‘বেশির ভাগ সময় মহাসড়কে দুর্ঘটনা ঘটলে বাস-ট্রাকের চালকদের দায়ী করা হয়। যার জন্য আমরা সড়কসংস্কার ও অবৈধ যান চলাচল বন্ধে প্রশাসনকে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছি। এসব যান মহাসড়কে থাকলে দুর্ঘটনা কমবে না।’

ঘুষের নাম ম্যানেজ মানি

গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এই প্রতিবেদক অন্তত ১০ জন চালকের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁরা প্রত্যেকে নিষিদ্ধ গাড়ির চালক হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন। তাঁদের তিনজন বগুড়া শহরের, সাতজন শেরপুর উপজেলার এবং একজন সিরাজগঞ্জের কাজিপুরের বাসিন্দা। তাঁরা জানান, সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক ও মালিকরা মালিক সমিতির মাধ্যমে মাসিক আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা হাইওয়ে পুলিশকে ম্যানেজ করার নামে উত্তোলন করেন। আর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালকরা তাঁদের সমিতি ও ছোট ছোট গ্রুপ আকারে প্রতি মাসে দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা করে উত্তোলন করে হাইওয়ে পুলিশকে দিয়ে থাকেন। এই টাকার একাংশ ট্রাফিক পুলিশ ও ফাঁড়ি পুলিশ পেয়ে থাকে। মাসিক টাকা প্রদানকারী চালকদের নির্দিষ্ট একজন হাইওয়ে পুলিশের আদায়কারীর মুঠোফোন নম্বর দেওয়া হয়। তাঁরা কোনো জায়গায় আটক হলে ওই নম্বরে কল দেন। এরপর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। আর টাকা না দেওয়া থাকলে ধরলেই মামলা করে পুলিশ।

নয়মাইল এলাকার এক চালক বলেন, ‘মহাসড়কে চলাচলের জন্য বাধা দিলে আমরা পুলিশকে ম্যানেজ মানি দিয়ে সারা দিন গাড়ি চালাই।’

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার এক চালক বলেন, ‘পুলিশ তো আমার গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা দিতে পারে না। ধরলে ৫০ থেকে ১০০ টাকা দিই। নগদ যা পায় পুলিশের তা-ই লাভ।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের বগুড়ার সহকারী পরিচালক মাঈনুল হাসান জানান, এক শ্রেণির চালক ও মালিকের কারণে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। পুলিশও এ ব্যাপারে সজাগ নয়।

‘ম্যানেজ মানি’-এর বিষয়টি অস্বীকার করেছে হাইওয়ে ও থানা পুলিশ। শাজাহানপুর থানার পরিদর্শক আব্দুল্লা আল মামুন বলেন, ‘পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে তিন চাকার গাড়িগুলো চলাচল করে।’

হাইওয়ে পুলিশ বগুড়া অঞ্চলের সুপার (এসপি) মুনশী শাহাবুদ্দীন বলেন, ‘অবৈধ যান চলাচলে চাঁদা নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



সাতদিনের সেরা