kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

সারসংকটে জিম্মি কৃষক

কুড়িগ্রাম (আঞ্চলিক) ও পাটগ্রাম (লালমনিরহাট) প্রতিনিধি    

২৭ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সারসংকটে জিম্মি কৃষক

কুড়িগ্রামের রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলার হাটবাজারে খুচরা বিক্রেতা ও ডিলারের ঘরে ইউরিয়াসহ অন্যান্য সার পাওয়া যাচ্ছে না। সাত দিন ধরে এই অবস্থা চলছে। এ ছাড়া লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায় সারের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকায় বেচা হচ্ছে।

সার চেয়ে গত সোমবার রৌমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বরাবর আবেদন জানিয়েছেন কয়েক শ কৃষক। তাঁরা জানান, এখন সরিষা ও ভুট্টা চাষের মৌসুম। শুরুতেই সারের প্রয়োজন হয়। কৃষক ক্ষেতে হালচাষ করে বসে আছেন। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার ঘরে সার নেই। স্থানীয় কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তা চুপ করে বসে আছেন।

রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অক্টোবরে রৌমারীতে আড়াই শ ও রাজীবপুরে আড়াই শ মোট ৫০০ টন ইউরিয়া সার বরাদ্দ পাওয়া গেছে। দুই উপজেলায় বিসিআইসি অনুমোদিত ১৮ জন ডিলার ও ৯০ জন্য খুচরা বিক্রেতা রয়েছেন। যাঁদের মাধ্যমে কৃষকের হাতে সার তুলে দেওয়া হয়। প্রতি বস্তা ইউরিয়া ৮০০ টাকা।

গত সোমবার রৌমারী উপজেলার কর্তিমারী বাজারে একটি ডিলারের ঘরে গিয়ে দেখা যায়, এক বস্তা সার। দাম চাওয়া হচ্ছে এক হাজার ২০০ টাকা। ডিলারের ঘরে ১২-১৩ জন কৃষক বসে আছেন। এ সময় কৃষক নুর হোসেন বলেন, ‘দুই বস্তা ইউরিয়া সার নেব। ৮০০ টাকার বস্তা এক হাজার ১০০ টাকা চাচ্ছে। দুই বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করব। ক্ষেত তৈরি করা শেষ। কিন্তু সার পাচ্ছি না।’

কৃষক সুলতান মাহমুদ বলেন, ‘মাইনসে কয় ডিলাররা মিল গেটেই সার বেচে আসে। আমগর নামের বরাদ্দ সার অন্য এলাকায় বেচে বেশি দামে। আর আমরা তা পাই না।’

একই দৃশ্য দেখা গেছে, রাজীবপুর বাজারেও। কৃষক সমের উদ্দিন বলেন, ‘আমি সাত দিন থিকা ঘুরছি এক বস্তা সারের জন্য। কিন্তু পাচ্ছি না। ডিলারের ঘর খোলা। কিন্তু সার নাই।’

কৃষক সুরুজ মিয়া বলেন, ‘সার নাই। আবার বস্তাপ্রতি যদি এক হাজার টাকা দেওয়া যায়, তাহলে খুচরা বিক্রেতারা সার বের করে দেয় মাঝে মাঝে। বর্তমানে যে অবস্থা তাতে দু-এক দিনের মধ্যে সার পাওয়া না গেলে কৃষকের সরিষা আবাদ পিছিয়ে পড়বে। তখন ফলন কম হবে।’

তবে ডিলাররা ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। রাজীবপুর উপজেলার বিসিআইসি ডিলার সিরাদ্দৌলা বলেন, ‘যে পরিমাণ বরাদ্দ পাওয়া গেছে, মিল থেকে উত্তোলন করে এলাকায় এনে বেচেছি।’

রৌমারী উপজেলার বিসিআইসি ডিলার মোস্তাফিজুর রহমান সার সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। এ কারণে সার সংকট দেখা দিয়েছে।’

এ বিষয়ে রাজীবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, দ্রুত আরো আড়াই শ টন সারের বরাদ্দ চেয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছে।

রৌমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাউয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘কৃষকদের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’

অন্যদিকে পাটগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকদের কাছ থেকে ইউরিয়া, টিএপি, এমওপি, ডিএপিসহ বিভিন্ন প্রকার সারের দাম বেশি নেওয়া হলেও ডিলার ও সার ব্যবসায়ীরা কোনো রসিদ দিচ্ছেন না। এতে বেশি দামে সার বেচার বিষয়ে প্রমাণসহ কারো কাছে অভিযোগ দিতে পারছেন না কৃষকরা।

এ সময় দেখা গেছে, ইউরিয়া ৫০ কেজির বস্তার দাম ৮০০ টাকা। বাজারে বেচা হচ্ছে ৮৬০ টাকা। এমওপি ৭৫০ টাকার স্থলে ৯০০ থেকে ৯২০ টাকা, টিএসপি ১১০০ টাকার স্থলে প্রকার ভেদে ১৫০০ থেকে ১৯০০ টাকা, ডিএপি ৮০০ টাকার স্থলে প্রকার ভেদে ৮৫০ থেকে ১১০০ টাকা দরে বেচতে দেখা গেছে।

বাউরা ইউনিয়নের আফতাব মোড়ের কৃষক সোহেল রানা (৩০) বলেন, ‘বিএডিসির তিউনিশিয়া টিএসপি সারের জন্য প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে দোকানে ঘুরেও পাচ্ছি না। ৩০ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করব, দুশ্চিন্তায় আছি।’

জোংড়া ইউনিয়নের কৃষক বুলবুল আহমেদ বলেন, ‘দোকানে গেলে অতিরিক্ত দাম ছাড়া সার পাওয়া যায় না। কয়েক দিন ঘুরেও বিএডিসির তিউনিশিয়া ও এমওপি সার পাইনি।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন পাইকারি ব্যবসায়ী জানান, তাঁরা যশোরের নওয়াপাড়া এবং পাবনার নগরবাড়ী মোকাম থেকে বেশি দামে সার কিনছেন। তাই বেশি দামে বেচতে হচ্ছে।

পাটগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল গাফ্ফার বলেন, ‘নির্ধারিত মূল্যে কৃষকের দোরগোড়ায় সার পৌঁছানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমাদের বাজার মনিটরিং অব্যাহত রয়েছে।’

এ বিষয়ে পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফুর রহমান বলেন, ‘যদি কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সারের দাম বেশি নেয়, তাহলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।’



সাতদিনের সেরা