kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

ভুয়া বিল-ভাউচারে আত্মসাৎ

আঞ্চলিক প্রতিনিধি, রংপুর   

১৭ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভুয়া বিল-ভাউচারে আত্মসাৎ

রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. আরশাদ হোসেনের বিরুদ্ধে করোনাক্রান্তিকালের সরকারি বরাদ্দের বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অফিসের পিয়নের মাধ্যমে সরকারি বরাদ্দের এসব টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি। গত ২৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর ৭৫তম জন্মদিন পালন উপলক্ষে হাসপাতাল চত্বরে ৭৫টি ঔষধি ও ভেষজ চারা রোপণের জন্য ২৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু মাত্র দুটি গোলাপ ও একটি কড়াইগাছের চারা রোপণ করে বরাদ্দের টাকা হাতিয়ে নেন তিনি। এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, ইউএইচএফপিও আরশাদ হোসেন ভুয়া বিল-ভাউচার দিয়ে বিভিন্ন খাত থেকে দফায় দফায় লাখ লাখ টাকা নিজের পকেটে নিয়েছেন।

হাসপাতালের সূত্র থেকে জানা যায়, ডা. আরশাদ হোসেন ২০১৯ সালের ৭ জুলাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেন। এর পর থেকে তাঁর বিরুদ্ধে নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে করোনা মোকাবেলায় প্রস্তুতি সম্পন্ন করাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে হাসপাতালে সরকারিভাবে ১৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ডা. আরশাদ হোসেন প্রচারণা, ক্যাম্পেইন, ব্যানার, আপ্যায়ন, পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে সামান্য টাকা ব্যয় করে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরির মাধ্যমে প্রায় আট লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে কানাঘুষা শুরু হলে তাঁদের ম্যানেজ করতে গ্রেড অনুপাতে এক হাজার থেকে চার হাজার টাকা দেওয়া হয়। এদিকে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় বদরগঞ্জের শাহ্পুর হোটেল, রুপম হাউস, ঢাকা আবাসিক হোটেলে চিকিৎসক, স্টাফদের থাকা-খাওয়াসহ বিভিন্ন খাতে ভুয়া বিল-ভাউচার করা হয়। বাস্তবে এসব নামে বদরগঞ্জে কোনো আবাসিক হোটেলের অস্তিত্ব নেই।

এদিকে ৩০টি কমিউনিটি সেন্টার ও ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিদর্শনের (মনিটরিং ও সুপারভিশন) জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে একটি নতুন গাড়ি দেওয়া হয়। নিয়ম হচ্ছে ইউএইচএফপিও এসব কেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। কিন্তু তিনি ব্যক্তিগত কাজে গাড়িটি ব্যবহার করে অফিস শেষে রংপুর শহরের বাসায় নিয়ে চলে যান।

এদিকে আরশাদ হোসেনের আস্থাভাজন অফিস পিয়ন আলী হাসানের সঙ্গে রয়েছে তাঁর বিশেষ সখ্য। তাঁর দাপটে অন্য নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনেকটাই কোণঠাসা। অফিস পিয়ন হলেও তিনি চলেন চিকিৎসকদের স্টাইলে। আরশাদ হোসেনের নির্দেশে এক বছর ধরে প্যাথলজি বিভাগের টেকনিশিয়ান ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ প্যাথলজি বিভাগে আবু বক্কর সিদ্দিক নামের একজন কর্মরত থাকলেও তাঁকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। এর আগে বদলি নেওয়া ল্যাব টেকনিশিয়ান আব্দুল জলিল প্যাথলজি বিভাগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে প্রতি মাসে সরকারি কোষাগারে ১০-৫০ হাজার টাকা জমা দিতেন। অথচ আলী হাসান এক হাজার টাকাও জমা করেন না।

সম্প্রতি পিয়ন আলী হাসানের মাধ্যমে সাত হাজার টাকায় কেনা কম্পিউটার প্রিন্টার মেশিন ২৫ হাজার টাকার বিল-ভাউচার করে জমা দেওয়া হয়। এ ছাড়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার টাকা বরাদ্দ থাকলেও গোটা হাসপাতাল চত্বর যেন ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়। এসব খাতের বেশির ভাগই টাকা আলী হাসানের নামে চেক ইস্যু করে ব্যাংক থেকে তুলে নিয়েছেন ডা. আরশাদ হোসেন। হাসপাতালে সরবরাহ করা করোনার কিটসহ অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রী স্টোরকিপারের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করার নিয়ম থাকলেও এখানে তার বালাই নেই। আরো গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে, ডা. আরশাদ হোসেনের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা পিয়ন আলী হাসানের বিরুদ্ধে। তিনি হাসপাতাল চত্বরকে মাদকের আখড়ায় পরিণত করেছেন।

এদিকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলা করতে সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে চলতি বছরের ১০ মে দুই হাজার ৫০০ পিস কিট (রেপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট) সরবরাহ করা হয়। কিটপ্রতি ১০০ টাকা হিসাবে এর মূল্য দাঁড়ায় দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা। অথচ পিয়ন আলী হাসান করোনা টেস্টের কিট বিক্রির মাত্র ৬০ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেন। বাকি টাকা আত্মসাৎ করেন পিয়ন আলী হাসান ও ডা. আরশাদ হোসেন।

এদিকে করোনার নমুনা সংগ্রহে প্রতি রোগীর জন্য ২০০ টাকা, আর বাড়ি থেকে সংগ্রহ করলে ৫০০ টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়। এ ছাড়া হাসপাতালে রোগীদের রক্ত, মলমূত্রসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আরো সুর্নিদিষ্ট ফি রয়েছে। এসব আদায় করা টাকা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারের কোষাগারে জমা করার নিয়ম। কিন্তু এখানে মানা হচ্ছে না কোনো নির্দেশনা।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পিয়ন আলী হাসান বলেন, ‘পিয়ন পদে নয়, আমি অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে যোগদান করি। তবে আমার প্যাথলজি বিভাগের ওপর তিন বছরের ডিপ্লোমা কোর্স করা আছে। এ কারণে ইউএইচএফপিও স্যার আমাকে ল্যাবের দায়িত্ব দিয়েছেন।’ আর মাদক সেবনের প্রশ্নই ওঠে না বলে দাবি করেন তিনি।

প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, ‘প্যাথলজি থেকে প্রাপ্ত টাকা প্রতি সপ্তাহে আমার মাধ্যমে ট্রেজারি চালানে ব্যাংকে জমা দেওয়ার নিয়ম। কিন্তু প্যাথলজি বিভাগের কোনো টাকার হিসাব আমার কাছে দেওয়া হয় না।’

ইউএইচএফপিও ডা. আরশাদ হোসেন বলেন, ‘আলী হাসানের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো সখ্য নেই। সব হিসাব ক্যাশিয়ারের কাছে থাকতে হবে এমন কথাও নেই। করোনা মোকাবেলার জন্য বিভিন্ন কাজে ১৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এর বিল-ভাউচারও আছে। আমি হাসপাতালের এক টাকাও এপাশ-ওপাশ করিনি।’ তবে আলী হাসান মাদক সেবনের সঙ্গে জড়িত আছে বলে স্বীকার করেছেন তিনি।

এ ব্যাপারে রংপুর জেলা সিভিল সার্জন হিরম্ব কুমার রায় বলেন, ‘এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে প্রশাসনিকভাবে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’



সাতদিনের সেরা