kalerkantho

বুধবার । ১১ কার্তিক ১৪২৮। ২৭ অক্টোবর ২০২১। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

প্রশাসনের তদন্তে তথ্য গোপন

মহিদুল ইসলাম, শরণখোলা (বাগেরহাট)   

১৪ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রশাসনের তদন্তে তথ্য গোপন

বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলা প্রশাসন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাল্যবিয়ের তথ্য চেয়ে যে ফরম দিয়েছে, সেখানে ২০২১ সালের এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষার্থীদের কথা উল্লেখ করা হয়নি। অথচ সবচেয়ে বেশি বিয়ে হয়েছে এই পরীক্ষার্থীদের। ফলে প্রশাসনের তদন্তে তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর কালের কণ্ঠের প্রথম পাতায় ‘এক উপজেলায় ৬০০ বাল্যবিয়ে’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর তদন্তের নির্দেশ দেন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এরপর অনলাইনের মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরিপ চালানো হয়। এই জরিপে এক-তৃতীয়াংশ বিয়ের তথ্য উঠে আসে।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর প্রশাসনের দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে ২৩৭ ছাত্রীর বিয়ের তথ্য উল্লেখ করা হয়। প্রশাসনের এই তথ্য পাওয়ার পর সরেজমিনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাদে বেশির ভাগই এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষার্থীদের বিয়ের ঘটনা আড়াল করেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা জানান, তাঁদের কাছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীদের বিয়ের তথ্য চাওয়া হয়নি। তাই তাঁরা বিষয়টি উল্লেখ করেননি। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস থেকে যে ফরমেট দেওয়া হয়েছে, তাতে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিয়ের তথ্য চাওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শরণখোলা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নূরুজ্জামান খান জানান, এত অল্প সময়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করাটা কষ্টসাধ্য। যাদের বিয়ে হয়েছে, তারাও নানা কারণে এখন স্বীকার করছে না। পরবর্তী সময়ে যাতে আর কোনো বাল্যবিয়ে না হয় সে, ব্যাপারে সব প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এসএসসি/দাখিল পরীক্ষার্থী বাদ

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা দপ্তর সূত্র জানায়, ২০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৬টি মাদরাসা ও একটি কারিগরি কলেজে এই বছর এসএসসি, দাখিল ও এইচএসসি (কারিগরি) মিলিয়ে মোট পরীক্ষার্থী এক হাজার ৬২৮ জন। এর মধ্যে ৫০ শতাংশ মেয়ে।

আনোয়ার হোসেন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আফজাল হোসেন মানিক জানান, এসএসসির তালিকা দেননি। তবে খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, ২৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৬ জনেরই বিয়ে হয়ে গেছে।

সোনাতলা ইসলামিয়া আলিম মাদরাসার ২৬ জন দাখিল পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১০ জনের বিয়ের খবর শুনেছেন শিক্ষকরা।

জনতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শহিদুল ইসলাম জানান, তাঁর বিদ্যালয়ে ৫৩ মেয়ে পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১১ জনেরই বিয়ে হয়ে গেছে।

রায়েন্দা সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিশ্চিত করেছেন, ১৭ জন পরীক্ষার্থীর বিয়ে হয়েছে।

সাউথখালী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিপক কুমার দাস জানান, ১০ পরীক্ষার্থীর বিয়ে হয়েছে।

রাজাপুর বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এমাদুল হক জানান, ১০ জনের পরীক্ষার্থীর বিয়ের খবর শুনেছেন।

তাফালবাড়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজের কয়েকজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের ৬১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে কমপক্ষে ১৫ জনের বিয়ে হয়েছে।

খাদাগণন মেমোরিয়াল দাখিল মাদরাসার সুপার ওবায়দুর রহমান জানান, দাখিল পরীক্ষার্থীদের মধ্যে অন্তত ১০ জনের বিয়ে হয়েছে। এসব তথ্য জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

তথ্য গোপনের কারণ

সঠিক তথ্য না দেওয়ার পেছনের কারণ অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রথমত বিয়ের কথা স্বীকার করলে বন্ধ হতে পারে ছাত্রীর উপবৃত্তি। অনুপস্থিতির হার বেশি হলে প্রতিষ্ঠানের এমপিও (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) বাতিল হতে পারে। তা ছাড়া প্রশাসন সরেজমিন এবং মাঠ পর্যায়ে না গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করায় বাস্তবের সঙ্গে বিস্তর ফারাক রয়ে গেছে।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের শরণখোলা উপজেলা কর্মকর্তা মো. আব্দুল হাই জানান, ইউনিয়ন পর্যায়ে বাল্যবিবাহ নিরোধ কমিটি রয়েছে। ১৫ সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটির সভাপতি হলেন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। এই কমিটির কার্যক্রম সক্রিয় করতে এরই মধ্যে প্রতিটি ইউনিয়নে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাতুনে জান্নাত বলেন, ‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাল্যবিয়ের চিত্র তুলে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। সংখ্যায় কমবেশি যা-ই হোক, বাল্যবিয়ে একটি অপরাধ—সেটাই মূল বিবেচ্য।’



সাতদিনের সেরা