kalerkantho

বুধবার । ৪ কার্তিক ১৪২৮। ২০ অক্টোবর ২০২১। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

তিস্তা একটি খাল!

বিশ্ব নদী দিবস

হায়দার আলী বাবু ও হাসান মাহমুদ, তিস্তা ব্যারাজ থেকে ফিরে   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



তিস্তা একটি খাল!

তিস্তা। সীমান্ত গলিয়ে এ দেশে আসা আলোচিত এই নদীটি একসময় ছিল চির যৌবনা। এ নদীকে ঘিরে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রামসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে জনবসতি। সৃষ্টি হয়েছে ভাওয়াইয়া সুর। কিন্তু তিস্তা এখন আর নিজের চেনা রূপে নেই। ক্ষীণ হতে হতে মরে যেতে বসেছে। বর্ষাকালে মাস দুয়েক নদীটিতে পানি থাকে মাত্র। আর বর্ষা শেষ হতে না হতেই সেটি পরিণত হয় মরা খালে। এবার ভাদ্র শেষ হতে না হতেই পানিশূন্য হয়ে পড়েছে তিস্তা।

শুষ্ক মৌসুমে নিজেদের চাষাবাদের জন্য গজলডোবা ব্যারাজের (বাঁধ) মাধ্যমে পানি আটকে সেচখালে পাঠানোয় চাষাবাদের সুযোগ পাচ্ছে ভারত। আর এর ফলে পানির অভাবে বাংলাদেশে দিন দিন মরে যেতে বসেছে তিস্তা। নদীর বুকে জেগে উঠেছে বিস্তীর্ণ চর। ভারত সরকার বাঁধ নির্মাণ করে তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করছে। একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ার ফলে বাংলাদেশে এই নদী শুকিয়ে এখন মৃতপ্রায়। এদিকে শুষ্ক মৌসুমে ভারত পানি আটকে রাখলেও বর্ষায় পানির ঢল সামলাতে খুলে দেওয়া হয় গজলডোবা ব্যারাজের সব জলকপাট। ফলে এ দেশে তিস্তার আশপাশের কয়েকটি জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল হয়ে পড়ে বন্যাকবলিত। পানির তোড়ে ভেসে যায় ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্র জানায়, ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ খরস্রোতা তিস্তা নদী সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের দার্জিলিং-জলপাইগুড়ি হয়ে বাংলাদেশের লালমনিরহাট, রংপুর হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারীর ভেতর দিয়ে ১২৪ কিলোমিটার অতিক্রম করে ব্রহ্মপুত্র নদে গিয়ে মিশেছে।

ডালিয়া পাউবো জানায়, ১৯৭৭ সালে তিস্তা নদীর ওপর ব্যারাজ, হেড রেগুলেটর ও ক্লোজার ড্যাম তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করে বাংলাদেশ সরকার। এ বিষয়টি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নজরে গেলে জলপাইগুড়ির গজলডোবায় (বাংলাদেশ থেকে ৬৩ কিলোমিটার উজানে) তারা ৯২১.৫৩ মিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণ করে। এই ব্যারাজটির মাধ্যমে ভারত তিস্তার মোট পানি প্রবাহের ৮০ শতাংশ নিয়ে তাদের কৃষিজমিতে সেচ দিচ্ছে।

ডালিয়া পাউবোর একজন প্রকৌশলী জানান, উদ্বৃত্ত ২০ শতাংশ পানি ভারত ভাটিতে ছাড়লেও ৬৩ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে এই স্রোতধারা বাংলাদেশের দোয়ানীতে ব্যারাজ এলাকার পথে একেবারেই ক্ষীণ হয়ে যায়। তিনি বলেন, ভারত যে সময়টাতে তাদের ব্যারাজের গেট বন্ধ করে দেয় তখন সর্বনিম্ন এক হাজার কিউসেক পানি সেচ খালে সরবরাহ নিলে আর ভাটিতে ছেড়ে দেওয়ার উপায় থাকে না।

আশ্বিনেই পানিশূন্য : গতকাল শনিবার বিকেলে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা ব্যারাজ এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাটের সবই বন্ধ। ফলে যতটুকু পানি পাওয়া যায় তা ঘুরিয়ে পাঠানো হয় তিস্তার সেচ খালে। ফলে মূল নদী থাকে প্রায় পানিশূন্য। এবার আশ্বিনের শুরুতেই যেন পানিশূন্য হয়ে পড়েছে তিস্তা। ব্যারাজের খানিকটা দূরেই জেগেছে বিস্তীর্ণ চর। আরেক পাশে খালের মতো একটি অংশ দিয়ে কিছুটা পানি বয়ে গেছে ভাটির দিকে।

পানির স্তর নিম্নমুখী : নদীতীরবর্তী এলাকার লোকজন বলছে, নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমে দুই কূল উপচে বিস্তীর্ণ এলাকায় দেখা দেয় বন্যা। এতে ভেসে যায় বসতভিটাসহ ঘরবাড়ি। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি না থাকায় নদীতীরবর্তী এলাকায় সেচ সংকটের পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় নলকূপে পানি মেলে না। এদিকে চরাঞ্চলের জমিতে আলুসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ করেও পানির অভাবে সেচ দিতে না পারায় কৃষকরা বছরের পর বছর ধরে লোকসান গুনছেন।

এ ব্যাপারে নদী গবেষক ও রিভারাইন পিপলসের পরিচালক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘অন্যান্য নদীর তুলনায় তিস্তা অত্যন্ত ভালো নদী। এখানে দখল-দূষণ তুলনামূলক কম। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে একতরফাভাবে ভারত পানি প্রত্যাহার করায় নদীটি দিন দিন মরে যাচ্ছে। এই অবস্থায় নদীর পানিবণ্টন চুক্তি বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।’

‘তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদে’র সভাপতি নজরুল ইসলাম হাক্কানি বলেন, ‘রংপুর অঞ্চলের প্রাণ তিস্তা নদী। অথচ সেই নদীটিই এখন প্রাণ হারাতে বসেছে। পানির ন্যায্য হিস্যার দাবি নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছি এবং তা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি সরকারের পরিকল্পনায় থাকা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নও দ্রুত করা উচিত বলে মনে করছি।’



সাতদিনের সেরা