kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

এক গ্রামেই ২৫ প্রতারক

নাটোর প্রতিনিধি   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এক গ্রামেই ২৫ প্রতারক

লালপুর উপজেলার মহারাজপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলামের (ইনসেটে) বাড়ি। ছবি : কালের কণ্ঠ

ইমোতে ভুয়া আইডি খুলে তরুণীদের ছবি ব্যবহার করা হয়। এরপর অ্যাপসের মাধ্যমে ছেলেদের কণ্ঠ মেয়েদের মতো তৈরি করে আলাপ করা হয়। এক পর্যায়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে অথবা হ্যাক করে টাকা নেওয়া হয়। নাটোরের লালপুর উপজেলার এই প্রতারণার কৌশল এখন সবার জানা।

স্থানীয় একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, এই উপজেলার মহারাজপুর গ্রামেই ২৫ প্রতারক রয়েছেন। এঁরা রাতারাতি ধনাঢ্য হয়েছেন। গড়ে তুলছেন আলিশান বাড়ি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যক্তি জানান, মহারাজপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলাম, আরিফুল ইসলাম, মাহবুবুল ইসলাম, বাবুল ইসলাম ও সাগর ইসলাম প্রতারণা করে প্রায় ৯০ লাখ টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। হবি ইসলাম প্রায় ৬০ লাখ টাকা, আসিফ আলী প্রায় ৫০ লাখ টাকা ও মাসুদ রানা প্রায় ৪০ লাখ টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। মিঠুন আলী, শাহিন আলী ও সাজন প্রায় ২০ লাখ টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। এ ছাড়া শিমুল আলী, রাজু আহমেদ, সুরুজ আলী, তারিকুল ইসলাম, বিজয় আলী, জয় আলী, নিলয় আলী, জনি ইসলাম, মোমিনুল ইসলাম, নাহিদুল ইসলাম, আসাদুল, সাগর ইসলাম, সালমান আলী ও জনি ইসলাম প্রায় ১০ লাখ টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন।

সম্প্রতি সেখানে গিয়ে লালপুর-নওপাড়া সড়কের নাগশোষা জামে মসজিদসংলগ্ন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি বাড়ি চোখে পড়ে। বাড়ির মালিকের দৃশ্যমান কোনো কর্ম নেই। নেই জায়গা-জমি। সেই বাড়ির মালিক সিরাজুল ইসলাম ওরফে পাকার কথায় প্রায় শতাধিক যুবক ওঠাবসা করে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হয়েছে কি না সন্দেহ থাকলেও ইমো চক্রের হোতা হিসেবে সহজে পরিচিতি লাভ করেন।

রাজমিস্ত্রি মোয়াজ্জেম হোসেনের ছেলে অপু প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিকে পা রেখেছিল। সেই ছেলেটি যে মোটরসাইকেল নিয়ে দাপিয়ে বেড়ায় তার দাম প্রায় তিন লাখ টাকা। এ রকম গাড়ি আরো দুজনকে কিনে দিয়েছে তার কাজে সহযোগিতার জন্য। অপুর বাবার বাড়ি করার মতো জায়গা না থাকলেও ছেলে জায়গা কিনে ভবন করেছে।

স্থানীয়রা জানায়, ২০১৭ সালে বিলমাড়িয়ায় ফেসবুকে ভুয়া আইডি খুলে ফোনে অ্যাপসের (ছেলে কথা বললে নারীকণ্ঠ হয়ে যায়) মাধ্যমে প্রবাসী যুবকদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া শুরু করে একটি চক্র। পরে এতে মেধাবীরা জড়িয়ে পড়ে। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে নাটোর গোয়েন্দা পুলিশের তৎকালীন ওসি আব্দুল হাইয়ের নেতৃত্বে ১১ জনকে আটক করা হয়। এর পর থেকে পুলিশের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে প্রতারণা বাড়ায় চক্রটি। বিলমাড়িয়ায় এই চক্রের দৃশ্যমান তেমন আয় না থাকলেও তারা ১০ লাখ থেকে কোটি টাকার মালিক বনে গেছে। এদের দেখাদেখি মহারাজপুর, মোহরকয়া, চকবাদকয়া, নওপাড়া, গণ্ডবিল, দুড়দুড়িয়া, মোমিনপুরসহ পাশের রাজশাহীর বাঘা উপজেলার সুলতানপুর ও চাঁদপুরে ইমো প্রতারকচক্র গড়ে উঠেছে।

এদিকে মহারাজপুর বাজারে গত রবিবার রাতে অভিযান চালিয়ে ছয় ইমো হ্যাকারকে আটক করেছে র‌্যাব। তাঁদের কাছ থেকে ১৬টি মোবাইল ফোন ও ৪২টি সিম জব্দ করা হয়েছে। র‌্যাব জানায়, সিপিসি ২, নাটোর ক্যাম্প, র‌্যাব-৫ রাজশাহীর একটি দল গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়েছে। আটকরা হলেন সিরাজুল ইসলাম পাকা (৩০), লায়েব উদ্দিনের ছেলে ফজলুর রহমান রুনু (৩৬), নাজমুল (২০), মেহেদী হাসান রাজা (১৯), আবুল কালাম আজাদ (২১) ও আশিক আহমেদ (১৯)।

আটকের আগে সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লোকের ভালো মানুষে দেখতে পায় না।’

বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোমিনুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতারকদের উপদ্রব থেকে আমরাও মুক্তি পেতে চাই। এমন জঘন্য কাজে অসাধু পুলিশ কর্মকর্তাও জড়িত থাকে।’

দুড়দুড়িয়া  ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হান্নান বলেন, ‘ইমো হ্যাকারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।’

অভিযোগ অস্বীকার করে লালপুর থানার ওসি ফজলুর রহমান বলেন, ‘ইমো চক্রের এই প্রতারণা বন্ধে পুলিশ সক্রিয় রয়েছে।’



সাতদিনের সেরা