kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

গানের গলায় ফেরির হাঁক

সুনামগঞ্জের বাউলরা কেউ টং দোকান খুলেছেন কেউ সবজি বেচেন, কেউ ফেরি করেন

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

৬ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গানের গলায় ফেরির হাঁক

সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার উজানীগাঁওয়ের বাউল লাল শাহ। গান-বাজনা বন্ধ থাকায় গ্রামে অন্যের জায়গায় ছোট একটি টং দোকান দিয়ে সংসারের হাল ধরেছেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

হাসন, রাধারমণ, শাহ আব্দুল করিম, রামকানাই, সুষমা দাসসহ অসংখ্য বাউল মহাজনের তীর্থভূমি সুনামগঞ্জ। দেশব্যাপী আউল-বাউলের দেশ হিসেবে পরিচিত। সাংস্কৃতিক এই তীর্থ ভূমির বাউলরা এখন ভালো নেই।

প্রায় দেড় বছর ধরে করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত তাঁদের জীবন। সংসার চালাতে অনেকে বাধ্য হয়ে পেশা বদল করেছেন। কেউ বাজারে সবজি বেচেন, কেউ টং দোকান দিয়েছেন। কেউ কেউ বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিভিন্ন জিনিস ফেরি করেন।

সুনামগঞ্জের এই মুহূর্তের প্রধানতম বাউল মকদ্দস আলম উদাসী। এ বছর তাঁকে সিলেট মুসলিম সাহিত্য সংসদ ও সুনামগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা প্রদান করে। সত্তরোর্ধ্ব এই বাউল গান ছাড়া জীবনে আর কিছু করেননি। দোতারা নিয়ে বাউল আসর মাত করতেন। এখন তিনি খুবই অসুস্থ। চিকিৎসা করাতে পারছেন না অর্থাভাবে, নিয়মিত খাবারও জুটছে না তাঁর। কোনো সহযোগিতাও পাচ্ছেন না এই নিভৃতচারী বাউল মহাজন।

শাহ আব্দুল করিমের সর্বশেষ প্রজন্মের শিষ্য সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার উজানীগাঁওয়ের বাউল লাল শাহ। তাঁর পুরো পরিবার বাউল-সাধক ভক্ত। ঝাঁকড়া চুলের একহারা গড়নের এই পেশাদার বাউল গান গেয়েই সংসারের জীবিকা নির্বাহ করেন। দুই সন্তান, বৃদ্ধ বাবা ও স্ত্রী নিয়ে তাঁর সংসার। মাটির ছোট ঘরে গান গেয়েই তাঁর জীবন চলে যাচ্ছিল। কিন্তু গত বছরের মার্চ থেকে তাঁর আয়-রোজগারের একমাত্র অবলম্বন গান-বাজনা বন্ধ রয়েছে। এখন তিনি গ্রামে অন্যের জায়গায় ছোট একটি টং দোকান দিয়ে সংসারের হাল ধরেছেন।

বাউল লাল শাহ সুনামগঞ্জের বাইরে ঢাকা, সিলেট, রাজশাহী, যশোরসহ বিভিন্ন স্থানে গান গাইতেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হতেন। গানের জন্য ভারতও সফর করে সেখানে আসর মাতিয়ে এসেছেন। কয়েক বছর ধরে তাঁর নিজ বাড়িতে ‘মানুষ উৎসব’ পালন করে তিনি জাতীয়ভাবে আলোচিত হন। সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি মানুষ উৎসবে দেশের প্রখ্যাত বাউল মহাজনদের ডেকে এনে মানবতাবাদী গান পরিবেশন করেন। বাউলরা সেখানে সুরে সুরে মানুষের বন্দনা করেন।

লাল শাহ বলেন, ‘এক বছরেরও অধিক সময় ধরে কোথাও কোনো আসরে ডাক পাইনি। বাড়ি থেকেই বের হতে পারছি না। যা আয়-রোজগার করেছিলাম সব শেষ। কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধু এই অবস্থা জেনে কিছু টাকা দিয়েছিল। সেই টাকায় গ্রামের আরেকজনের জায়গায় ছোট একটি টং তৈরি করে এখন দোকানদারি করছি। কিন্তু দোকান বেশি হওয়ায় বিক্রিবাট্টাও ভালো না। তাই কষ্টেই আছি।’

দিরাই-শাল্লা উপজেলার বাউল ও যন্ত্রশিল্পীদেরও দিন ভালো যাচ্ছে না। কোনো আসর মাতাতে পারছেন না তাঁরা। যন্ত্রে সুরের ঝংকার তুলতে না পারায় মর্মাহত তাঁরাও। শাল্লা উপজেলার বাউল শিল্পী সুজন বিশ্বাস এখন শাক-সবজি বেচে জীবিকা নির্বাহ করছেন। যে কণ্ঠে সুরের ঢেউ ছড়িয়ে হাজারো শ্রোতাকে মুগ্ধ করতেন, সেই কণ্ঠে হাঁক দিচ্ছেন ‘সবজি, সবজি’ বলে। এতে তাঁর মনে ভীষণ দুঃখ। শাল্লা উপজেলার আনন্দপুর গ্রামের বাজারে তিনি সবজি বেচে সংসার চালাচ্ছেন।

সুজন বিশ্বাস বলেন, ‘আমি আসরে গান গাই, বাদ্য বাজাই। তা দিয়েই আমার সংসার চলত। কিন্তু করোনার কারণে সব উৎসব বন্ধ থাকায় এখন গ্রামের বাজারে সবজি বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছি।’

একই গ্রামের পেশাদার বেহালাবাদক হরি দাস। আসর হলেই বেহালা বাজানোর আমন্ত্রণ পেতেন। এই আয়েই সংসার চলত তাঁর। এখন আসর বন্ধ থাকায় গ্রামে গ্রামে গিয়ে ফেরি করে বিভিন্ন জিনিস বেচে সংসার চালাচ্ছেন।

দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামের শাহ আব্দুল করিমের গানের পাণ্ডুলিপিকার বাউল আব্দুল তোয়াহেদ খুবই অর্থকষ্টে আছেন। অকৃতদার এই বাউল এখন খুবই অসুস্থ। তিনি করোনাকালে কোনো সহযোগিতা পাননি।

শাল্লা উপজেলার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও অধ্যাপক তরুণ কান্তি দাস বলেন, ‘আমাদের দিরাই-শাল্লার শত শত বাউল এখন বেকার। তাঁরা মানবিক সংকটে আছেন। কারো কাছে হাতও পাততে পারছেন না। তাই অনেকে যন্ত্র ফেলে পেশা বদল করেছেন। এতে গানের ক্ষতি হচ্ছে। সমাজের সুকুমার ও মানবিক বৃত্তি বিকাশে বাউলরা যুগ যুগ ধরে কাজ করছেন। করোনাকালে বাউলদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া উচিত।’

সুনামগঞ্জ জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী পাভেল বলেন, ‘করোনাকালে আমাদের শিল্পকলা একাডেমিসহ জেলা প্রশাসন বাউল শিল্পীদের আলাদাভাবে আর্থিক প্রণোদনা দিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে আলাদাভাবে ত্রাণও দেওয়া হয়েছে। তবে আরো চাহিদা রয়েছে। আমরা সবাইকে আর্থিক সহযোগিতা দিতে পারিনি।’

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘করোনার শুরু থেকেই জীবিকা বন্ধ বিভিন্ন পেশার অসহায় মানুষদের প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। বাউলদেরও আমরা একাধিকবার দিয়েছি।’



সাতদিনের সেরা