kalerkantho

বুধবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৮। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২১ সফর ১৪৪৩

আত্মঘাতী বালুর ব্যবসা

চিতলমারী-কচুয়া (বাগেরহাট) প্রতিনিধি   

৪ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আত্মঘাতী বালুর ব্যবসা

চিতলমারীতে নদীতে অবৈধ ড্রেজার। ছবি : কালের কণ্ঠ

দুটি পাইপ বালু তুলতে তুলতে মাটির নিচে যায়। একটি পাইপ তলদেশের শুকনো বেলেমাটি পানি দিয়ে ভেজাতে থাকে এবং অন্য পাইপটি ভেজা মাটি চুষতে থাকে। ভূগর্ভস্থ এই চুষে নেওয়া পানি মেশানো মাটি পাইপের মাধ্যমে তোলা হয়। আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায়, জমির উপরিভাগে কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু এক দিনে এই যন্ত্র প্রায় চার হাজার ফুট ভূগর্ভস্থ মাটি তোলে। এ কারণে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ড্রেজারকে স্থানীয়রা বলে ‘আত্মঘাতী’।

এই যন্ত্র দিয়ে একে তো ভূগর্ভস্থ বালু তোলা হচ্ছে, তার ওপর সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ও আবাসিক এলাকা থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটা বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার শ্যামপাড়া গ্রামে এই অনিয়ম ঘটলেও কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

গত রবিবার সরেজমিন দেখা যায়, মাছের ঘেরের মাঝের সমতল ফসলি জমি বর্ষার পানিতে ডুবে গেছে। সেখানে একাধিক প্লাস্টিক ড্রাম ভাসমান। তার ওপর তক্তা পাতিয়ে দুটো শ্যালো ইঞ্জিন, পাইপসহ নানা উপকরণ বসানো। শ্যালো ইঞ্জিন দুটো চালু করতেই বিকট শব্দদূষণে মুহূর্তে চারপাশের পরিবেশ অশান্ত হয়ে ওঠে। গাছ-লতাপাতার আড়ালের পাখিরা উড়ে পালায়। পানিতে থাকা মাছ, সরীসৃপরা ছোটে দিগ্বিদিক। প্রাণিকুল অস্থির হয়ে ওঠে। শুরু হয় বালু উত্তোলন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক জানান, এখন জমির ৬০ ফুট তলদেশ হতে বালু উত্তোলন চলছে। চরবানিয়ারী ইউনিয়নের দুর্গাপুর, শ্যামপাড়া গ্রামসহ আশপাশের এলাকার মাঠে জমির ১০ ফুট তলদেশেই বালু পাওয়া যায়।

ড্রেজার মালিক মো. মোস্তফা জানান, জমির নিচের বালু কেটে ওপরে ওঠানো যন্ত্রের স্থানীয় নাম আত্মঘাতী। আর নদী বা খালের নিচের বালু উত্তোলন যন্ত্রের নাম লোড, আনলোড। চিতলমারী উপজেলায় বালু কাটার শতাধিক যন্ত্র আছে। দুর্গাপুর গ্রামের হারান দে তাঁর কাছে ফসলি জমির ভূগর্ভের বালি বেচেছেন।

হারান দে প্রশ্ন করেন, ‘আমার জমির বালু বেচেছি, এতে ক্ষতির কী আছে?’

স্থানীয় উন্নয়নকর্মী নাহিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘মাটির নিচের বালু তোলার ফলে চিতলমারীর অবস্থা হচ্ছে ওপরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট। এমনিতে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে রয়েছি। ভূতল শূন্য করে দিলে ধ্বংস ডেকে আনতে বেশি সময় লাগবে না। এটা বন্ধ করা জরুরি।’

বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ধারা ৫-এর ১ উপধারা অনুযায়ী, পাম্প বা ড্রেজিং বা অন্য কোনো মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ বালু বা মাটি তোলা যাবে না। ধারা ৪-এর (খ) অনুযায়ী, সেতু, কালভার্ট, বাঁধ, সড়ক, মহাসড়ক, রেললাইন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা অথবা আবাসিক এলাকা থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে বালু তোলা নিষিদ্ধ। আইন অমান্যকারী দুই বছরের কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

স্থানীয়রা জানান, চিতলমারী-বাগেরহাট প্রধান সড়কের পাশে চিতলমারীর শ্যামপাড়া গ্রামে আবাসিক কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, সরকারি খাদ্য গুদাম, ফায়ার সার্ভিস কার্যালয়সহ বেসরকারি একাধিক প্রতিষ্ঠানের ভবন রয়েছে। এই স্থাপনা ও সড়ক হতে সর্বোচ্চ আধাকিলোমিটার এলাকার মধ্যে বালু তোলা হচ্ছে। এ কারণে নালুয়া-বড়গুনি পিচঢালাই সড়কের প্রায় চার শ ফুট নদীগর্ভে দেবে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ভয়ে আছে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, ‘ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট এলাকার ভূপৃষ্ঠ দেবে যেতে পারে। পরিবেশের বিপর্যয় ঘটতে পারে।’

উপকূলের উন্নয়নকর্মী শাহাদত হোসেন বাচ্চু বলেন, ‘এটা একই সঙ্গে পরিবেশ, সামাজিক ও বাস্তুসংস্থানজনিত সমস্যা সৃষ্টি করছে।’

চিতলমারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অশোক কুমার বড়াল জানান, পরিবেশ বিপর্যয়মূলক এই কাজের বিষয়ে সাধারণত কেউ অভিযোগ করে না। তবে আইনে নিষিদ্ধ এবং ক্ষতিকর এই কাজ বন্ধ হওয়া দরকার।

চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লিটন আলী জানান, এই কাজ যে বা যারা করবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলেই আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।