kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

শেরপুরের পরিস্থিতি

জুলাইয়ের মৃত্যু পাল্টে দিল হিসাব

গত জুন থেকে জেলায় করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে। জুলাইয়ে এ সংখ্যা সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। শুধু জুলাই মাসেই আক্রান্ত হয়েছে দুই হাজার ১২ জন। তন্মধ্যে ৪১ জনের মৃত্যু ঘটেছে, যা বিগত ১৬ মাসের মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যার দেড় গুণ

হাকিম বাবুল, শেরপুর   

২ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



জুলাইয়ের মৃত্যু পাল্টে দিল হিসাব

শেরপুরে করোনার প্রকোপ বাড়ছেই। গত জুন থেকে জেলায় করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে। জুলাইয়ে এ সংখ্যা সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। শুধু জুলাই মাসেই আক্রান্ত হয়েছে দুই হাজার ১২ জন। তন্মধ্যে ৪১ জনের মৃত্যু ঘটেছে, যা বিগত ১৬ মাসের মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যার দেড় গুণ। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের প্রতিদিনের স্বাস্থ্য বুলেটিন পর্যালোচনায় এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পরিসংখ্যান মতে, জেলায় প্রথম করোনাভাইরাসে (কভিড-১৯) আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় ২০২০ সালের ৫ এপ্রিল। সেই থেকে এ বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত জেলায় মোট আক্রান্ত হয়েছে তিন হাজার ৫৬৬ জন। আর মৃত্যু ঘটেছে ৭১ জনের। অথচ এপ্রিল-২০২০ থেকে মে-২০২১ পর্যন্ত ১৪ মাসে আক্রান্ত হয় ৭৬৬ জন এবং মৃত্যু ঘটে ১৫ জনের, কিন্তু গত জুন থেকে প্রতিদিন লাফিয়ে বাড়তে থাকে করোনা রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা। এ মাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে বিগত ১৪ মাসের সমান হয়ে যায়। অর্থাৎ জুনে নতুন ৭৮৮ জন শনাক্তসহ মোট আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৫৫৪ এবং নতুন ১৫ মৃত্যুসহ জেলায় মোট মৃত্যু ঘটে ৩০ জনের। জুলাইয়ে এই সংখ্যা চরমে পৌঁছে। এ মাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা এক লাফে বেড়ে বিগত ১৬ মাসের দেড় গুণ হয়ে যায়। জুলাই মাসে নতুন করে আক্রান্ত শনাক্ত হয় দুই হাজার ১২ জন এবং মারা যায় ৪১ জন। আক্রান্তের হার ১০.৩৬ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৬.৬৬ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১.৯৩ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ শতাংশ।

যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি না মানা, লকডাউন না মেনে বাড়ির বাইরে বের হওয়া, জনসমাগম এড়িয়ে না চলা, উপসর্গ থাকলেও যথাসময়ে করোনা পরীক্ষা না করার কারণে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার বড় কারণ বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। বর্তমানে জেলায় করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৯০০ জন। তন্মধ্যে ৮৮ জন ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের কভিড ও আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে। অন্যরা বাড়িতে হোম আইসোলেশনে রয়েছে।

পরিসংখ্যানে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা সদর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি। তবে জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সদরে কিছুটা কমতে থাকলেও নালিতাবাড়ী, নকলা ও ঝিনাইগাতী উপজেলায় বাড়তে থাকে। করোনা শুরুর পর থেকে গত মে পর্যন্ত (১৪ মাস) হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে মোট এক হাজার ৪৪০জন। গেল জুন মাসে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ৬০০ জন। আর জুলাই মাসে এ সংখ্যাও দেড় হাজার ছাড়িয়েছে। যে কারণে হাসপাতালে করোনা রোগীদের চিকিৎসায় অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে।

শেরপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. খায়রুল কবির সুমন বলেন, ‘করোনা রোগীর জন্য শয্যা বরাদ্দ ১০০টি। গেল জুলাইয়ে প্রতিদিনই ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিলো ১০০-এর ওপরে।’ তিনি জানান, করোনা রোগীদের জন্য হাসপাতালে অক্সিজেন বেশি লাগলেও পাঁচ হাজার লিটারের সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপ্লাই থাকায় খুব একটা সংকট হয়নি। তিন-চার দিন পর পর তিন হাজার লিটার করে অক্সিজেন লেগেছে। ৩১ জুলাই শনিবারও ১০২ জন করোনা রোগী ভর্তি ছিল। তবে ১ আগস্ট রবিবার কয়েকজনকে ছুটি দেওয়ায় এদিন ৮২ জন করোনা রোগী চিকিৎসাধীন। দেড় শ রোগীকে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও লোকবল সংকটের কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘সরকারের কাছে জরুরি ভিত্তিতে লোকবল চাওয়া হয়েছে। কিছু লোকবল দেওয়ার কথা শুনেছি, কিন্তু এখনো পাওয়া যায়নি। তবে আমারা সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে করোনাসহ সব ধরনের রোগীদের সেবা দেওয়া চেষ্টা করছি। প্রয়োজনে বিকল্প ব্যবস্থা করে হলেও করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হবে।’

অক্সিজেন নিয়ে হাসপাতালে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা

এদিকে নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো ব্যক্তি বা স্বেচ্ছাসেবীকে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে সরাসরি হাসপাতালগুলোতে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

সিভিল সার্জন এ কে এম আনওয়ারুর রউফ বলেন, ‘করোনায় আক্রান্ত হয়ে যাঁরা বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাঁরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অক্সিজেন নেবেন না। কোন রোগীর কখন, কী পরিমাণ ও কত সময়ের জন্য অক্সিজেন লাগবে—সেটা একমাত্র চিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন। হাসপাতালে অক্সিজেন সংকট কেটেছে। কাজেই বাড়িতে অক্সিজেন নেওয়ার বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে হবে।’

ফেসবুকে চিকিৎসকদের ফোন নম্বর

অন্যদিকে করোনাভাইরাসের অবনতিশীল পরিস্থিতিতে শেরপুরে এবার জনস্বার্থে সেবাদানকারী চিকিৎসকদের নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। গতকাল

রবিবার সকালে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ফেসবুক পেজে শেরপুর সদরসহ পাঁচ উপজেলার জনসাধারণের সুবিধার্থে ১৭ জন চিকিৎসকের নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়। সেই সঙ্গে ওই তালিকায় দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের মোবাইল ফোন নম্বরও। কেউ জর, সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা অথবা শ্বাসকষ্ট অনুভব করলে সরাসরি জেলা সদরের ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে না গিয়ে ওই তালিকায় প্রকাশিত চিকিৎসকদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে পরামর্শ নিতে পারবে।

 

আহমেদ নূর, সিলেট

সিলেট বিভাগে করোনার সংক্রমণ ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে যে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল তা তার চেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মারা গেছে শুধু গত জুলাইতে। গত মাসে বিভাগে করোনা শনাক্ত হয়েছে ১৪ হাজার ৪৭১ জনের, মারা গেছে ২২৪। এর আগে গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে শনাক্ত হয় ১০ হাজার ৪৮৮, আর মারা যায় ২১৫ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের করোনাসংক্রান্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। বর্তমানে সিলেটে সংক্রমণের ‘পিক টাইম’ চলছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদনে আরো দেখা যায়, কঠোর বিধি-নিষেধ চলাকালে জুলাই মাসের প্রথম ১৪ দিনে বিভাগে করোনা শনাক্ত হয় পাঁচ হাজার ৪৪৮ জনের, মারা গেছে ৬৮, কিন্তু জুলাই মাসের দ্বিতীয়ার্ধে বিভাগে শনাক্ত হয় ৯ হাজার ২৩, আর মারা যায় ১৫৬ জন। মাঝখানে আট দিন বিধি-নিষেধ শিথিলের কারণে দ্বিতীয়ার্ধে সংক্রমণ বেড়েছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে করোনা শনাক্ত হয় ৫০৯ জনের, আর মারা যায় ১২ জন। ফেব্রুয়ারিতে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৩০৩ ও ৩। মার্চে শনাক্ত হয় এক হাজার ১৮৬, মারা যায় ১২; এপ্রিলে শনাক্ত হয় তিন হাজার ২০১, মারা যায় ৬০; মে মাসে শনাক্ত দুই হাজার ৪, মারা যায় ৫৯ এবং জুনে শনাক্ত হয় তিন হাজার ২৮৫, আর মারা যায় ৬৯ জন। তবে জুলাই মাসে এসে হঠাৎ করেই বিভাগে করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকে।

এদিকে জুলাই মাস শেষও হয়েছে রেকর্ড গড়ে। মাসের শেষ দিন গত শনিবার বিভাগে করোনা শনাক্ত হয়েছে ৯৯৬ জনের, যা এ পর্যন্ত এক দিনে সর্বোচ্চ শনাক্তের রেকর্ড। এর আগের সর্বোচ্চ রেকর্ডটিও হয়েছে জুলাই মাসে। গত ২৯ জুলাই করোনা শনাক্ত হয় ৮০২ জনের। মাসের শেষ দিনে ৯৯৬ জনের শনাক্তের মধ্য দিয়ে বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ৪০ হাজার ছাড়িয়েছে। বিভাগে এখন করোনা রোগীর সংখ্যা ৪০ হাজার ৪৫২। আর জুলাই মাসের শেষ দিন বিভাগে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

জুলাই মাসের শেষ দিন শনিবার বিভাগে দুই হাজার ৫৬৬টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। মোট পরীক্ষার ৩৮.৮২ শতাংশেরই করোনা শনাক্ত হয়। এর মধ্যে সিলেট জেলায় শনাক্তের হার ৪০.৯২ শতাংশ, সুনামগঞ্জে ২৫.৭৩, হবিগঞ্জে ৪৪.৩২ এবং মৌলভীবাজারে ৩৬.১৮ শতাংশ।

সিলেটে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন

ডা. জন্মেজয় দত্ত কালের কণ্ঠকে বলেন, যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণেই সংক্রমণ বাড়ছে। আর যেহেতু সংক্রমণ বাড়ছে, সেহেতু মৃত্যু বাড়তে পারে।’

বর্তমানে সিলেটে সংক্রমণের পিক টাইম চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হয়তো আগামীতে এটা কমবে।’ তবে স্বাস্থ্যবিধি না মানলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।



সাতদিনের সেরা