kalerkantho

রবিবার । ৪ আশ্বিন ১৪২৮। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১১ সফর ১৪৪৩

মানবপাচার প্রতিরোধ দিবস আজ

রঙিন স্বপ্নে জীবনবাজি

ইয়াহইয়া ফজল, সিলেট   

৩০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



একসময় সিলেট নগরের তালতালা এলাকায় একটি ডিপার্টমেন্টাল শপ ছিল তাঁর। আয়-রোজগার ভালোই ছিল। আরো উন্নত জীবনের আশায় ২০১৮ সালের শেষের দিকে তিনি ইউরোপে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আট লাখ টাকার চুক্তি হয় ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। কথা হয় আকাশপথে ইতালিতে পৌঁছে দেবে তারা। সে অনুযায়ী অগ্রিম টাকাও দেন তিনি। তবে তাঁকে যেতে বাধ্য করা হয়েছে লিবিয়া হয়ে ছোট নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে। পথে নৌকাডুবিতে মৃত্যুর মুখে পড়েছিলেন। বেঁচে গিয়ে বন্দিদশা কেটেছে ইতালিতে। এখন সেখানেই কাজ করছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই যুবক।

তবে সবাই এই যুবকের মতো ভাগ্যবান নয়। বরং নির্যাতন, ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হয়ে অনেকে সব খুইয়ে ফিরে এসেছেন দেশে। কেউ সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণটাই হারিয়েছেন।

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে তিউনিশিয়া উপকূলে নৌকা ডুবে ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে দেশে ফেরেন সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার মাহফুজ আহমদ মাসুম। কিন্তু চোখের সামনে নিজের ছোট ভাই কামরান আহমদ মারুফ (২৪) এবং একই উপজেলার আফজাল মাহমুদকে সাগরে ডুবে যাওয়ার স্মৃতি এখনো তাড়া করে ফেরে তাঁকে।

সেই নৌযাত্রায় মারুফসহ ৬৫ জন সাগরে ডুবে মারা যান। এ ঘটনা বিশ্বে আলোড়ন তুললেও থামেনি সাগরপথে ইউরোপ যাত্রা।

কিন্তু কেন এভাবে বিদেশে যেতে মরিয়া হয়ে ওঠেন বাংলাদেশিরা? সিলেটের লোকজনই বা কেন? এ প্রশ্নে অভিবাসীদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে কাজ করা ইমিগ্রেশন লইয়ার ব্যারিস্টার জাকির সাইমন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দশকের পর দশক ধরে সিলেটের মানুষ ব্রিটেনমুখী। আগে এখানে আসার নানা সুযোগ ছিল। বিশেষ করে স্পাউস ভিসায় আসাটা সবচেয়ে সহজ ছিল। স্পন্সর দেখিয়েও অনেকে এখানে এসে পালিয়ে যেতেন। পরে নানাভাবে স্থায়িত্ব পেয়ে যেতেন। স্টুডেন্ট ভিসা, রাজনৈতিক আশ্রয় ইত্যাদি সুবিধা ছিল। কিন্তু এখন এসব পথ অনেকটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিকল্প হিসেবে উন্নত জীবনের আশায় অনেকে ইউরোপে যাচ্ছেন।’

এ বিষয়ে পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন অলি মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘দরিদ্র দেশ থেকে আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হতে চলেছি ঠিকই, কিন্তু আমরা সেই তুলনায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারিনি। আবার যাঁদের কর্মসংস্থান হচ্ছে, তাঁদের অনেকে চাহিদা অনুযায়ী বেতন পাচ্ছেন না। ফলে তাঁরা হতাশ হয়ে পড়ছেন এবং এ থেকে উত্তরণের জন্য অনেকের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘সিলেটের মানুষের মধ্যে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা পুরনো। তরুণদের অনেকে দেখা যায় পড়াশোনা কিংবা চাকরি-ব্যবসায় মনোযোগী না হয়ে বিদেশে যাওয়ার চিন্তায় থাকেন। ভালো সুযোগ না পেয়ে অনেকে সর্বনাশা সাগরপথকে বেছে নিচ্ছেন।’

প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করেছেন বাংলাদেশ ওভারসিজ সেন্টার সিলেটের সাবেক নির্বাহী শামসুল আলম। তিনি বলেন, ‘এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম আরো বেশি বিস্তৃত করা দরকার।’

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামাল আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘উন্নত জীবনের লোভে তারা সহজেই দালালচক্রের ফাঁদে পা দিচ্ছে।’