kalerkantho

রবিবার । ৪ আশ্বিন ১৪২৮। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১১ সফর ১৪৪৩

ভেজাল ফেনসিডিল বিরামপুর সীমান্তে

মাহাবুর রহমান, বিরামপুর (দিনাজপুর)   

৩০ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ভেজাল ফেনসিডিল বিরামপুর সীমান্তে

ভেজাল ফিনসিডিলে ছেয়ে গেছে দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকা। ভারত থেকে অন্য একটি ওষুধ এনে তা বোতলে ভরে ফেনসিডিলের মোড়ক যেমন লাগানো হচ্ছে, তেমনি হোমিও ওষুধ, গ্লুকোজ ও পানি মিশিয়ে স্থানীয়রা তৈরি করছে ভেজাল ফেনসিডিল। এই নেশা শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতের ত্রিমোহিনী থেকে বালুঘাট এলাকায় বেশ কিছু কারখানা গড়ে উঠেছে নতুন একটি মাদকের, যা দেখতে অবিকল ফেনসিডিলের মতো। যদিও বোতলের গায়ে ভারতীয় ‘শিমর’ জেলার নাম উল্লেখ আছে। এই বোতলগুলোকে ভারতের হিলিতে আনা হয় তরল (খোলা) হিসেবে। পরে সেখান থেকে বেশ কয়েকটি স্থানে বোতলজাত করে বাংলাদেশে ঢোকানো হয়। এ জন্য ভারতের প্রায় ৫০ জন পরিবেশক নিয়োগ করা আছে। তাঁদের মধ্যে ত্রিমোহিনীর দত্ত বাবু, তাঁর ছেলে নেপাল এবং গোপাল কালিকাপুরের মোজাফফর রহমান অন্যতম। ভারতে নতুন মাদকটির দাম ২০০ টাকা। সেটিই বাংলাদেশে দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকায় বেচা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মাদক কারবারি জানান, ফেনসিডিলের পুরনো একটি বোতলের দাম ৫০ টাকা, নতুন একটি মুখ ১৫০ টাকা, হোমিও ওষুধ ও গ্লুকোজ পানিতে মিশিয়ে ৪০ টাকাসহ ১০০ মিলিলিটার ফেনসিডিল তৈরি করতে মোট ২৪০ টাকা খরচ হয়। কিন্তু এই বোতল বিক্রি হয় দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকায়। হোমিও ওষুধটি ভারতের হিলি শহর থেকে দুই হাজার টাকা বোতল কেনা হয়। সেই একটি বোতল দিয়ে দুই হাজার বোতল ফেনসিডিল তৈরি করা সম্ভব।

স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, ভারতীয় অংশের বলপাড়া গ্রামের আনিছুর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর লাইনম্যান হিসেবে কাজ করেন। তাঁকে সহযোগিতা করেন বলপাড়ার ইউসুফ, কালিপদ ও নিখিলচন্দ্র। উঁচা গোবিন্দপুরের স্বপন বৈরাগী, গেদলা, পার্থ, কালিপদ, উপক, দিপক এবং নিচা গোবিন্দপুরের মিঠুন, আশিক, নুর ইসলাম, ভোলা, শফিকুল, রুবেল, শাহিন, সুলতান ও আলম এগুলো বাংলাদেশে পাচার করেন। এ ছাড়া হিলি শহর, পানজুল, ত্রিমোহিনীতে বোতলের নতুন মুখ তৈরি করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মাদক কারবারি বলেন, ‘বর্তমানে ভারত থেকে যেসব ফেনসিডিল বাংলাদেশে প্রবেশ করে তার সবই নকল। শুধু তা-ই নয়, কারবারিরা পানিতে হোমিও ওষুধ ও গ্লুকোজ মিশিয়ে বাড়িতে বসেই তৈরি করছেন স্বচ্ছ ফেনসিডিল।’

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে দিনাজপুর জেলা পুলিশ প্রকাশিত ‘আলোকচ্ছটা’ নামের বই অনুযায়ী, এই উপজেলায় মাদক কারবারির সংখ্যা ৫২ জন, সেবনকারী ৩৬ জন এবং বহনকারী ৩০ জন। বর্তমানে সেই সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে বলে মনে করছে স্থানীয় লোকজন।

স্থানীয়রা জানায়, কাজিপাড়া ও গোবিন্দপুর গ্রামে ৫০টি বাড়িতে খুচরা বিক্রি হয় ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন নেশা। পাশের চণ্ডিপুর, কাটলাবাজার, হরিহরপুর, কাটলা হাসপাতাল মোড়, কাটলা টেম্পু মোড়, খিয়ার মামুদপুর, কাটলা হাড়িপাড়া, দক্ষিণ রামচন্দ্রপুর, দামোদরপুর, জোতবানি, শিবপুর ও আয়ড়ামোড়ের প্রায় ৩০০ বাড়িতে এবং বিরামপুর রেলস্টেশন, শিমুলতলী, গড়েরপাড়, মির্জাপুর, আদিবাসীপাড়া, ইসলামপাড়া (উপজেলা কারাগার), ঘোড়াঘাট রেলগুমটি এলাকায় প্রায় ৫০ স্থানে মাদক খুচরা বিক্রি হয়।

এ বিষয়ে বিরামপুর থানার পরিদর্শক সুমন কুমার মহন্ত জানান, তাঁরা নিয়মিত মাদক কারবারিদের আটক করে মামলা দিচ্ছেন। অনেক স্থানে অভিযানকালে ফেনসিডিলের খালি বোতল পাওয়া যাচ্ছে। সেই থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ফেনসিডিলের পুরনো বোতলেই নতুন পানীয় ব্যবহার করা হচ্ছে। সম্প্রতি বেশ কয়েক বোতল নতুন নেশাজাতীয় ভারতীয় বোতলসহ আসামিকে আটক করা হয়েছে।

বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা শাহরিয়ার ফেরদৌস হিমেল বলেন, ‘নেশা এমনিতে ক্ষতিকর। এই ভেজাল নেশা আরো ক্ষতিকর। দীর্ঘদিন এই নেশা করলে মস্তিষ্ক বিগড়ে যাওয়াসহ মানুষের কর্মক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।’