kalerkantho

বুধবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৮। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৪ সফর ১৪৪৩

‘গেম’ খেলতে গিয়েই মৃত্যু

২৮ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘গেম’ খেলতে গিয়েই মৃত্যু

‘ব্লু হোয়েল’ নামে এক অনলাইন গেমের কথা মনে আছে? পৃথিবীজুড়ে তরুণরা আসক্ত হয়ে মারা যাচ্ছিল। সেই গেম গুগল প্লে স্টোর থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে যেসব তরুণ ইউরোপ/ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে লিবিয়া যাচ্ছেন, তাঁদের প্লাস্টিকের নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ পথটাকে আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা নাম দিয়েছে ‘গেম’। উত্তাল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে বারবার ঘটছে নৌকাডুবি, ঘটছে প্রাণহানি। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া কতটা কঠিন? এই প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করেছেন আমাদের শরীয়তপুর প্রতিনিধি আব্দুল আজিজ শিশির

 

ভূমধ্যসাগরে গত মে মাসে ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে যাওয়া নৌকায় ছিলেন শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার পাচক গ্রামের মিলন বেপারী (২৩)। গত জুনে দেশে ফিরেছেন তিনি। এই ভূমধ্যসাগরেই গত ১৯ জুলাই নৌকাডুবিতে ১৭ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে, নিখোঁজ রয়েছে অনেকে। এই নিখোঁজদের মধ্যে শরীয়তপুরের দুই যুবকও রয়েছেন।

বেঁচে ফেরা মিলন বেপারী জানান, ইউরোপের দেশ ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর। নড়িয়া উপজেলার উপসি গ্রামের দালাল সফিক শেখের মাধ্যমে একটি রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে চুক্তি হয়। গত মে মাসে শরীয়তপুর থেকে প্রথমে ঢাকায় যান। ঢাকা থেকে উড়োজাহাজে দুবাই। দুবাই থেকে লিবিয়ার বেনগাজিতে। সেখান থেকে সড়কপথে ত্রিপলি। ইতালি পৌঁছে দেওয়ার পর টাকা নেওয়া হবে—এমন টোপ ফেলে আগেই নেওয়া হয় পাসপোর্ট। এদিকে ত্রিপলিতে নিয়েই তুলে দেওয়া হয় পাচারকারী চক্রের হাতে। একটি ঘরের মধ্যে অবরুদ্ধ করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় খাবারদাবার। বাঁচিয়ে রাখার জন্য পাঁচ-সাত দিন পরে একটু রুটি অথবা খবুজ দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় টাকা আদায়ের পালা। ফোন করে স্বজনদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে দিতে হয় তাঁদের। আদায় করা হয় চার থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা। ওই টাকা তুলে দেওয়া হয় পাচারকারীর স্বজনদের হাতে। সময়মতো টাকা দিতে না পারলে চলে নির্মম নির্যাতন।

এর পরই শুরু হয় ইতালিতে গেম খেলার পালা। এবার গেমের জন্য টাকা সংগ্রহ করতে শুরু হয় আবার নির্যাতন। ফোন দিয়ে স্বজনদের বলা হয় পাচারকারীর স্বজনদের হাতে টাকা তুলে দিতে। জনপ্রতি আদায় করা হয় তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা করে। এই পর্যায়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে যাত্রা শুরু হয় ইতালির উদ্দেশে। ত্রিপলি থেকে প্রায় ১১০ জন যাত্রী নিয়ে নৌকা ছাড়ে। ছেড়ে যাওয়ার পর ২১ ঘণ্টা ভূমধ্যসাগরে চলে এটি। মাঝসমুদ্রে যাওয়ার পর হঠাৎ একটি ঝড়ে ডুবে যায় তাঁদের নৌকা। তিউনিশিয়ার কোস্ট গার্ড তাঁদের উদ্ধার করে। ওই ট্রলারে থাকা ১০ বাংলাদেশি গত জুনে ফিরে এসেছেন।

ফিরে আসা নড়িয়া উপজেলার পাচক গ্রামের ইমন শিকদার (২১) বলেন, ‘এই পথে যেতে এত কষ্ট হয় তা আমাদের আগে বলেনি। দালাল বলছে, কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে এনেছে। আর কেউ যেন দালালদের খপ্পরে পড়ে এই পথে পাড়ি না জমায়।’

নিখোঁজদের স্বজনের কান্না থামে না

একই পথে ২০১৯ সালে নিখোঁজ হয়েছেন নড়িয়া উপজেলার দক্ষিণ চাকধ গ্রামের জুম্মন হাওলাদার (১৯) ও নলতা গ্রামের সুমন মোল্লা (২২)। আজও তাঁদের পরিবারে চলছে মাতম। এখন তাঁদের ফিরে পাওয়ার আশায় পথ চেয়ে আছেন স্বজনরা।

জুম্মনের মা জোহরা বেগম বলেন, ‘২০১৯ সালে আমার ছেলে লিবিয়া থেকে ইতালির উদ্দেশে নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দেয়। ওই সময় আমার ছেলে যে নৌকায় ছিল তা ডুবে যায়। এখনো আমার জুম্মনের কোনো খোঁজ পাইনি। অনেকের মৃতদেহ দেশে এসেছে. আমার জুম্মনের কিছুই পাইনি।’

সুমনের বোন রহিমা বেগম বলেন, ‘আমার ভাই জুম্মনের সঙ্গে একই ট্রলারে ছিল। এখনো তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ওই ট্রলারে থাকা অনেকেই নিখোঁজ রয়েছে।’

গত বুধবার ভূমধ্যসাগরে নিখোঁজ নড়িয়া উপজেলার নওগাঁ গ্রামের সেলিম কাজীর ছেলে কাজী ফিরোজ আহাম্মেদ (৩০)। গতকাল তাঁদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মা সকিনা বেগম খাটের এক কোণে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। দুই চোখের পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। সমবেদনা জানাতে ছুটে এসেছেন গ্রামের লোকজন ও আত্মীয়-স্বজনরা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সকিনা বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলে। অনেক কষ্ট করে এমএ পাস করিয়েছিলাম। ছেলেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল আমার। সব কিছু শেষ হয়ে গেল। প্রায় তিন মাস আগে লিবিয়া যায় ছেলে। এরপর ১৯ জুলাই শেষ কথা হয়েছে। ফোনে বলেছিল মা ঈদের পরের দিন ইতালির উদ্দেশে নৌকায় করে সাগর পাড়ি দেব। এরপর আর আমার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। সাগরে নৌকাডুবির কথা শুনে আমরা লিবিয়ার দালাল সুজন ছৈয়ালের সঙ্গে কথা বলেছি। সুজন ফোনে জানিয়েছে ফিরোজের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। আমি শুধু আমার ছেলেকে চাই। আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।’

একই দিন নিখোঁজ শিলংকর গ্রামের লালমিয়া ছৈয়ালের ছেলে নুর আলম (১৯)। তাঁর মা শাহিদা বেগম বলেন, ‘নদীভাঙনে আমাদের সব কিছু নিঃশেষ হয়ে গেছে। আমরা মানুষের কাছে আশ্রিতা হয়ে আছি। ফের আমার সব কিছু শেষ হয়ে গেল।’

দালালরা পলাতক

নৌকাডুবির ঘটনা শুনেই গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছেন স্থানীয় দালালচক্রের সদস্যরা। মানব পাচারকারী নড়িয়া উপজেলার বাংলাবাজারের ফয়সাল মোল্লা ও সুজন ছৈয়ালের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। এলাকাবাসী জানায়, তাঁরা সবাই গাঢাকা দিয়েছে। তবে ছেলের এমন কাজে লজ্জিত উপসি গ্রামের মানব পাচারকারী শফিক শেখের মা শাহেরা বেগম।

পুলিশের বক্তব্য

এ বিষয়ে শরীয়তপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (নড়িয়া সার্কেল) এস এম মিজানুর রহমান বলেন, ‘সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ হয়েছে বলে আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। কেউ অভিযোগ করলে আমরা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।’



সাতদিনের সেরা