kalerkantho

শুক্রবার । ৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৩ জুলাই ২০২১। ১২ জিলহজ ১৪৪২

বাবা দিবস আজ

বাবা, কত দিন দেখি না তোমায়...

পাথরঘাটায় ১৪ বছরেও ফেরেননি নিখোঁজ ৪৬ বাবা

মির্জা খালেদ, পাথরঘাটা (বরগুনা)   

২০ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বাবা, কত দিন দেখি না তোমায়...

আবদার পূরণ করতে বাবা শফিকুল ইসলাম তাঁর শিশুকন্যা শিমুকে সাইকেলের সামনে দাঁড় করিয়ে এভাবেই বেরিয়ে পড়েছেন রাস্তায়। গতকাল রংপুর সদর উপজেলার সদ্যপুষ্করিণী ইউনিয়নের যানকি ধাপেরহাট থেকে তোলা। ছবি : আদর রহমান

আজ থেকে ১৪ বছর আগে এক ভয়াবহ রাতে হারিয়ে যাওয়া ৪৬ জন বাবা আজও ঘরে ফিরে আসেননি। তাঁরা মৃত নাকি জীবিত—এ প্রশ্নেরও উত্তর নেই প্রশাসন কিংবা জনপ্রতিনিধিদের কাছে। ফলে তাঁদের রেখে যাওয়া ৮৮ জন সন্তান এখনো প্রিয় বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায়।

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় ‘সিডরে’ সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে হারিয়ে যান ৪৬ জেলে। এরপর আর তাঁরা ফিরে না আসায় ও তাঁদের লাশ না পাওয়ায় সবাইকে নিখোঁজ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ঘূর্ণিঝড় সিডরে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায় বিভিন্নভাবে ৩৪৯ জন মানুষ মারা যায়। এর মধ্যে নারী, পুরুষ ও শিশু রয়েছে। তাদের বেশির ভাগই জেলে। এর বাইরে আরো ৪৬ জন জেলে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও লাশ পাওয়া যায়নি বলে তাঁদের মৃত না বলে নিখোঁজ বলে অভিহিত করছে প্রশাসন। এই ৪৬ জেলে বাড়িতে রেখে গেছেন তাঁদের সবার স্ত্রীসহ ৮৮ জন সন্তান। তাঁদের রেখে যাওয়া সন্তানদের বয়স ছিল দুই মাস থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত। এরপর অনেক কষ্টে কেটেছে সন্তানদের জীবন। তাঁদের মায়েরা অনেক কষ্ট করে বড় করে তুলেছেন এই পিতৃহারা সন্তানদের।

পাথরঘাটা উপজেলার বাদুরতলা গ্রামের জেলে পল্লীর বাসিন্দা জাকির হোসেন সিডরে নিখোঁজ হন। তাঁর স্ত্রী মাসুরা বেগম বলেন, ‘স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর অভাবের সাগরে পড়ে যাই। দুই মাসের এক সন্তানসহ চার মেয়ের ভার পড়ে আমার কাঁধে। পুষ্টিকর খাদ্য ও চিকিৎসা দিতে না পারায় ছোট সন্তানটি কিছুদিনের মধ্যেই মারা যায়। মেয়েদের কম বয়সেই বিয়ে দিতে হয়েছে। সরকারের কাছে বিধবা ভাতার আবেদন করেছিলাম, তা পাইনি। কারণ স্বামীকে হারানোর ১৪ বছরেও আমি নাকি বিধবা হতে পারিনি।’

নিখোঁজ জেলে খলিলুর রহমানের স্ত্রী কমলা বেগম আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘আমি সধবা নাকি বিধবা—তা বুঝতে পারছি না। প্রশাসন বিধবার স্বীকৃতি দিতে নারাজ। এখন দিনমজুরি করে সংসার চালাচ্ছি।’ নিখোঁজ জেলে খলিলুর রহমানের মেয়ে সুখী আক্তার বলেন, ‘বাবার দু-একটি কথা মনে আছে। বাবা বলতেন, আমাকে উচ্চ শিক্ষিত করবেন। আমার ইচ্ছা ছিল শিক্ষক হওয়ার। কিন্তু গ্রাম্য মাতবরদের কারণে কিশোরী বয়সেই আমাকে বিয়ে দিতে বাধ্য হন মা। এখন গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে কাজ করছি। তবে বাবা জীবিত থাকলে আমাকে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে কাজ করে বাঁচতে হতো না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও গবেষক গওহার নাঈম ওয়ারা বলেন, ‘উপকূলে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে অনেক জেলে নিখোঁজ হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনায় রেখে যাওয়া সন্তানদের সমাজসেবা বিভাগের শিশু কল্যাণ কমিটিসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে কাজ করার সুযোগ আছে।’

এ ব্যাপারে পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবরিনা সুলতানা বলেন, ‘এটি অনেক আগের ঘটনা। তাই বিস্তারিত মতামত দিতে পারছি না। তবে এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করে নিখোঁজদের মৃত্যুর স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।’



সাতদিনের সেরা