kalerkantho

শুক্রবার । ৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৩ জুলাই ২০২১। ১২ জিলহজ ১৪৪২

সাতক্ষীরায় রাতে ২৭ ঘর দখল!

মোশাররফ হোসেন, সাতক্ষীরা   

২০ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সাতক্ষীরায় রাতে ২৭ ঘর দখল!

মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় সাতক্ষীরা সদরের ভোমরা ইউনিয়নের হাড়দ্দহ গ্রামে নির্মিত ২৭টি ঘর রাতের আঁধারে দখল করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল বদলি হয়ে চলে যাচ্ছেন—এমন খবরের ভিত্তিতে স্থানীয় একটি দালালচক্র আর্থিক সুবিধা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে ঘর দখলে সহযোগিতা করে বলে অভিযোগ।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিস সূত্রে জানা গেছে, মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় সাতক্ষীরা সদরের ভোমরা ইউনিয়নের হাড়দ্দহ গ্রামে প্রথমে এক লাখ ৭০ হাজার এবং পরে এক লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয়ে ৪৭টি ঘর নির্মাণ করা হয়। ঘর নির্মাণের বরাদ্দ পান শ্যামনগরের ঠিকাদার শহীদুল ইসলাম। ঘর পাওয়ার জন্য আবেদন করেন এক হাজার ৬০০ ভূমিহীন, গৃহহীনসহ কিছু বিত্তশালী লোক। যাচাই-বাছাই শেষে তালিকাভুক্ত করা ৪৭টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের মধ্যে ২০ জনকে বৃহস্পতিবার সাতক্ষীরা সদর সাবরেজিস্ট্রি অফিস থেকে দলিল করে দেওয়া হয়। বাকি ২৭টি দলিল বিশেষ ব্যবস্থাপনায় রেজিস্ট্রি করার কথা। আজ রবিবার বিদায়ি জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামালের ঘরগুলোর উদ্বোধন করার কথা।

শাঁখরাবাজার কমিটির সহসভাপতি আসাদুজ্জামান পলাশ, স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম, মফিজুল ইসলামসহ কয়েকজন জানান, ভোমরা ইউনিয়নে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের সংখ্যা অনুযায়ী ৪৭টি ঘর খুবই নগণ্য। সেই কারণে ঘর না পাওয়া ভূমিহীনরা অনেকেই হতাশ। এদিকে গুচ্ছগ্রামের মমতাজ, তাঁর ছেলে আব্দুর রহমান, রোমিছা, শাহজাহান, আফছার আলী, আব্দুল কাদের, গয়েশপুরের আব্দুর রব, বৈচানা গ্রামের মোজাহারের ছেলে চানবাবু, তাঁর বোন খাদিজা, ফুফু আলেয়া, খানবাড়ির ফিরোজাসহ ২৭টি ভূমিহীন পরিবার বৃহস্পতিবার রাতে দলিল না হওয়া ওই ২৭টি ঘরে দখলে নেন। তাঁরা বসবাসের জন্য ঘরের মধ্যে মালপত্র নিয়েও আসেন। অন্যদিকে ওই ৪৭ জনের তালিকায় অপেক্ষাকৃত সচ্ছল ব্যক্তিদের কয়েকজনের নাম আছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুুক স্থানীয় কয়েকজন জানান, আওয়ামী লীগ নেতা শহীদুল, মকফুর, আলিমদ্দিনসহ একটি দালালচক্র মাথাপিছু ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে নিয়ে দলিল করিয়ে দেওয়ার কথা বলে গত বৃহস্পতিবার রাতে ২৭ জন ভূমিহীনকে ওই সব ঘর দখলে নিতে সহায়তা করেন। বিষয়টি গত শুক্রবার সকালে জানাজানি হলে দুপুরে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফতেমা তুজ জোহরা ও ভোমরা ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা কান্তিলাল সরকার ঘটনাস্থলে আসেন। তাঁরা এসে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ইসরাইল গাজী ও জবরদখলকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের পরবর্তী কোটায় পর্যায়ক্রমে ঘর দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে দ্রুত মালপত্র নিয়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ভূমিহীনরা চলে যাওয়ার পর পরই ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা কান্তি লাল সরকার ওই সব ঘরে তালা লাগিয়ে দেন।

এদিকে ভূমিহীন মমতাজ, রোমিছা, খাদিজাসহ কয়েকজন জানান, রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার কথা বলে স্থানীয় কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা ও দালাল (দালালদের নাম প্রকাশে অনীহা) তাঁদের কাছ থেকে মাথাপিছু ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে নিয়েছেন। টাকা নিয়েই তাঁরা ঘর দখলে সহযোগিতা করেছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পরামর্শে তাঁরা দখল ছেড়ে দিয়েছেন। তিন দিনের মধ্যে টাকা ফেরত না পেলে দালাল নেতাদের নাম উল্লেখ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে ও থানায় অভিযোগ করবেন তাঁরা।

ভোমরা ইউপি চেয়ারম্যান ইসরাইল গাজী জানান, খালি ঘর দখলে কোনো টাকা-পয়সা লেনদেনের বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে ভূমিহীনদের সংখ্যা অনুযায়ী ঘর কম বরাদ্দ হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে।

জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও ভোমরা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসনের প্রস্তুতকৃত তালিকা অনুযায়ী ঘর দেওয়া হবে।’ তবে এর সঙ্গে কোনো নেতা বা দালালের আর্থিক লেনদেন আছে কি না, তা তাঁর জানা নেই। ভোমরা ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা কান্তি লাল সরকার বলেন, ‘উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশ অনুযায়ী তালিকাভুক্ত অন্য ২৭ জনকে দলিল রেজিস্ট্রি করে দিয়ে খুব শিগগিরই ঘর হস্তান্তর করা হবে।’

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফতেমা তুজ জোহরা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যে মহতী উদ্যোগ নিয়েছেন, তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। চাহিদার তুলনায় প্রথম দফায় অনেক কম লোক ঘর পাচ্ছেন। এদিকে যাঁদের নাম তালিকায় না থাকার পরও ঘর দখল করেছিলেন, তাঁদের বুঝিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁরা অসহায় হলে পরবর্তী তালিকায় তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে সমস্যার সমাধান করা হবে।’ 



সাতদিনের সেরা