kalerkantho

সোমবার । ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২ আগস্ট ২০২১। ২২ জিলহজ ১৪৪২

কৃষিজমিতে বালুরহস্য

আতাউর রহমান পিন্টু, শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ)   

১৯ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কৃষিজমিতে বালুরহস্য

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার কান্দাপাড়া ও দ্বাবারিয়াতে কৃষিজমি বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার করতোয়া নদী খননের বালু দিয়ে অবৈধভাবে কৃষিজমি ভরাটের এক মহোৎসব চলছে। বালু ভরাটে জমি উঁচু হওয়ায় একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজ-কালভার্ট। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারছে না। এদিকে বিষয়টি লিখিতভাবে জানানোর পর দুই সপ্তাহ অতিবাহিত হলেও এ ব্যাপারে নীরব কর্তৃপক্ষ। এ সুযোগে অভিযোগ তুলে নেওয়ার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে প্রভাবশালী মহল।

উপজেলার পোতাজিয় ইউনিয়নের নুকালি গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আশরাফুল ইসলাম নান্নু বলেন, বুড়ি পোতাজিয়া ও বেজগাতি মৌজায় শাহ আলম, আব্দুর রহিম, জয়নাল আবেদিন, শাহজাহান চৌকদার, ওহাব, রমজানসহ তাঁর মতো অনেকের জমি থেকে প্রথমে জোর করে এঁটেল মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। এখন সেখানে ড্রেজার দিয়ে বালু ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। কৃষক আশরাফুল ইসলাম নান্নু আরো বলেন, ‘সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পানি উন্নয়ন বোর্ড করতোয়া নদী খনন করছে। নদী খননের বালু দিয়ে নুকালি ও আশপাশের গ্রামের খাল ভরাটের জন্য আমাদের কাছ থেকে লিখিত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন কৃষিজমি ভরাট করা হচ্ছে। এখন দুটি ইরিগেশন প্রজেক্টের ২৫-৩০ বিঘা জমিতে ড্রেজার দিয়ে দিনরাত বালু ফেলার কাজ চলছে। ফলে সেখানে আর চাষাবাদ করা যাবে না।’

এদিকে বালু দিয়ে কৃষিজমি ভরাটে যাঁরা বিরোধিতা করে বিভিন্ন স্থানে অভিযোগ দিয়েছেন তাঁদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন প্রভাবশালীরা। এ ব্যাপারে পোতাজিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) নজরুল ইসলাম জানান, হুমকি পেয়ে অভিযোগকারীর অনেকেই এখন বালু দিয়ে তাঁদের কৃষিজমি ভরাটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

এদিকে অভিযোগ সূত্র থেকে জানা গেছে, নুকালি গ্রামের শাহজাহান সিরাজ, শামসুজ্জোহা শাহীন, আব্দুস সোবাহান, বাদশা মিয়া, মিলনসহ অনেকেই এই বালু ফেলা ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। তাঁরা এলাকার কিছু ব্যক্তির সঙ্গে টাকার বিনিময়ে নিচু জমি, পুকুর কিংবা খাল বালু দিয়ে ভরাটের চুক্তি করেন। কিন্তু ড্রেজার দিয়ে ওই সব ব্যক্তিদের জায়গা ভরাট করতে গিয়ে আশপাশের কৃষকদের জমিও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। শুধু বুড়ি পোতাজিয়া ও বেজগাতি মৌজার জমি নয়, বালু ফেলা হচ্ছে রতনকান্দি ও দ্বারিয়াপুর মৌজার শত শত বিঘা কৃষিজমিতে।

এলাকাবাসী জানায়, কান্দাপাড়া, মাদলা ও শেরখালীতে এরই মধ্যে ড্রেজারের বালু ফেলে শতাধিক বিঘা দুই ফসলি জমি ভরাট করা হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ দেওয়া সত্ত্বেও এ বিষয়ে কৃষি বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের নীরব ভূমিকা দেখে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

উত্তরবঙ্গ ট্যাংক লরি শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক নেতা শাহজাহান সিরাজ জানান, তিনি এই বালু ভরাটের সঙ্গে যুক্ত নন। এ বিষয়ে তাঁকে জড়িয়ে যে অভিযোগ করা হয়েছে—তা সঠিক নয়। তিনি আরো বলেন, ‘করতোয়া নদী খননের বালু বিনা মূল্যে পাওয়ায় অনেকেই সেই বালু দিয়ে নিজের জায়গা-জমি ভরাট করে নিচ্ছেন। আমার পরিবারের ভাই-ভাতিজারাও এই কাজ করেছেন। তা ছাড়া আমাদের বিরুদ্ধে যাঁরা অভিযোগ দিয়েছেন, তাঁরাই প্রথমে জমি ভরাটের জন্য আবেদনপত্রে স্বাক্ষর দিয়েছিলেন।’

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বাঘাবাড়ী নৌবন্দর থেকে শাহজাদপুর দিলরুবা বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কের দুই পাশে ড্রেজার দিয়ে বালু ফেলা হচ্ছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচ-ছয়টি ব্রিজ-কালভার্টের মুখ ভরাট হয়ে গেছে। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ব্রিজ-কালভার্ট এখন গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের উল্লাপাড়া বিভাগীয় আঞ্চলিক প্রকৌশলী মনসুর আহমেদ বলেন, ‘আমরা সরেজমিন গিয়ে বিষয়টি দেখব।’ শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. শামসুজ্জোহা বলেন, এ ধরনের একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরেজমিন তদন্তের পর এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।



সাতদিনের সেরা