kalerkantho

শনিবার । ৩ আশ্বিন ১৪২৮। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১০ সফর ১৪৪৩

রাজা-রানির খেল

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

১৬ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রাজা-রানির খেল

সুনামগঞ্জে ৪৫টি জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্পে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকা লোপাটের চেষ্টা চলছে। অথচ প্রথম দফা খননের নামে প্রায় তিন কোটি ৪৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর নেপথ্যে জানতে গিয়ে ‘রাজা-রানি’র গল্প শোনা যাচ্ছে।

সুনামগঞ্জ-৪ (সদর-বিশ্বম্ভরপুর) আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ সম্প্রতি শহরের আলফাত স্কয়ারে একটি মহাসমাবেশে অভিযোগ করেন, ‘সুনামগঞ্জ মৎস্য অফিসে রাজা-রানির রাজত্ব চলছে।’ এমপির ঘনিষ্ঠরা জানান, এই ‘রানি’ হলেন সদর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সীমা রাণী বিশ্বাস। ‘রাজা’ হলেন আতাউর রহমান। তিনি বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময়ের স্থানীয় সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সহকারী। আতাউরের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি মৎস্যজীবী না হয়েও সমিতির নামে দাপট দেখান। সদর উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের মৎস্যজীবী শামীম আহমদকে পিটিয়ে দুই পা ভেঙে দিয়েছেন।

জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ‘জলাশয় সংস্থানের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’ চলছে। এই প্রকল্পে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৯টি জলমহাল খননে প্রায় তিন কোটি ৪৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। নামকাওয়াস্তে কাজ করে টাকা লোপাট করা হয়। একই প্রকল্পে তিন বছর আগে যেসব জলাশয় খনন করা হয়েছিল বরাদ্দ লোপাট করতে আবারও সেগুলোই যুক্ত করা হয়েছে নতুন প্রকল্পে। আগেও এই প্রকল্পে দক্ষিণ সুনামগঞ্জের হলদির ডুবি খাল এবং হাসামেলা চুন্নি জলমহাল খনন করা হয়েছিল। এবারও এই সরকারি বরাদ্দ হাতিয়ে নিতে দুটি জলমহাল খননে ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই প্রকল্পে এ দুটি জলাশয় খননে সাড়ে ৩৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

এদিকে এবারও চলতি অর্থবছরে ৪৫টি জলমহাল খননকাজ তড়িঘড়ি শেষ করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। মৎস্যজীবী সমিতিগুলোকে হুমকিধমকি দিয়ে ওই সময়ে ভারপ্রাপ্ত জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সীমা রাণী বিশ্বাস ইজারাদারদের মাধ্যমে কিছু খননকাজ করান। তবে মাস্টাররোল নিয়ে আসা হয় সমিতির লোকজনের কাছ থেকে। এরই মধ্যে অর্ধেকের কাছাকাছি বিল তোলা হয়েছে। বাকি বিল তুলে নিতে এখন ইজারাদারদের প্রতিদিন মৎস্য অফিসে যোগাযোগ করতে দেখা গেছে। এই খননকাজে নৃপেন্দ্র চন্দ্র সরকার নামে একজন উপসহকারী প্রকৌশলীকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তিনি মাঠে না গিয়ে মনগড়া প্রতিবেদন দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে একাধিক জলমহালে দেখা গেছে, খনন হয়েছে খুব অল্প। তিন ফুট গভীর খনন করার কথা থাকলেও গড়ে দেড় ফুটও খনন হয়নি। তা ছাড়া কার্যাদেশে খননের যে এলাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল তাও মানা হয়নি। মৎস্য বিভাগের সঙ্গে মিলেমিশে মৎস্যজীবী সমিতির বদলে খনন করেছেন পেশাদার ঠিকাদাররা। আর এসব বিষয়ের বৈধতা দিতে সমিতির নামে রেগুলেশন করে নেওয়া হয়েছে।

সদর উপজেলার কালার ডুয়ার গছিলারা, বড় উত্মা জলমহাল, শাহ পাথারিয়া গ্রুপ, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার মাগুরা হাতকাপানিয়া গ্রুপ, নিতাই গাঙ জলমহাল, কাষ্টগঙা জলমহাল, হলদিডুবি খাল, জামালগঞ্জের ছয়হারা নদী, নলচুন্নি বিল, বাড়ির লামা হতে বৌলাই পর্যন্ত খনন, কার্প হ্যাচারি কমপ্লেক্স ক্যানাল, ধর্মপাশার আরবিল মরানদী, চিনাজানার খাল, বাদেহরিপুর গ্রাম সরকারি পুকুর, ছোট গোড়াডুবা, দিরাই উপজেলার উদির হাওর, কইয়া বিল ঘুরে দেখা গেছে তিন ফুট গভীর করে কোথাও খনন হয়নি। যে সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল তার চেয়ে অর্ধেকেরও কম জায়গায় খনন করা হয়েছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করে, তড়িগড়ি করে খননকাজ শেষ দেখিয়ে ভারপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তা সীমা রাণী বিশ্বাস ও প্রকল্পের উপসহকারী প্রকৌশলী নৃপেন্দ্র চন্দ্র সরকার বিল জমা দেওয়ার কাজ শেষ করেছেন।

শিয়ালমারা জলাশয় তীরের বাসিন্দা কাজল মিয়া বলেন, ‘এই এলাকায় এক ফুটের মতো মাটি কাটতে দেখেছি। অল্প মাটি কেটে ফেলে গেছে তারা। এখন বৃষ্টিতে মাটি জলাশয়ে পড়ে আবার ভরাট হয়ে যাচ্ছে।’

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ডুংরিয়া গ্রামের মুরব্বি ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ হাজি তহুর আলী বলেন, ‘এলাকায় কোথায় জলাশয় খনন হয়েছে তা আমরা দেখিনি। খননকাজে স্থানীয় অভিজ্ঞ মানুষদের যুক্ত রাখলে অনিয়ম ও দুর্নীতি থাকত না।’

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, ‘অল্প খনন করেই পুরো বরাদ্দ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।’

প্রকল্পের তদারক কর্মকর্তা নৃপেন্দ্র চন্দ্র সরকার বলেন, ‘আমি প্রতিটি জলাশয়েই গিয়েছি। কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি করিনি।’

সাবেক জেলা ভারপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তা সীমা রাণী বিশ্বাস গত ১৮ মে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘গড়ে ৯০ ভাগ কাজ শেষ হয়ে গেছে। আমি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই।’ এ সময় তিনি এই প্রতিবেদককে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করেন। যার অডিও রেকর্ড এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।

তবে গত ২০ মে নতুন দায়িত্বে আসা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুনীল মণ্ডল বলেন, ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীকে এলাকায় এসে পুনরায় মাপার জন্য বলেছি। কাজ না হলে কাউকে বিল দেব না।’