kalerkantho

শনিবার । ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩১ জুলাই ২০২১। ২০ জিলহজ ১৪৪২

কোটিপতি বড়বাবু

ইয়াদুল মোমিন, মেহেরপুর   

১৩ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কোটিপতি বড়বাবু

পদের নাম প্রধান অফিস সহকারী-কাম-হিসাবরক্ষক (বড়বাবু)। ১২তম গ্রেডের কর্মচারী। ২১ হাজার ৩৮০ টাকা স্কেল অনুযায়ী বেতন ৩১ থেকে ৩২ হাজার টাকা। অথচ মেহেরপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের এই কর্মচারী কয়েক কোটি টাকার সম্পদের মালিক। স্থানীয় লোকজনের প্রশ্ন, মীর হাবিবুর রহমানের এত সম্পদের উৎস কী?

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, হাবিবুর একই কর্মস্থলে রয়েছেন ১৩ বছর। এর আগে গাংনী উপজেলা হাসপাতালে ছিলেন ১৪ বছর। একই জেলায় দীর্ঘদিন থাকায় হাসপাতালের যন্ত্রপাতি (এমএসআর), ওষুধসহ বিভিন্ন দ্রব্য, রোগীদের খাবার, মেইনটেন্যান্স—এমনকি সব ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের সঙ্গে তৈরি হয়েছে সখ্য। সেখান থেকে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ-বিত্তের মালিক বনে গেছেন। এ ছাড়া হাসপাতালের দুটি অ্যাম্বুল্যান্স ইচ্ছামতো ব্যবহার করেন। অভিযোগ রয়েছে, অ্যাম্বুল্যান্সে তাঁর স্ত্রী, মেয়েসহ পরিবারের সদস্যদের গাংনীসহ বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর কমপক্ষে চার কোটি টাকার এমএসআর সামগ্রী কিনতে হয়। কোনো কোনো বছর অতিরিক্ত বরাদ্দও দিতে হয়। এ ছাড়া রক্ষণাবেক্ষণের কাজও করা লাগে প্রতিবছর। যখন যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে তখন দলের সংসদ সদস্যের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন হাবিবুর। ২০১৯ সালে জাতীয় নির্বাচনকালীন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাঁকে বরিশাল বিভাগে বদলি করা হয়। কিন্তু ক্ষমতাবলে তিনি সেই বদলির আদেশ পরিবর্তন করে একই স্থানে রয়েছেন।

হাবিবুরের সম্পদ অনুসন্ধান করে জানা গেছে, মেহেরপুর শহরের নতুন পৌর ঈদগাহের সামনে তিনতলা ভবন একটি, পাশেই একতলা আরেকটি ভবন একটি মহিলা মাদরাসার কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। জমিসহ ভবন দুটির দাম কোটি টাকার বেশি হবে। গাংনী বাজারের স্মরণিকা মার্কেটে ‘হাবিবা লেডিস কর্নার’ নামে তৈরি পোশাকের দোকান, যেখানে প্রায় অর্ধকোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। নিজ গ্রাম মেহেরপুর সদর উপজেলার শ্যামপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ২৫ থেকে ৩০ বিঘা জমি কিনেছেন, যার দাম কোটি টাকার বেশি। মীর হাবিবুর রহমানের তিন মেয়ে ও এক ছেলে। ছেলে একটি নামকরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই (কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগে লেখাপড়া করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক ও স্টাফ জানান, হাসপাতালের বড়বাবু হাবিব কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন শুধু কমিশন বাণিজ্য করে। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার কারণে তিনি এই সুযোগ পেয়েছেন। এ ছাড়া বড়বাবু হওয়ার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বলতে পারেন না।

নাম না প্রকাশের শর্তে হাসপাতালের এক অ্যাম্বুল্যান্সচালক বলেন, ‘বড়বাবু যা বলেন, তাই করতে হয়। হাসপাতালের দুটি অ্যাম্বুল্যান্স তিনি নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করেন। আমরা ছোট চাকরি করি। আমাদের চাকরি হারাতে হয়, এমন কোনো নিউজ কইরেন না।’

প্রধান সহকারী-কাম-হিসাবরক্ষক মীর হাবিবুর রহমান বলেন, ‘পৈতৃক সম্পত্তি পেয়েছি আট বিঘা। পরে আমি কিছু কিনেছি। সব মিলিয়ে ১৫ থেকে ১৬ বিঘা জমি হবে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় বড় জামাইয়ের সঙ্গে ভুসিমালের ব্যবসা করি। এভাবে টাকা হয়েছে।’ কমিশন বাণিজ্যসহ অন্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কিছু লোক আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এসব তথ্য রটিয়েছে।’

মেহেরপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রধান সহকারী মীর হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাইনি। কমিশন বাণিজ্য, অ্যাম্বুল্যান্স ব্যবহারের বিষয়গুলো শুনলাম। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মেহেরপুর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সদস্য ও মুজিবনগর উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বাকের আলী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা দিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে এই ধরনের একজন কর্মচারী কিভাবে এত সম্পদের মালিক হলেন, তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ বিষয়ে দুদক যেন অনুসন্ধান করে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে আমি বলব।’