kalerkantho

শুক্রবার । ৯ আশ্বিন ১৪২৮। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৬ সফর ১৪৪৩

ধামরাইয়ে আবাসন প্রকল্প

কৃষিজমিতে নগর

নেই জেলা প্রশাসকের অনুমোদন ও পরিবেশের ছাড়পত্র

আবু হাসান, ধামরাই (ঢাকা)   

২৭ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কৃষিজমিতে নগর

ঢাকার ধামরাই উপজেলার মাখুলিয়া গ্রামে ফসলি জমিতে অবৈধভাবে গড়ে উঠছে ‘আকসিরনগর’ নামের অনুমোদনহীন একটি আবাসন প্রকল্প। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঢাকার ধামরাই উপজেলার মাখুলিয়ায় ‘আকসিরনগর’ নামের একটি আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে। এ জন্য জেলা প্রশাসকের অনুমতি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অবস্থানগত বা পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, কেনা জমির আশপাশের না কেনা জমিতেও মাটি ভরাট করা হচ্ছে। এ নিয়ে জমির মালিকরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে একাধিকবার অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি।

সম্প্রতি সরেজমিন জানা গেছে, মাখুলিয়া, কাইজারকুণ্ড, বড় কুশিয়ারা, সীতি ও সাছনা মৌজায় প্রায় চার বছর আগে নামসর্বস্ব ‘কাইজান গ্রুপ’ একটি আবাসন প্রকল্প শুরু করে। স্থানীয়দের কাছ প্রথমে কয়েক বিঘা জমি কিনে মাটি ভরাট করেন সাভারের ব্যাংক কলোনীর তৌহিদুল ইসলাম তৌহিদ। ওই সময় অনেকের জমি না কিনেই স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য কানা বাবুল হোসেনের নেতৃত্বে মাটি ফেলে ভরাট করা হচ্ছিল। এ নিয়ে এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পর্যায়ক্রমে প্রায় অর্ধশত কৃষকের ওপর হামলা ও মামলা হয়েছে। এ নিয়ে এলাকায় জনরোষ দেখা দেওয়ার পর সেটি বন্ধ করা হয়। এর এক বছর পর নাম পরিবর্তন করে ‘আকসিরনগর’ নাম দিয়ে আবার কয়েক বিঘা জমি কিনে মাটি ভরাট শুরু করেন তৌহিদুল। তিনি আশপাশের অনেক কৃষককে জমি বেচতে বাধ্য করেন। না কেনা জমিতেও বালু ফেলে তা দখলে নিয়েছেন। এর আগে তৌহিদের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা কয়েকবার বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। প্রশাসনের কাছে প্রতিকার চেয়ে আবেদনও করেছেন তাঁরা। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। বরং তাঁদের হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন। প্রায় ছয় মাস আগে প্রতিকার চেয়ে ইউএনওর কাছে ভুক্তভোগীরা আবেদন করেন। গত সোমবার আরেকটি আবেদন করেছেন মাখুলিয়া গ্রামের বদরুল সরদারসহ কয়েকজন।

স্থানীয়রা জানান, গত ফেব্রুয়ারিতে বংশী নদীর পার থেকে মাটি কেটে নেওয়ায় বাধা দিলে আকসিরনগর প্রকল্পের লোকজনের বেধড়ক মারধরে শিকার হন মাখুলিয়া গ্রামের মনসুর, ওবায়দুর রহমান (হযরত), ভঞ্জন রায়সহ কয়েকজন। ভঞ্জন রায়ের পা ভেঙে দেওয়া হয়। তিনি ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় উল্টো স্থানীয় কয়েকজনের নামে মামলা হয়। এ মামলায় ১০ দিন হাজতবাস করেন হযরত। এরপর থেকে আকসিরনগর আবাসন প্রকল্পের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না।

সাছনা গ্রামের ওমর আলী বলেন, ‘আমার পাঁচ ভাইয়ের প্রায় ১০ বিঘা কৃষিজমিতে বালু ফেলে দখলে নিয়েছেন তৌহিদ। বাধ্য হয়ে স্বীকার করেছি, তাঁর কাছেই বিক্রি করব। এ ছাড়া আমার চাচাতো ভাইদেরও প্রায় ২০ বিঘা জমি নিরুপায় হয়ে বেচতে বাধ্য করা হয়েছে।’

বড় কুশিয়ারা গ্রামের আফসার উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের পাঁচ ভাইয়ের প্রায় ৪০ বিঘা জমি আকসিরনগরের ভেতরে পড়েছে। ওই জমিতে আগে ১ শতাংশে প্রায় আট মণ ধান পেয়েছি। এ বছর জমিতে পানি দিতে দেননি তৌহিদ। ফলে ১ শতাংশে মাত্র তিন মণ ধান হয়েছে। আমাদের জমি বিক্রি না করাতে তৌহিদ তাঁর ভেকু পুড়িয়ে আমাদের কয়েকজনের নামে মিথ্যা মামলা দিয়েছেন। তাই আমি এখন তৌহিদের ভয়ে মুখ খুলতে চাই না।’

স্থানীয় সাইদুর রহমান বলেন, ‘আকসিরনগর জমি কিনেছে প্রায় এক শ বিঘা। দখল করেছে কয়েক শ বিঘা। যেভাবে ভরাট করা হচ্ছে, এতে আমার জমিও দখলে নিয়ে নেবে বলে আশঙ্কা করছি।’

কেনা জমি ভরাট করতে গিয়ে অনেকের জমিতে বালু চলে গেছে স্বীকার করে আকসিরনগর আবাসনের  ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘উন্নয়নমূলক কাজ করতে গেলে অন্যের সামান্য ক্ষতি হতেই পারে। এতে আমার কিছু করার নেই। যাদের জমিতে বালু পড়েছে, তারা আমার কাছে বিক্রি করলেই তো পারে।’

কুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কালিপদ সরকার বলেন, ‘অর্ধশত ভুক্তভোগী আমার কাছে এসেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে আমি তৌহিদুল ইসলামের সঙ্গে আলোচনা করেছি। কিন্তু তিনি কোনো কিছু মানছেন না।’

ধামরাইয়ের ইউএনও সামিউল হক বলেন, ‘ভুক্তভোগীদের আবেদনের পর কৃষি কর্মকর্তাকে প্রতিবেদন দিতে বলেছি। কিন্তু গত ছয় মাসেও কোনো প্রতিবেদন পাইনি। এরই মধ্যে তৌহিদুলকে নোটিশ করেছি। সন্তোষজনক না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরিফুল হাসান বলেন, ‘আইনে আছে কৃষিজমি অকৃষিতে রূপান্তর করতে হলে অনুমতি নিতে হবে। কিন্তু আকসিরনগরের পক্ষ থেকে কোনো অনুমতি নেয়নি। আমি সরেজমিন আকসিরনগর আবাসন প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদুল ইসলামকে বেড়া দিয়ে বালু ভরাট করতে বলেছিলাম। যাতে অন্য কৃষকের ফসলি জমিতে বালুর ঢল না আসে। কিন্তু তিনি তা শোনেননি। এতে সাধারণ কৃষকদের ক্ষতি হচ্ছে।’

এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা জেলার উপপরিচালক জহিরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, ‘আকসিরনগর আবাসন প্রকল্প অবস্থানগত কিংবা পরিবেশেগত কোনো ছাড়পত্র নেয়নি।’

ঢাকা জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, “‘কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার’ আইনে ফসলি জমিতে কোনো স্থাপনা বা আবাসন প্রকল্প করার সুযোগ নেই। যদি কেউ করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া আকসিরনগর নামে কোনো আবাসন করার জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়নি।”



সাতদিনের সেরা