kalerkantho

রবিবার । ৬ আষাঢ় ১৪২৮। ২০ জুন ২০২১। ৮ জিলকদ ১৪৪২

ঘুষের প্রকৌশলী

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

১২ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ঘুষের প্রকৌশলী

অঙ্কন : প্রসূন

চলতি মৌসুমে হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে পিআইসিগুলোর (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) কাছ থেকে কোটি টাকার বেশি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পিআইসির অভিযোগ, শাল্লা উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাইয়ুম তাঁর মোটরসাইকেল চালকের মাধ্যমে এই টাকা নিয়েছেন। ঘুষ লেনদেনের একাধিক অডিও এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই টাকার ভাগ তিনি নির্বাহী প্রকৌশলীসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও দিয়েছেন। তা ছাড়া উপজেলা কমিটির সভাপতি (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) এই ঘুষ দুর্নীতিতে জড়িত।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এই উপজেলায় চলতি বছর ১৫৬টি বাঁধ রক্ষা প্রকল্পে প্রায় ২৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। শুরুতেই অভিযোগ ছিল উপজেলা কমিটি অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প অনুমোদন দিয়ে পিআইসির কাছ থেকে নগদ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এ ছাড়া প্রাক্কলন অনুযায়ী কাজ না করেও তারা সরকারি বরাদ্দ নয়ছয় করেছে বলে হাওর বাঁচাও আন্দোলন, হাওরের কৃষক ও কৃষি রক্ষা সংগ্রাম পরিষদসহ কয়েকটি সংগঠন মানববন্ধন ও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করে। পিআইসির একাধিক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক জানিয়েছেন, অনুমোদনের সময় উপজেলা কমিটি প্রতিটি প্রকল্প থেকে দেড় লাখ থেকে সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা করে আগাম ঘুষ নিয়েছে। এরপর তিন দফা বিল দেওয়ার সময় প্রতি লাখে আরো ১০ হাজার টাকা করে ঘুষ দিতে হয়েছে। পোস্ট ওয়ার্কের (কাজ সম্পাদন) সময়ও পিআইসিকে জিম্মি করে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিয়েছে উপজেলা কমিটি। বিল দেওয়ার সময় আবারও লাখপ্রতি ১০ হাজার টাকা দাবি করায় এখন ঘুষ বাণিজ্য সম্পর্কে মুখ খুলছেন পিআইসির লোকজন।

শাল্লা উপজেলার ১৩৯ উপ প্রকল্পের সদস্যসচিব অপু ঘোষ বলেন, ‘পিআইসি অনুমোদনের সময় আমার কাছ থেকে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন উপসহকারী প্রকৌশলী আব্দুল কাইয়ুম। তাঁর মোটরসাইকেল চালক এই টাকা নিয়েছেন। আমার প্রকল্পের তিন ধাপের বিল তোলার সময় আরো ৪০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন আব্দুল কাইয়ুম। হাওরের তাজা মাছও খাওয়াতে হয়েছে তাঁকে। শুধু আমার কাছ থেকে নয়, সব প্রকল্পের কাছ থেকে এভাবে ঘুষ নিয়েছেন তিনি।’

বরাম হাওরের একটি প্রকল্পের সভাপতি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘উপজেলা কমিটি ও আব্দুল কাইয়ুম প্রতিটি প্রকল্প থেকে দেড় লাখ টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত পিআইসি অনুমোদনের সময় নিয়েছে। যারা অগ্রিম ঘুষ বেশি দিয়েছেন তাদের বরাদ্দও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই প্রতিযোগিতা করে ঘুষ দিয়ে প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে নিয়েছেন পিআইসিরা।’

ছায়ার হাওরের একটি প্রকল্পের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক সদস্যসচিব বলেন, ‘পিআইসি অনুমোদনের সময় ঘুষ দেওয়ার পরও প্রতিটি বিলের সময় লাখে ১০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে। পোস্ট ওয়ার্কের সময়ও টাকা দিতে হয়েছে। আমাদের বারবার জিম্মি করে ঘুষ নিয়েছেন উপসহকারী প্রকৌশলী।’

নাম না প্রকাশের শর্তে কয়েকজন অভিযোগ করেন, কাজ শেষে আব্দুল কাইয়ুম বাঁধের মাটি মাপার সময় আবারও ঘুষ দাবি করেন। ঘুষ না দিতে চাইলে মাটির পরিমাণ, কমপেকশন ও দূর্বাঘাসসহ নানা অনিয়মের কথা বলে জিম্মি করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত উপসহকারী আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ‘আমার কাছে এসব জানতে চাইলে আমি অস্বীকার করব। এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নাই।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাকে এখান থেকে বদলি করা হোক। এ বিষয়ে আর কোনো কথা বলতে পারব না।’

শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ কমিটির উপজেলা সভাপতি আল মুক্তাদির হোসেন বলেন, ‘আমি ঘুষ দুর্নীতিতে যুক্ত নই। অন্য কেউ যদি এসব করে তবে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব।’

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী-১ সবিবুর রহমান বলেন, ‘পিআইসি পেতে হলে টাকা দিতে হবে কেন? পিআইসিরা এসব বিষয়ে আগে অভিযোগ করলেন না কেন? যারা টাকা দিয়ে পিআইসি নিয়েছেন, অভিযোগ করলে আমরা ব্যবস্থা নেব।’