kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য

বন যেভাবে জঙ্গল হচ্ছে

জাহাঙ্গীর আলম, চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ)   

১০ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বন যেভাবে জঙ্গল হচ্ছে

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যে শতবর্ষী মা গাছ কাটা পড়েছে। বেশির ভাগ অংশ চোরেরা নিয়ে গেছে। পড়ে রয়েছে ডালপালার সামান্য অংশ। ছবি : কালের কণ্ঠ

সুন্দরবনের পর সবচেয়ে বড় বন হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য। বনের আশপাশের লোকজন জানায়, প্রতি রাতে কোনো না কোনো অংশে গাছ কাটা হয়। এ কারণে এক সময়ের বৃক্ষসমৃদ্ধ এই বন লতা-ঝোপের জঙ্গলে পরিণত হতে চলেছে।

আগে বনে প্রবেশ করলে চোখে আটকে যেত এক-দেড় শ বছরের পুরনো চাপালিশ, গর্জন, বনাক, জারুল, লাল আওয়াল, পাহাড়ি আওয়াল, লোহা, হারগাজা, বট, শেওড়া, ডুমুর, গামারি, বৈলাম, বনমালি, শাল ও সেগুনগাছে। ছিল সামাজিক বনায়নের সেগুন, আগর, বহেড়া, কাঁঠাল, মেহগনি, আমলকী। কিন্তু চোরদের হাত থেকে কোনো গাছই রেহাই পাচ্ছে না।

সম্প্রতি বন বিভাগ কালেঙ্গা ফরেস্ট এলাকায় সামাজিক বনায়নের গাছ ৩১টি লটের মাধ্যমে মহালদারদের কাছে বিক্রি করেছে। অভিযোগ আছে, মহালদারদের সঙ্গে আঁতাত করে মা গাছগুলো কাটে বন কর্মীরা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ২৪ এপ্রিল কালেঙ্গা রেঞ্জ অফিসের আধা কিলোমিটারের মধ্যে কালেঙ্গা বিটের তালতলা টিলা থেকে শতবর্ষী ১১টি গাছ কেটে ফেলে চোরেরা। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচটি পাহাড়ি মেহগনি ও ছয়টি জাম। বন বিভাগের লোকজন কাটা গাছগুলোর কিছু অংশ উদ্ধার করতে পারলেও চোরেরা বেশির ভাগ নিয়ে যায়।

অভিযোগ উঠেছে, কালেঙ্গা বিট কর্মকর্তা শ্যামাপদ মিশ্র এ গাছগুলো শ্রীমঙ্গলের এক মহালদারের কাছে বেচে দিয়েছিলেন। বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কাটা গাছের কিছু অংশ জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় মামলা হলেও কোনো আসামি ধরা পড়েনি। অভিযোগ আছে, শ্যামাপদ যোগদানের পর থেকে এ বিটে বেড়ে গেছে গাছপাচার।

শ্যামাপদ মিশ্র বলেন, ‘১৯ এপ্রিল বিকেল ৪টায় গাছ কাটার খবর পাই। রেঞ্জ অফিসারসহ ঘটনাস্থলে গিয়ে কাটা গাছ জব্দ করি।’

কালেঙ্গা রেঞ্জ কর্মকর্তা খলিলুর রহমান বলেন, ‘গাছপাচারের সঙ্গে বন বিভাগের লোক জড়িত—এমন অভিযোগ সত্য না।’

ভিলেজারদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

স্থানীয় কিছু অসাধু লোক, বন বিভাগের গঠিত ভিলেজার (চুক্তিভিত্তিক বন প্রহরী), স্থানীয় সরকারি দলের লোকজন এবং জনপ্রতিনিধিরাই মূলত রেমা-কালেঙ্গা ধ্বংসের পেছনে দায়ী। তাদের সহযোগিতায়ই বছরের পর বছর ধরে প্রকাশ্যে চলছে গাছপাচার। একসময় এই বনে ৫০০ প্রজাতির গাছ থাকলেও অব্যাহতভাবে গাছ কাটার কারণে এখন অনেক প্রজাতিই বন থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

বন বিভাগের নেতৃত্বে উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রশাসন, সাংবাদিক, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও বন ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের নিয়ে ৫৫ সদস্যের একটি নির্বাহী কমিটি আছে। তারা ২২ সদস্যের একটি কার্যকরী কমিটি তিন বছরের জন্য গঠন করে দেন। এদের দায়িত্ব প্রতি মাসে বনের অবস্থা পর্যালোচনা করে উন্নয়নের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অভিযোগ করেন, গত পাঁচ বছর ধরে চুনারুঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আকবর হোসেন জিতু রেমা-কালেঙ্গা নিসর্গের সহব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে আছেন। এ কমিটির দায়িত্ব কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে নেই।

হবিগঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন বলেন, সহব্যবস্থাপনা কমিটির পুনর্গঠন করা হবে। সামাজিক বনায়নের গাছ দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে। বিক্রির টাকার ৪৫ শতাংশ পাবে সরকার, ৪৫ শতাংশ পাবে উপকারভোগী, ১০ শতাংশ টাকা দিয়ে পুনরায় বাগান সৃজন করা হবে।

চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সত্যজিত রায় দাস বলেন, ‘রেমা-কালেঙ্গা সহব্যবস্থাপনা কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, আমি শুনেছি। লকডাউনের পর এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



সাতদিনের সেরা