kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ বৈশাখ ১৪২৮। ১০ মে ২০২১। ২৭ রমজান ১৪৪২

পূর্ব সুন্দরবনে অভয়ারণ্যে কোপ

কর্তার লোভে বন ধ্বংস

শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি   

৪ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কর্তার লোভে বন ধ্বংস

পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের গোলপাতা কূপের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (সিও) মো. ওবায়দুল হকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিষিদ্ধঘোষিত অভয়ারণ্য থেকে গোলপাতা কাটার অনুমতি দিয়ে তিনি টাকা পকেটে ভরেছেন।

মৌসুম শেষে ফিরে আসা শরণখোলার গোলপাতা ব্যবসায়ীরা গত শনিবার সন্ধ্যায় অভিযোগ করেন, ৫০০ মণ ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি গোলপাতার নৌকায় সর্বসাকল্যে সরকারি রাজস্ব আসে পাঁচ হাজার ৬০০ টাকা, কিন্তু সেখানে প্রতিটি নৌকা থেকে বিভিন্ন অজুহাতে আদায় করা হয় ৯০ হাজার থেকে ৯৫ হাজার টাকা। এভাবে ২০০টি নৌকা থেকে দুই গোনে (ট্রিপ) প্রায় চার কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছেন কর্মকর্তা।

এদিকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে ক্ষতি পোষাতে কিছু ব্যবসায়ী ঝাড় উজাড় করে পাতা আহরণ করারও অভিযোগ রয়েছে। একটি ঝাড় থেকে পাতা কাটার সময় মাঝ পাতার (মাঝের কচি পাতা) পাশে ঝাড় রক্ষায় একটি পূর্ণাঙ্গ পাতা (ঠ্যাকপাতা) রেখে আহরণের নিয়ম রয়েছে, কিন্তু সেই ঠ্যাকপাতা না রেখে ঝাড়ের সব পাতা কাটা হয়েছে। এমনকি ৫০০ মণ ধারণক্ষমতার একেকটি নৌকায় বর্ধিত অংশ জোড়া দিয়ে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার মণ পাতা বোঝাই করে আনা হয়েছে। এভাবে ঝাড় ধ্বংস করে পাতা কাটার ফলে হুমকির মুখে পড়েছে গোলবন। উজাড় করে পাতা আহরণ করায় ওই সব গোলবনে পরবর্তী বছরে আর নতুন পাতা গজানোর সম্ভাবনাও নেই বলে কয়েকজন ব্যবসায়ী মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে চার বছর আগে গোলপাতা আহরণের পাস পারমিট বন্ধ হওয়া অভয়ারণ্য ঘোষিত শরণখোলা রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকেও পাতা আহরণের অভিযোগ রয়েছে। ঝাড় উজাড় করে পাতা কাটার ফলে প্রথম কিস্তিতে চাঁদপাই রেঞ্জের কূপের পাতা শেষ হয়ে যায়। দ্বিতীয় কিস্তিতে পাতা না পেয়ে কূপ কর্মকর্তা নিয়ম লঙ্ঘন করে শরণখোলা রেঞ্জের নিষিদ্ধ এলাকা থেকে গোপনে গোলপাতা কাটার সুযোগ করে দেন ব্যবসায়ীদের। পাশপাশি অবৈধভাবে টাকা হাতিয়ে নিয়ে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন। লোকসানে পড়ে আগামী দিনে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী।

গোলপাতা ব্যবসায়ী তৌহিদুল ইসলাম তালুকদার, ফুল মিয়া আড়তদার, সেলিম ব্যাপারী, মতিয়ার রহমান ও জাকির হোসেন হাওলাদার জানান, শরণখোলা রেঞ্জে গোলপাতার পারমিট বন্ধ হওয়ার পর থেকে তাঁরা চাঁদপাই রেঞ্জ থেকে পাতা আহরণ করে ব্যবসা করে আসছেন। এ বছর ২৮ জানুয়ারি ও ২৮ ফেব্রুয়ারি দুই কিস্তিতে তাঁদের মতো সাতক্ষীরা, খুলনা, মোংলাসহ বিভিন্ন এলাকা ব্যবসায়ীরা কমপক্ষে ২০০ নৌকায় গোলপাতা আহরণের অনুমতি পান। এতে সব মিলিয়ে একেক কিস্তিতে নৌকা প্রতি সরকারি রাজস্ব আসে পাঁচ হাজার ৬০০ টাকা।

অথচ তাঁদের কাছ থেকে পারমিট দেওয়ার সময় ২৮ হাজার, কূপ চেকিংয়ের নামে ২৬ হাজার, ভালো গোলবন (ঘের) দেওয়ার নামে ১৫ হাজার, বিএলসি বাবদ পাঁচ হাজার, ঘাট চেকিংয়ের নামে পাঁচ হাজার, সিটি কাটা (পারমিট হস্তান্তর) বাবদ দুই হাজার, অন্যান্য খরচের নামে আরো ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে এই বিশাল অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা জানান, কূপ কর্মকর্তা ওবায়দুল হক তাঁর দপ্তরের বোটম্যান (বিএম) মিজানুর রহমানকে দিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এই টাকা আদায় করেছেন। অতিরিক্ত টাকার ব্যাপারে কোনো ব্যবসায়ী প্রশ্ন তুললে তাঁকে হয়রানি করা হয়েছে। তাই লাখ লাখ টাকা পুঁজি খাটিয়ে লোকসানের ভয়ে বাধ্য হয়ে নিয়মের অতিরিক্ত টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, অনেক বাওয়ালি ক্ষতি পোষাতে ৫০০ মণের অনুমতি নিয়ে নৌকায় অতিরিক্ত তক্তা জুড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার মণ পাতা কেটেছেন। কেউ কেউ গোলঝাড়ের ঠ্যাকপাতাসহ জ্বালানি কাঠও কেটেছেন। চাঁদপাই রেঞ্জের ২ নম্বর কূপের যেসব এলাকার বন উজাড় করে গোলপাতা কাটা হয়েছে তার মধ্যে বেড়ির খাল, নন্দবালা, সিংড়াবুনিয়া, তাম্বলবুনিয়ার আগা, শান্তির খাল, কলামুলা, চাঁন মিয়ার খাল ও আলকির খাল অন্যতম।

তবে অভিযুক্ত সিও মো. ওবায়দুল হক এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

জানতে চাইলে চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. এনামুল হক বলেন, ‘কিছু অনিয়মের কথা  মৌখিকভাবে শুনেছি। তবে লিখিতভাবে কেউ জানায়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দেখা হবে।’

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘গোলপাতার কূপ চলমান থাকাকালে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া যেত। মৌসুমের এক মাস পর এসব অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।’



সাতদিনের সেরা