kalerkantho

বুধবার । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৯ মে ২০২১। ৬ শাওয়াল ১৪৪

লকডাউনেও সক্রিয় মাটিখেকোরা

বগুড়ার শেরপুরে ফসলি জমি কেটে অবাধে বিক্রি করা হচ্ছে মাটি-বালু

শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি   

২১ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



লকডাউনেও সক্রিয় মাটিখেকোরা

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার নন্দতেঘরি গ্রামে পল্লী বিদ্যুতের এগারো হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের খুঁটির গোড়ার চারপাশের মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

বগুড়ার শেরপুরে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ‘লকডাউন’ পরিস্থিতির মধ্যেও থেমে নেই ফসলি জমির মাটি-বালু লুট। স্থানীয় প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীসহ সব মহলকে ম্যানেজ করে অনেকটা দাপটের সঙ্গেই এই লুটের মহোৎসবে মেতেছে প্রভাবশালী একটি চক্র। তাই অনেকটা নির্বিঘ্নেই দিনরাত সমানতালে ড্রেজার ও খননযন্ত্রের মাধ্যমে ফসলি জমির বুক চিরে অবৈধভাবে তোলা হচ্ছে মাটি-বালু। এতে এলাকার শত শত বিঘা কৃষিজমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কৃষিজমির সর্বনাশ করে কাটা মাটি যাচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটায়। মাটিভর্তি ভারী ট্রাক ও ট্রাক্টর চলাচলের ফলে নষ্ট হচ্ছে গ্রামীণ সড়ক। এ ছাড়া ধুলাবালিতে এলাকার পরিবেশ মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার ১০ ইউনিয়নের অন্তত ৪০-৫০টি জায়গায় খননযন্ত্রের মাধ্যমে ফসলি জমি কেটে মাটি-বালু লুট করে নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া আরো ৮-১০টি জায়গায় জলাশয় সংস্কারের নামে মাটি কেটে বিক্রির পাশাপাশি ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের দায়সারা অভিযানে মাঝেমধ্যে দু-একটি পয়েন্ট বন্ধ থাকলেও অদৃশ্য খুঁটির ইশারায় আবারও চলছে মাটি-বালু লুট। তাই করোনা দুর্যোগের সময়ও বন্ধ নেই তাদের অবৈধ এই কর্মযজ্ঞ। তবে একটু ধরন পাল্টেছে। নির্বিঘ্ন করতে দিনের পরিবর্তে রাতকে বেছে নিয়েছে কারবারিরা। আর এই কাজে জড়িত শতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি। তাঁদের রাজনৈতিক পদ-পদবি না থাকলেও সবাই আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জামায়াতের কর্মী-সমর্থক। তাই প্রশাসনসহ সব মহলকে ম্যানেজ করতে তেমন বেগ পেতে হয় না তাঁদের।

জানা গেছে, প্রভাবশালী এই মাটি-বালু কারবারিরা প্রথমে বিশাল মাঠের মাঝখানে কম দামে জমি কিনে থাকেন। এরপর সেই জমি থেকে শুরু করেন মাটি বিক্রি। সেই সঙ্গে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে রাতের আঁধারে তোলেন বালু। এতে তৈরি হয় বিশাল আকারের গর্ত। স্বাভাবিক কারণেই আশপাশের জমি ভাঙতে শুরু করে। এরপর ভয় দেখিয়ে ফসলি জমি কিনে শুরু করেন মাটি-বালু উত্তোলন। এভাবে মাটি-বালুর লোভে কৃষিজমির সর্বনাশ করা হচ্ছে।

এদিকে উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের নন্দতেঘরী গ্রামে মাটিখেকোদের থাবায় একটি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ১১ হাজার ভোল্টের সঞ্চালন লাইনের ঝুঁকিপূর্ণ চার-পাঁচটি খুঁটি এখনো দাঁড়িয়ে থাকলেও চারপাশ থেকে কেটে নেওয়া হয়েছে মাটি। এতে দুর্ঘটনার শঙ্কার কথা জানিয়ে দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ লাইন স্থানান্তরের দাবি জানিয়ে গত ৪ এপ্রিল বগুড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে একটি লিখিত অভিযোগ করে গ্রামবাসী। কিন্তু আজও লাইনটি স্থানান্তরের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার খামারকান্দি ইউনিয়নের শুভগাছা এলাকায় লাভলু মিয়া, ভাতারিয়া ও বোয়ালমারিতে বিধান চন্দ্র, কাফুড়া নিসকিপাড়ায় আইয়ুব আলী, খামারকান্দির বড়বিলায় নান্নু মিয়া, গাড়ীদহ ইউনিয়নের দামুয়া গ্রামে আব্দুল খালেক, চণ্ডীজান এলাকায় আনোয়ার হোসেন, মির্জাপুর ইউনিয়নের রাজবাড়ী ও শংকরহাটা গ্রামে আব্দুল মজিদ, দড়িমুকন্দ্র ও মাকোরকোলায় আব্দুল খালেক মিয়া, খানপুর ইউনিয়নের ভস্তাবিলে নজরুল ইসলাম ও বেল্লাল হোসেন, কুসুম্বী ইউনিয়নের পানিসারা হিন্দুপাড়া গ্রামে শ্যাম ঠাকুর, দক্ষিণ আমইনে আব্দুল মান্নান মিয়া, নামা জামুর গ্রামে হেলাল উদ্দিন ফসলি জমি কেটে মাটি-বালু বিক্রি করছেন। এ ছাড়া ভবানীপুর ইউনিয়নের বড়াইদহ, ছোনকা ইটভাটার পাশে, কুসুম্বী ইউনিয়নের বাঁশবাড়িয়া-উঁচুলবাড়িয়া, ধাওয়াপাড়া, টুনিপাড়া, হাপুনিয়া বটতলা, আলতাদিঘী বোর্ডের হাটসহ আরো অন্তত ২০টি পয়েন্টে ফসলি ও জলাশয় সংস্কারের নামে বালু-মাটি চুরির অবৈধ উৎসব চলছে।

ভুক্তভোগী কৃষক আব্দুল হামিদ বলেন, ‘আমার পাশের ছয় বিঘা জমি কিনে মাটি-বালু তুলছে একটি প্রভাবশালী চক্র। এ কারণে আমার দুই বিঘা ফসলি জমি ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এখন তারা জমি বিক্রি করার জন্য চাপ প্রয়োগ করছে।’

খানপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম রাঞ্জু বলেন, ‘বিষয়টি প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিদের জানানোর পর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মাটি-বালু তোলা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর দু-এক দিন বন্ধ থাকলেও আবারও আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। কোনোভাবেই তাদের থামানো যাচ্ছে না।’ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মাসুদ আলম বলেন, ‘ফসলি জমির মাটি কাটার কোনো সুযোগ নেই। তাই যেকোনো মূল্যে কৃষিজমি রক্ষা করতে হবে।’ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাবরিনা শারমিন বলেন, ‘বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানাসহ বেশ কয়েকটি খননযন্ত্র জব্দ করা হয়েছে। এই অভিযান চলমান রয়েছে। এখানে অবৈধভাবে মাটি-বালু তোলার কোনো সুযোগ নেই।’



সাতদিনের সেরা