kalerkantho

সোমবার । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৭ মে ২০২১। ০৪ শাওয়াল ১৪৪

ডায়রিয়া নাকি করোনা?

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল   

২০ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ডায়রিয়া নাকি করোনা?

দেশের দক্ষিণাঞ্চলে করোনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডায়রিয়া। হাসপাতালে আসা ডায়রিয়া রোগীদের ২০ শতাংশের শরীরে করোনাভাইরাসের উপসর্গ দেখা গেছে। অন্যদিকে করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া রোগীদের ১০ শতাংশের মধ্যে মৃদু ডায়রিয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ফলে ডায়রিয়া রোগীরা করোনা আক্রান্ত কি না, সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল বিভাগে গত এক মাসে (১৮ মার্চ-১৮ এপ্রিল) ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৩৮৮৮ জন। অন্যদিকে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ২৫০৫ জন।

বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. মলয় কৃষ্ণ বড়াল বলেন, ‘১৫ এপ্রিল থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৬০ জন ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হয়েছে। ভর্তি হওয়া রোগীদের অনেকে বাড়িতেই স্যালাইন খায়, পরিস্থিতি খুব খারাপ হলে বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে হাসপাতালে আসে। তাদের অন্তত ২০ শতাংশের শরীরে করোনার উপসর্গ দেখা গেছে। তবে এই হাসপাতালে করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই।’

তিনি জানান, প্রতিদিন গড়ে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী ভর্তি হচ্ছে প্রায় ১০০ জন। তাদের অন্তত ৬০ শতাংশ রোগী প্রবল ডায়রিয়া বা কলেরা নিয়ে হাসপাতালে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে তাদের শরীরে করোনার উপসর্গ দেখা গেলেও ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পরীক্ষার জন্য পাঠানো যাচ্ছে না। তবে করোনার উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ডায়রিয়া রোগীদের আলাদা রাখা হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি দেখতে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) চিকিৎসক দীপংকর দাসের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি দল গতকাল সোমবার বরিশালে কাজ শুরু করেছে।

বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের আঙিনায় গতকাল কথা হয় বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলা থেকে আসা মিলা আক্তারের সঙ্গে। তিনি জানান, কয়ের দিন ধরে রাতজ্বরে ভুগছিলেন। সকালে ভাতের পরিবর্তে দুই টুকরা বিস্কুট খেয়েছিলেন। এর পরই শুরু হয় পেটে ব্যথা, সঙ্গে পাতলা পায়খানা। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বমির উপসর্গও যুক্ত হয়। পাশের মঠবাড়িয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। সেখানে দুই দিন থাকার পর তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শে বরিশালে এসেছেন।

কলেরার পরিস্থিতি

বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের একটি কক্ষের চারটি শয্যা নিয়ে ডায়রিয়া বা কলেরা ওয়ার্ড পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিন সেখানে গড়ে ১০০ বা এর বেশি রোগী ভর্তি হচ্ছে। তাদের মধ্যে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ প্রবল ডায়রিয়া বা কলেরা রোগী। যারা বিভিন্ন জেলা কিংবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে কলেরা ওয়ার্ডে আসছে। রোগীদের মধ্যে অন্তত ৬০ শতাংশ নারী। কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর সংখ্যা আরো বাড়বে। যদিও চার শয্যার হাসপাতালকে বিশেষ ব্যবস্থায় ৩০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। কিন্তু গড়ে ১০০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। তাই শয্যা না পেয়ে বারান্দা হয়ে রোগীদের ঠাঁই মিলেছে হাসপাতালের আঙিনায়।

এদিকে বাকেরগঞ্জ, মীর্জাগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের কয়েকটি দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক দিন ধরে খাওয়ার স্যালাইনের বিক্রি বেড়েছে। অনেকে আগেভাগে খাওয়ার স্যালাইন কিনে রেখেছে। এতে খাওয়ার স্যালাইনের সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। তবে উপজেলা পর্যায়ে আইভি স্যালাইনের প্রচণ্ড সংকট দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ ১০০ টাকার স্যালাইন তিন গুণ দামে কিনে রাখছে। বরিশাল সদর হাসপাতাল থেকে জনপ্রতি রোগীকে দুটি করে আইভি স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। বাকি আইভি স্যালাইন বাইরে থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, করোনা পরিস্থিতির মধ্যে ডায়রিয়ার প্রকোপ। এতে চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর চাপ বেড়েছে। ডায়রিয়া বেড়ে যাওয়ার পেছনে আবহাওয়ার বৈপরীত্য বড় কারণ। তাই করোনার পাশাপাশি ডায়রিয়ার বিষয়েও আলাদা নজর রাখা হচ্ছে। বরিশাল বিভাগে খাওয়ার ও আইভি স্যালাইনের সংকট নেই। কিন্তু হঠাৎ করে হাসপাতালগুলোতে রোগী বেড়ে যাওয়ায় সময়মতো স্যালাই সরবরাহ করতে বেগ পেতে হচ্ছে।

রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ডা. মিজানুর রহমান জানান, প্রচণ্ড গরমে মানুষ হিট এক্সহাশন বা হিট ক্র্যামপ্স আক্রান্ত হতে পারে। এ থেকে রোগীর হিট স্ট্রোকও হতে পারে। প্রাথমিক অবস্থায় এ রোগে মানুষ অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে, মাথা ঘোরে। পরিস্থিতি খারাপ হলে রোগীর বমি হতে পারে, শরীরের তাপমাত্রা ১০৪-১০৫ ডিগ্রি হয়ে যেতে পারে। সাধারণত শ্রমিক শ্রেণির মানুষ, যাঁরা প্রচণ্ড গরমের মধ্যে কাজ করেন তাঁরা এ রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন। হিট স্ট্রোক থেকে রক্ষা পেতে গরম এড়িয়ে চলতে হবে। এ ছাড়া হিট স্ট্রোক হয়ে গেলে রোগীর গা মুছে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, জ্বর-কাশির মতো ডায়রিয়াও করোনার একটি উপসর্গ। করোনা ওয়ার্ডে যারা চিকিৎসা নিচ্ছে, সম্প্রতি তাদের মধ্যেও ডায়রিয়ার লক্ষণ দেখা গেছে। তবে স্বল্প মাত্রার ডায়রিয়ায় আক্রান্ত করোনা রোগীর হার শতকরা ১০ ভাগের মতো হতে পারে।