kalerkantho

সোমবার । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৭ মে ২০২১। ০৪ শাওয়াল ১৪৪

দক্ষিণে ডায়রিয়ার প্রকোপ

বরিশাল বিভাগে ১৮ দিনে আক্রান্ত প্রায় ৩০ হাজার

বরিশাল অফিস, ঝালকাঠি, গৌরনদী (বরিশাল) ও চরফ্যাশন (ভোলা) প্রতিনিধি   

১৯ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দক্ষিণে ডায়রিয়ার প্রকোপ

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যা না পেয়ে মেঝেতে শুয়ে আছে রোগীরা। দেওয়া হচ্ছে স্যালাইন। গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বরিশাল বিভাগে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিভাগের ছয় জেলায় গত ১৮ দিনে ২৯ হাজার ১১৪ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন খোদ স্বাস্থ্য বিভাগ। এর আগে কখনো এমন হয়নি বলে জানিয়েছে তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে দ্বীপ জেলা ভোলায়। সেখানে আক্রান্তের সংখ্যা সাত হাজার ৪২১ জন। এ ছাড়া পটুয়াখালীতে ছয় হাজার ৭৩৭ জন, বরিশালে তিন হাজার ৮৫৫ জন, পিরোজপুরে তিন হাজার ৭৫০ জন, বরগুনায় চার হাজার ৩৫৩ ও ঝালকাঠিতে দুই হাজার ৯৯৮ জন আক্রান্ত হয়েছে।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক বাসুদেব কুমার দাস বলেন, ‘হঠাৎ ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করেছি আমরা। ডায়রিয়ায় শহরের মানুষের চেয়ে উপকূল ও গ্রামাঞ্চলের মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।’ এ সময় তিনি জানান, মার্চ ও এপ্রিল মাসে তীব্র গরম থাকায় গ্রাম এবং উপকূলের অনেক মানুষ সকালে পান্তা ভাত খেয়ে থাকে। আর এই ভাত তৈরির জন্য তারা কোনো পরিশোধিত পানি ব্যবহার না করে বাড়ির পাশের পুকুর বা ডোবার পানি ব্যবহার করে থাকে। যেহেতু ডায়রিয়া পানিবাহিত রোগ সেহেতু পুকুর ও ডোবার পানি দিয়ে তৈরি পান্তা ভাত খেয়ে মূলত আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করেন এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।

এ ছাড়া গরমের সময় মানুষ রাস্তার পাশে তৈরি বিভিন্ন শরবত পান করে। এসব পানীয় ঠাণ্ডা করার জন্য যে বরফ ব্যবহার করা হয় সেই বরফ সাধারণত মাছ প্রসেসিংয়ের জন্য তৈরি। আর বরফ তৈরিতে ব্যবহার করা হয় নদী কিংবা খালের পানি। এই বরফ ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের পেটে অনায়াসেই জীবাণু ঢুকে যায়। এ থেকেও অনেকে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘মানুষ একটু সচেতন হলেই পানিবাহিত এই রোগ প্রতিরোধ সম্ভব।’

তীব্র গরমে ঝালকাঠিতে ফের ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। গত দুই দিনে সদর ও নলছিটি উপজেলায় পাঁচ শতাধিক মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৬০ জন সদর হাসপাতাল ও নলছিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি আছে। আক্রান্তদের বেশির ভাগই শিশু ও বয়স্ক বলে জানা গেছে।

তবে দুই হাসপাতালেই বেডের (শয্যা) পাশাপাশি মুখে খাওয়ার স্যালাইন ও আইভি স্যালাইনের সংকট দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় অনেক রোগীই মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছে। আর রোগীদের চাপ সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও সেবকরা।

এ বিষয়ে নলছিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. মুনীবুর রহমান জুয়েল বলেন, ‘ডায়রিয়া বেশি হচ্ছে খাবারে ত্রুটির কারণে। বর্তমানে তরমুজ, বাঙ্গি ও অপরিপক্ব আম খেয়ে অসুস্থ হওয়ার সংখ্যাই বেশি।’ এ সময় তিনি আরো বলেন, ‘বেড না পেয়ে দোতলা ও নিচতলার ফ্লোরে চিকিৎসা নিচ্ছে রোগীরা। এ অবস্থার মধ্যে স্যালাইন সংকট দেখা দিয়েছে। পৌরসভা থেকে কিছু স্যালাইন পাওয়া গেছে। এ ছাড়া কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে বাইরে থেকে স্যালাইন কেনা হচ্ছে।’

অন্যদিকে ভোলার চরফ্যাশনে দিন যাচ্ছে আর ডায়রিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। গত এক সপ্তাহে সরকারি হাসপাতালে শতাধিক ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হয়েছে। আর বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি আছে ২০ জন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত বছর ৫০ বেডের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১০০ বেডে উন্নীতসহ নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে এখনো ১০০ বেডের কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। গত মঙ্গলবার এখানে প্রথম ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হয়। গতকাল পর্যন্ত ১৫০ জন ভর্তি ছিল। বেডের সংকট থাকায় বাধ্য হয়ে অনেকেই মেঝে-বারান্দায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছে। তার ওপর আছে স্যালাইনের সংকট। 

গত শুক্রবার রাতে মেয়ে জান্নাত বেগমকে নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন জাহানপুর গ্রামের আ. রহমান। কিন্তু রোগীর চাপে কোনো বেড পাননি। তাই মেঝেতে থেকেই মেয়ের চিকিৎসা নিচ্ছেন। পরের দিন শনিবার দুপুরে চার বছরের সন্তানকে ভর্তি করান পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের জাসিম উদ্দিন। সন্তানের স্যালাইন চলছে বলে জানান তিনি।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শোভন বসাক বলেন, ‘অতীতের তুলনায় অনেক বেশি ডায়রিয়া রোগী ভর্তি হচ্ছে। হাসপাতালে কোনো বেড খালি নেই। ১০০ বেডের হলেও আগের সেই ৫০ বেডের কার্যক্রমই চলে।’

বরিশালের গৌরনদীতেও একই চিত্র দেখা গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হওয়া ৫৪ রোগীর মধ্যে ২৭ জনই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। তাদের মধ্যে শিশু ও বয়স্কদের সংখ্যা বেশি।