kalerkantho

শুক্রবার। ৩১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ মে ২০২১। ০২ শাওয়াল ১৪৪২

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর টাকা লোপাট

চিতলমারী-কচুয়া (বাগেরহাট) প্রতিনিধি   

১২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর টাকা লোপাট

বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এখন তীর্থ কল্যাণ সমবায় সমিতির সভাপতি অনাদির বসতবাড়ি। নেই সমিতির কোনো সাইনবোর্ড। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলায় সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির বরাদ্দ লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া সমিতিগুলোর নেই কার্যালয়-সাইনবোর্ড। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের কর্মচারী, সমিতির সভাপতি-সম্পাদক মিলে এই টাকা আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

হিজলা গ্রামের তুষার বিশ্বাস জানান, কলাতলা ইউনিয়নের মেলারকুল, হিজলা ইউনিয়নের হিজলা, বড়বাড়িয়া ইউনিয়নের কালেনী, চিতলমারী সদর ইউনিয়নের সাবোখালী, খড়িয়া ও চৌদ্দহাজারী গ্রামে তীর্থ সম্প্রদায়ের প্রায় তিন হাজার মানুষ রয়েছে। তাদের উন্নয়নে চিতলমারীতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। তীর্থ আদিবাসী (নৃগোষ্ঠী) কল্যাণ সমবায় সমিতি ও কালেনী আদিবাসী সমাজকল্যাণ সমিতি এই বরাদ্দ পায়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তীর্থ আদিবাসী (নৃগোষ্ঠী) কল্যাণ সমবায় সমিতি ও আশার আলো সমাজকল্যাণ সমিতির নামে প্রায় ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। এভাবে ২০১১ সাল থেকে প্রতিবছর সরকারি যে বরাদ্দ আসে, তা অনাদি মণ্ডল ও মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাসের নেতৃত্বে আত্মসাৎ করা হচ্ছে।

হিজলা গ্রামের রমেশ বিশ্বাসের ছেলে প্রদীপ বিশ্বাস জানান, তাঁর নামে স্বাক্ষর করে বরাদ্দ উপবৃত্তির ১৮ হাজার টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। সুদাসের ছেলে সুধাংশু বিশ্বাস জানান, তাঁর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। বিশ্বজিত বিশ্বাস জানান, তাঁর মেয়ের নামে আসা শিক্ষা উপকরণ তুলে নেওয়া হয়েছে।

গতকাল রবিবার হিজলা গ্রামে গিয়ে তীর্থ নৃগোষ্ঠী কল্যাণ সমবায় সমিতির কোনো কার্যালয় পাওয়া যায়নি। সাইনবোর্ডও নেই। সেখানে অনাদি মণ্ডল ও তাঁর স্ত্রী ফুলমালা বর্মণ বসবাস করেন।

স্থানীয় তুষার বিশ্বাস জানান, ফুলমালা বর্মণ ও তাঁর স্বামী অনাদি মণ্ডল দুটি সংগঠন করে জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া সদস্য দেখিয়ে সরকারি বরাদ্দের লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অনাদি ও ফুলমালা হিজলা গ্রামে থাকেন না। তাঁরা সরকারি টাকা মেরে দিয়ে এলাকা ছেড়ে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে চিতলমারী সদর ইউনিয়নের বেন্নাবাড়ী গ্রামে পাকা বাড়ি করে থাকেন। ওই বাড়িতে নাকি কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করেছেন। তিনি আরো জানান, একসময় অনাদি মণ্ডল লোকের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করতেন। অথচ এখন তিনি ধনাঢ্য। অনাদি ও তাঁর স্ত্রী দুটি সমিতির সভাপতি। এ ছাড়া সরকারি বরাদ্দ মাহিন্দ্রা গাড়ি শ্যালকের নামে নিয়েছেন। ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত নৃগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য মাহিন্দ্রা গাড়ি, মৎস্য খামার, গভীর নলকূপ স্থাপন, ছাগল পালন, উপবৃত্তির টাকা এসেছে। বরাদ্দের লাখ লাখ টাকা তাঁরা আত্মসাৎ করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

বেন্নাবাড়ী গ্রামে গিয়ে ফুলমালা বর্মণ ও তাঁর স্বামী অনাদি মণ্ডলের নতুন পাকা বাড়ি দেখা যায়। তাঁরা জানান, দুজন দুটি সমিতির সভাপতি। এটি তাঁদের সমিতির কার্যালয় ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। কিন্তু কোনো সাইনবোর্ড নেই কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে অনাদি মণ্ডল বলেন, ‘আমাদের সাইনবোর্ড লাগে না। চিতলমারী ইউএনও অফিস আমাদের সব কাজ করে। আমাদের সমিতির সব কাগজপত্র সেখানে থাকে।’

সরেজমিনে সাবোখালী গ্রামে আশার আলো সমাজকল্যাণ সমিতির কোনো সাইনবোর্ড দেখা যায়নি। সভাপতি পঙ্কজ বিশ্বাস কার্যালয় কিংবা কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। এই সমিতির সাধারণ সম্পাদক মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাস দাবি করেন, ‘নৃগোষ্ঠীর জন্য প্রতিবছরের সরকারি বরাদ্দ তাঁরা সঠিকভাবে বণ্টন করেন। সরকারি বরাদ্দের টাকা তাঁরা আত্মসাৎ করেননি। ব্যক্তিগত টাকায় তাঁরা বাড়ি বানাচ্ছেন।’

কালেনী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী আদিবাসী সমাজকল্যাণ সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অনিমেষ দত্ত জানান, ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত নৃগোষ্ঠীদের উন্নয়নের জন্য সরকারিভাবে এই উপজেলায় কোটি কোটি টাকা এসেছে। কিন্তু ইউএনও অফিসের কতিপয় কর্মচারীর যোগসাজশে প্রতিবছরের বরাদ্দ আত্মসাৎ করা হচ্ছে।

চিতলমারীর নবাগত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লিটন আলী জানান, এই বিষয়ে তিনি একটি অভিযোগ পেয়েছেন। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন।