kalerkantho

সোমবার । ৬ বৈশাখ ১৪২৮। ১৯ এপ্রিল ২০২১। ৬ রমজান ১৪৪২

ওরা বহুরূপী

৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ওরা বহুরূপী

বরিশালের গৌরনদী উপজেলার টরকী বন্দর লাগোয়া পালরদী নদীর তীরঘেঁষে গড়ে উঠেছে বেদেপল্লী। পল্লীতে ৮২টি পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে আটটি পরিবার হঠাৎ করে বিলাসবহুল জীবন যাপন করছে। তারা বানাচ্ছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বহুতল ভবন। এর নেপথ্যে কী? খোঁজ নিয়েছেন আমাদের প্রতিনিধি মো. আহছান উল্লাহ। দুই পর্বের আজ দ্বিতীয়টি

মন্টু, হিজবুল, পিকু, নাসির, জাহান্টার, কামরুল, পলাশ ও দিপু সরদার। ওরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। কখনো দাড়ি রাখে। কখনো কথিত জিনের বাদশা। কখনো মাজারের মুুুুুুরিদ। আবার কখনো দাড়ি ফেলে দিয়ে প্যান্ট-শার্ট পরে দামি গাড়ি ভাড়া করে ব্যবসায়ী সাজে। উদ্দেশ্য প্রতারণা।

সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, মলম পার্টি, অজ্ঞান পার্টি, মাদক ব্যবসা, জুয়াসহ বিভিন্ন অপকর্ম করা এদের পেশা। ওরা আন্ত জেলা প্রতারকচক্রের সদস্য।

ওই সূত্র জানায়, সম্প্রতি ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক এবং গৌরনদী ও এর আশপাশ এলাকায় অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টির খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারানোর প্রায় ২৫টি ঘটনা ঘটেছে। এর সঙ্গে চক্রটি জড়িত থাকতে পারে।

এ ছাড়া ওরা ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ বিভিন্ন শহরে গিয়ে নিজেদের ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেয়। ভুয়া ভিজিটিং কার্ড বানিয়ে নামি-দামি হোটেলে থেকে এসব অপকর্ম চালায়। এমনকি তারা বিভিন্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপকের কাছে যায় ব্যবসায়ী পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য। এই সুবাদে অজ্ঞান করার স্প্রে দিয়ে কৌশলে টাকা-পয়সা-ফোন হাতিয়ে নিয়ে পালায়। এসব কাজে তারা চেতনানাশক ওষুধ, স্প্রে, গুল, মলম, পাগলা মলম, ক্ষুর, ভাঁজ করা চাকুসহ জীবনহানিকর বিষাক্ত দ্রব্য ব্যবহার করে।

নানা অভিযোগ থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে দুটি মামলার খবর পাওয়া গেছে। একটি ২০১৫ সালে ভোলা সদর মডেল থানায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে। আরেকটি ২০১৯ সালে ফরিদপুরের চরভদ্রাশন থানায় প্রতারণার অভিযোগে। চরভদ্রাশন থানার পরিদর্শক মো. জাকারিয়া হোসেন জানান, মামলাটি অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করছে।

গৌরনদী মডেল থানার পরিদর্শক মো. আফজাল হোসেন বলেন, ‘এই থানায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। তবে অস্বাভাবিক ধনী হওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব।’

পল্লীর ৬০ বছর বয়সী একজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আক্ষেপ করে বলেন, ‘তাদের বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ করতে পারি না। তাদের বাড়িতে স্থানীয় অনেক প্রভাবশালী আসে। এ ছাড়া অপরিচিত সন্দেহভাজন অনেক লোক প্রায়ই আসা-যাওয়া করে। নিজের নাম লিখতে পারে না, ঝাড়ফুঁক, সাপ খেলা আর তাবিজ-কবজ বেচে এমন পরিবর্তন অবিশ্বাস্য।’

৫৫ বছর বয়সী একজন নারী বলেন, ‘এরা টাকার বিনিময়ে সব অপকর্ম থেকে পার পেয়ে যায়। আমরাও প্রতিবাদ করতে পারছি না। এদের কারণে অনেক সমস্যা হচ্ছে, গ্রামে গেলে মানুষ আমাদের মনে করে অজ্ঞান পার্টির লোক।’

এক সাপুড়ে জানান, চার-পাঁচ বছর আগে এরা অনেকে কামলা দিয়েছে। ঠিক মতো ভাত পায়নি। এক পল্লীতে বসবাস করলেও তাদের সঙ্গে অন্যদের সুসম্পর্ক নেই।

স্থানীয় ব্যবসায়ী রুহুল আলম বলেন, ‘ওরা সংঘবদ্ধ। পৃষ্ঠপোষক ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে বেশি উঠবস করে না। এদের কয়েকজন পোস্ট অফিস এবং ন্যাশনাল ব্যাংকে নিয়মিত যাতায়াত করে।’

স্থানীয় সূত্র জানায়, তাদের একজন পৃষ্ঠপোষক আছেন, যিনি ঢাকা এবং কুমিল্লায় অবস্থান করেন। তাঁর সঙ্গে অনেক আমলার ঘনিষ্ঠতা।

অভিযুক্ত পিকু সরদার বলেন, ‘সিআইডি, দুদকের কাছে বহুবার গিয়েছি। আমরা কিছু ভয় পাই না। যা শুনেছেন সব মিথ্যা।’

পল্লীর সরদার নাসির বলেন, ‘অভিযোগ সঠিক না। তাবিজ, কবজ, পাথর বিক্রি এবং কিছু পৈতৃক সম্পদ দিয়ে এসব করা হয়েছে। সরদার নিয়োগ নিয়ে দুটি দলে দ্বন্দ্ব চলছে। প্রতিপক্ষরা এভাবে আমাদের নামে মিথ্যা অভিযোগ করছে।’ স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালীর নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘তাদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে। আমাদের সম্পর্কে তাদের কাছ থেকেও জানতে পারেন।’

বরিশালের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গৌরনদী সার্কেল) আ. রব হাওলাদার বলেন, ‘আমি কখনো বেদেপল্লীতে যাইনি। তদন্ত করে এদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা