kalerkantho

শুক্রবার । ৩ বৈশাখ ১৪২৮। ১৬ এপ্রিল ২০২১। ৩ রমজান ১৪৪২

নড়াইলে অবৈধ ক্লিনিকের ছড়াছড়ি

প্রসূতির মৃত্যু ফাঁদ

নড়াইল প্রতিনিধি   

৫ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



প্রসূতির মৃত্যু ফাঁদ

নড়াইলের কালিয়া উপজেলার আটলিয়া গ্রামের ২৯ বছরের ঝুমা বেগম। সদ্যোজাত সন্তানকে কোলে নেওয়ারও সামর্থ্য নেই। জরায়ু কেটে চরম দুশ্চিন্তায় বাবার বাড়ির বিছানায় শুয়ে অঝোরে কাঁদছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে ঝুমা বেগম বলেন, ‘আমি আর কোনো দিন মা হতে পারব না। কোনো দিন উঠে দাঁড়াতে পারব কি না, তাও জানি না। আমাকে আগের অবস্থায় কি ফিরিয়ে দিতে পারবেন ডাক্তার আকরাম? আমি ডাক্তারকে ডাকলাম। কিন্তু উনি ফ্লাইটের তাড়া থাকায় আমাকে একটিবারও দেখলেন না।’

ঝুমা জেলা সদরের ভওয়াখালী গ্রামের খন্দকার মাহফুজ নুরের স্ত্রী। প্রসূতি স্ত্রীকে গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর শহরের ইমন ক্লিনিকে ভর্তি করেন স্বামী। সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারে বাচ্চা প্রসবের পর থেকে রোগীর যন্ত্রণা শুরু হয়, এরপর প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে বের হতে থাকে রক্ত। এ অবস্থায় চিকিৎসা না দিয়ে জোর করে ক্লিনিক থেকে বের করে দেওয়া হয়। ২৪ ডিসেম্বর আলট্রাসনোগ্রাম করে পেটের  ভেতরে জমাট রক্ত দেখা যায়। খুলনার একটি ক্লিনিকে গিয়ে জানতে পারেন, পেটের ভেতরে পচন ধরায় জরায়ু, প্রস্রাবের নালি কেটে ফেলতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে দ্বিতীয় দফা অস্ত্রোপচার করা হয়। কয়েক দফায় চার লাখ টাকা খরচ করলেও ঝুমা রয়েছেন আশঙ্কাজনক অবস্থায়। প্রতিকার চেয়ে ক্লিনিকের দুই মালিক এবং চিকিৎসকের বিরুদ্ধে গত ২৫ জানুয়ারি আদালতে মামলা করেন স্বামী।

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ডিসেম্বরে ইমন ক্লিনিকে ভওয়াখালীর মৌসুমী খানমের সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পাঁচ দিন পর সেলাই কাটতে গিয়ে দেখা যায় কোনো সেলাই লাগেনি। প্রসবের পর তলপেটে যন্ত্রণা বাড়তে থাকে। ক্লিনিকে অভিযোগ জানালে লোকেরা এসে কয়েক ডোজ ব্যথার ইঞ্জেকশন দিয়ে পরে আবার কেটে তলপেট সেলাই করেন।

দিঘলিয়ার সুজয় ঘোষ জানান, তাঁর স্ত্রী সুপ্রিতী ঘোষের অস্ত্রোপচারের পর ইঞ্জেকশন পুশ করেন একজন আয়া। ধীরে ধীরে অর্ধেক অংশ শরীরের পুশ করার কথা। আয়া পুরোটা একবারে পুশ করেন। এতে রোগীর মুখে ফেনা ওঠে। জরুরিভাবে তাঁকে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে কয়েক দিন থাকার পর ধীরে ধীরে সুস্থ হলেও আশঙ্কা কাটেনি।

সুজয় ঘোষের অভিযোগ, ইমন ক্লিনিকে কোনো ডিপ্লোমা নার্স নেই, আয়ারাই নার্স। ক্লিনিক মালিকের স্ত্রী নার্স না হয়েও অস্ত্রোপচার কক্ষে থাকেন।

সম্প্রতি সরেজমিন ইমন ক্লিনিক ঘুরে কোনো প্রশিক্ষিত নার্স পাওয়া যায়নি। কয়েকজন আয়াকে নার্স সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ক্লিনিক মালিকের স্ত্রী শিল্পী বেগম দ্রুত প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে ছুটে আসেন। অস্ত্রোপচার কক্ষের মধ্যে পর্দা দিয়ে আড়াল করে অন্যান্য আসবাব রাখা হয়েছে। প্রত্যেক রোগীর প্রেসক্রিপশনে ২০-২২টি করে ওষুধ লেখা। কয়েক মাস হলো বেসরকারি একটি কলেজ থেকে সদ্য পাস করা একজন আবাসিক চিকিৎসক থাকলেও তাঁর কক্ষের সামনে কোনো নেমপ্লেট দেখা যায়নি। মালিক সরোয়ার হোসেন নিচ থেকে দোতলায় এসে কিছুটা হম্বিতম্বি করার চেষ্টা করলেও পরে থেমে যান।

শিল্পী বেগমের অস্ত্রোপচার চলাকালে শিশুসন্তানকে কক্ষের মধ্যে ভাত খাওয়ানোর অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের ক্লিনিক তো, তাই রোগীর ভালোমন্দ দেখার জন্য সব সময় থাকি।’

আবাসিক চিকিৎসক সপ্নীল আকাশ চিকিৎসার নানা সমস্যা বিষয়ে দায় স্বীকার করে বলেন, ‘সব সময় তো এ ধরনের ঘটনা ঘটে না। এটা অনেকটাই অনাকাঙ্ক্ষিত।’

মালিক সরোয়ার হোসেন একটি ভুল চিকিৎসার কথা স্বীকার করলেও বাকিগুলোর দায় রোগীদের ওপর চাপিয়ে বলেন, ‘রোগীরা অসচেতনভাবে চলাফেরার কারণে ভোগে। আবার প্রেসার বেড়েও অসুস্থ হতে পারে। এসবই নির্ভর করে ওপরওয়ালার ওপর।’

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় বর্তমানে ৬০টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এর বেশির ভাগ লাইসেন্সের হালনাগাদ নাই। চারটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স প্রক্রিয়াধীন। ৯টি লাইসেন্সবিহীন। আরো চারটি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে চলা মডার্ন সার্জিক্যাল ক্লিনিক, লোহাগড়ার মা সার্জিক্যাল ক্লিনিক, আল ইসলামিয়া ক্লিনিক, মোর্শেদা ক্লিনিক ও মিজানুর নার্সিং হোম। নিয়ম না মানা কালিয়া সার্জিক্যাল ক্লিনিক। এ ছাড়া শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুক ক্লিনিক এবং বড়দিয়ার হাজি খান রওশন আলী হাসপাতাল লাইসেন্স ছাড়াই চলছে।

ডিভাইন ক্লিনিকের মালিক ডা. শামীম আক্তার বলেন, ‘একটি ক্লিনিকে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক এবং নার্স আবশ্যক। কোনো কোনো ক্লিনিকের চিকিৎসার গাফিলতির জন্য আমাদের সব ক্লিনিকের যেমন দুর্নাম হয় তেমনি প্রসূতি মায়েরা দীর্ঘ রোগে ভোগেন।’

বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যাসেসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এস এম সাজ্জাদ রহমান বলেন, ‘আমরা মাসিক সভা করি। ক্লিনিকগুলোর কোনো দুর্বলতা থাকলে সেগুলো সংশোধনের জন্য বলা হয়।’

নড়াইলের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহীতা ফোরামের আহ্বায়ক কাজী হাফিজুর রহমান বলেন, ‘প্রায় ২০ বছর ধরে অবৈধ ক্লিনিকের ব্যবসা চলছে। কর্মকর্তারা এসেই দুই মাসের মধ্যে সব ঠিক করে ফেলবেন বলেন। কিন্তু কোন কারণে কিছুই করেন না, ঠিক বোঝা যায় না।’

নড়াইলের সিভিল সার্জন ডা. নাসিমা আকতার বলেন, ‘লাইসেন্স না থাকলে ক্লিনিকগুলো আমরা বন্ধ করে দেব।’

মন্তব্য