kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

বাকী চেয়ারম্যানের নগদ ঘুষ

সনাতন দাশ, তাড়াশ-রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ)   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাকী চেয়ারম্যানের নগদ ঘুষ

আব্দুল্লাহ হেল বাকী। কিন্তু তিনি ঘুষ নেন ‘নগদে’। তাও আবার গৃহহীনদের জন্য নেওয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের নামে। এমন অভিযোগ উঠেছে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার সগুনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এই বাকীর বিরুদ্ধে।

চেয়ারম্যান ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের তিন শতাধিক দরিদ্র মানুষকে সরকারিভাবে বরাদ্দ আধাপাকা ঘর করে দেওয়ার নাম করে জনপ্রতি ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিয়েছেন বলে অভিযোগ। এভাবে প্রায় ৫০ লাখ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু দেড় বছরেও তাঁদের ঘর করে দেননি। এখন টাকা ফেরতের দাবিতে ভুক্তভোগীরা প্রতিদিনই ভিড় করছেন কুন্দইলে অবস্থিত সগুনা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে। চেয়ারম্যান তাঁদের টাকা ফেরত না দিয়ে উল্টো হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ প্রতারিত ব্যক্তিদের।

সম্প্রতি ওই ইউনিয়নের সবুজপাড়া, নওখাদা, লালুয়া মাঝিড়াসহ বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে চেয়ারম্যানের এই প্রতারণার চিত্র পাওয়া গেছে।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, দুই বছর আগে উপজেলার মাগুড়াবিনোদ ইউনিয়নে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। ওই প্রকল্পের আওতায় ‘জমি আছে ঘর নেই’ এমন ২১৮টি পরিবারকে ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়।

প্রতারিত ব্যক্তিরা জানান, অন্যরা ঘর পাওয়ায় তখন অনেকে চেয়ারম্যানের কাছে ধরনা দেন। এই সুযোগে চেয়ারম্যান বাকী ৯টি ওয়ার্ড ও তিনটি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের ১২ জন মেম্বারের সহায়তায় পাঁচ শতাধিক দরিদ্র মানুষের তালিকা তৈরি করেন। ঘর তৈরি করে দেওয়ার নামে তিনি তিন শতাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে জনপ্রতি ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেন। এর পর থেকে শুরু হয় তাঁদের অপেক্ষার পালা। প্রকল্প পাস হতে সময় লাগবে বলে চেয়াম্যান তাঁদের ঘোরাতে থাকেন।

গত বুধবার দুপুর দেড়টার দিকে সগুনা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় গালে হাত দিয়ে বসে আছেন এক বিধবা। কথা বলে জানা গেল, জেবন আরা বেওয়া ভিক্ষা করে চলেন। শেষ জীবনে মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের আশায় প্রায় দেড় বছর আগে তিনি মহিলা মেম্বার সানোয়ারা বেগমের মাধ্যমে জানতে পারেন ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। ওই তালিকায় তাঁর নাম তুলতে তিনি চেয়েচিন্তে ১০ হাজার টাকা তুলে দেন চেয়ারম্যান বাকীর হাতে। কিন্তু তাঁর আর কোনো ঘর পাওয়া হয়নি। নিরুপায় হয়ে তিনি তাঁর দেওয়া টাকা ফেরত চাইতে এসেছেন। কিন্তু চেয়ারম্যান তাঁকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যখন ঘর আসবে, তখন পাবে। টাকা পাবে না।

জেবন আরা বেওয়ার দেওয়া তথ্য মতে, সগুনা ইউনিয়নের নওখাদা, সবুজপাড়া ও লালুয়া মাঝিড়া গ্রামে গিয়ে কথা হয় শাহানাজ বেগম (৬৫), শিউলি খাতুন (৫০), হালিমা (৫৫), সজিব হোসেন (৩৫), সোহেল রানা (৩৮), বাবুসহ (৫২) ১৭ জনের সঙ্গে। তাঁরা জানান, কেউ এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে, কেউ বা চড়া সুদে টাকা নিয়ে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন। এ বিষয়টি নিয়ে তাঁরা বারবার চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করলে নানা অজুহাতে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এখন সুর পাল্টে বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ইউপির এক সদস্য বলেন, ‘চেয়ারম্যান প্রায় দেড় বছর আগে তাঁদের জানান যে সরকার গৃহহীনদের ঘর করে দেবে বিনা মূল্যে। এ জন্য ৫০০ জনের একটি তালিকা প্রস্তুত করতে বলেন। সেই সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের খরচ বাবদ তাঁদের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিতে বলেন। সেই মোতাবেক তাঁদের মাধ্যমে এবং কেউ কেউ সরাসরি চেয়ারম্যানকে ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা দেওয়া হয়।’

এ প্রসঙ্গে নারী ইউপি সদস্য সানোয়ারা খাতুন বলেন, ‘চেয়ারম্যান আমাদের বলেছিলেন সরকার গৃহহীনদের ঘর করে দেবে। এ জন্য মেম্বারদের কাছে তালিকা চান। আমরা তালিকা দিয়েছি। পরে জানতে পারি চেয়ারম্যান আমার ওয়ার্ডের বেশ কিছু মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন প্রকল্প পাস করানোর নামে।’

অভিযোগের বিষয়ে চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ হেল বাকী বলেন, ‘এসব লিখে কী করবেন। দেখা করেন কথা বলব। আমি জনপ্রতিনিধি, নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিপক্ষরা ষড়যন্ত্র করছে।’

তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেজবাউল করিম বলেন, ‘আমি ওই সময় এখানে ছিলাম না। তা ছাড়া এই বিষয়ে কেউ কোনো অভিযোগও নিয়ে আসেননি। অভিযোগ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মন্তব্য