kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

পদে পদে অনিয়ম

রামেক হাসপাতালের নার্সিং বিভাগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পদে পদে অনিয়ম

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের নার্সিং বিভাগের প্রধান হলেন সেবা তত্ত্বাবধায়ক আনোয়ারা খাতুন। কিন্তু সব সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন উপসেবা তত্ত্বাবধায়ক সুফিয়া খাতুন। সেবা তত্ত্বাবধায়কের প্রশ্রয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন সুফিয়া। ফলে পদে পদে অনিয়ম হচ্ছে।

সম্প্রতি রামেক হাসপাতালে এক চিকিৎসকের হাতে যৌন হয়রানির শিকার হন সিনিয়র স্টাফ নার্স। এই ঘটনা নিয়ম অনুযায়ী নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরকে জানানো হয়নি। উল্টো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে অধিদপ্তরের তোপের মুখে পড়েন ওই দুই কর্মকর্তা। আগামী মঙ্গলবার তাঁদের ঢাকায় তলব করা হয়েছে। এ নিয়ে নার্সদের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাঁরা এখন দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। দুর্ব্যবহার থেকে শুরু করে জানাচ্ছেন তাঁদের অনিয়ম-দুর্নীতির কথাও।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৬ জানুয়ারি একজন সিনিয়র স্টাফ নার্সকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন উপসেবা তত্ত্বাবধায়ক সুফিয়া খাতুন। ওই নার্স সেদিন ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সুফিয়া খাতুন পরিদর্শনে গিয়ে ওয়ার্ড নোংরা দেখতে পান। এ সময় তিনি ওয়ার্ড ইনচার্জকে গালি দেন। ইনচার্জ তাঁকে জানান, ওয়ার্ডে কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মী নেই। এরপর সুফিয়া নার্সদের ডিউটি রুম পরিদর্শন করেন। সেখানে ময়লা দেখে তিনি বাইরে এসে প্রকাশ্যে দায়িত্বরত সিনিয়র স্টাফ নার্সের কান ধরে তাঁকে ডিউটি রুমে নিয়ে যান এবং লাঞ্ছিত করেন।

গত ১১ মে উপসেবা তত্ত্বাবধায়ক ১০ নম্বর ওয়ার্ডে আরেক সিনিয়র স্টাফ নার্সের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেন। একটি কাজের জন্য ওই নার্স তাঁর ওয়ার্ড ইনচার্জের সঙ্গে সেদিন সুফিয়া খাতুনের দপ্তরে গিয়েছিলেন। কিন্তু ইনচার্জের সঙ্গে যাওয়ার কারণে সুফিয়া সহকর্মীদের সামনে ওই নার্সকে বকা দেন। একপর্যায়ে তাঁকে রুম থেকে বের করে দেওয়া হয়। ২৫ বছরের চাকরিজীবনে এমন অপমান আর কখনো হননি বলে ওই নার্স জানান।

যেসব নার্সের শিশু বুকের দুধ পান করে তাঁদের করোনা ওয়ার্ডে ডিউটি না দেওয়ার জন্য সরকারি নির্দেশনা আছে। এর তোয়াক্কা না করে ল্যাক্টেটিং মাদার নার্সদের করোনার ওয়ার্ডে জোর করে ডিউটি দিয়েছেন উপসেবা তত্ত্বাবধায়ক। এ নিয়ে নার্সদের মাঝে চরম অসন্তোষ রয়েছে। গত এপ্রিলে ১১ মাসের বাচ্চা থাকলেও এক নার্সকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল করোনা ওয়ার্ডে। ওই নার্স সেবা তত্ত্বাবধায়ক আনোয়ারা খাতুনের কাছে গিয়ে তাঁর সমস্যার কথা জানান। তখন আনোয়ারা উপসেবা তত্ত্বাবধায়ক সুফিয়ার সঙ্গে দেখা করতে বলেন।

সুফিয়া ওই নার্সের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেন এবং বলেন, ‘বাচ্চা দেখার দায়িত্ব নার্সিং সুপার অফিসের নয়।’ বাধ্য হয়ে ওই নার্সকে করোনা ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করতে হয়।

গত ৯ মে রামেক হাসপাতাল থেকে করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত ক্রিশ্চিয়ান মিশন হাসপাতালে ডিউটি দেওয়া হয়। তখন এই নার্সের বাচ্চার বয়স ছিল ২০ মাস। শিশুটি বুকের দুধ পান করত। শিশুটির তখন একটি অস্ত্রোপচারও করতে হয়েছিল। প্রতিদিন দুইবার বাড়িতে তার ড্রেসিং এবং ওয়াশ করতে হতো। সরকারি নির্দেশনার বিষয়টি নিয়ে ওই নার্সও সেবা তত্ত্বাবধায়কের কাছে যান। কিন্তু তিনি এই নার্সকেও করোনা হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য করান।

অন্যদিকে প্রশাসনিক কাজে সেবা তত্ত্বাবধায়ক নিষ্ক্রিয় থাকলেও নানা অনিয়ম-দুর্নীতির সময় উপসেবা তত্ত্বাবধায়কের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করেন বলে জানা গেছে।

রামেক সূত্র জানায়, করোনাকালে নার্সদের হোস্টেলে ১৪ দিন করে কোয়ারেন্টিনে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেখানে তাঁদের খাবারের ব্যবস্থা ছিল। প্রত্যেক নার্সের জন্য বালতি, সাবান, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, তোয়ালে, মগসহ সব ব্যবহার্য জিনিস আলাদা আলাদা সরবরাহের নির্দেশনা ছিল। কিন্তু নার্সদের অভিযোগ, ছোট ছোট এই জিনিসপত্র প্রত্যেক নার্সকে আলাদা সরবরাহ করা হয়নি। বালতি-মগের মতো যেসব সামগ্রী একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করতে পারবেন সেসব জিনিস পর্যাপ্ত কেনা হয়নি। সেই টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরো জানা গেছে, নার্সরা হোস্টেলে না থেকে বাড়ি থেকে করোনা ওয়ার্ডে ডিউটি করলে এক হাজার টাকা করে সম্মানী পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোনো দিন করোনা ওয়ার্ডে রোগী না থাকলে সেই দিনের জন্য নার্সদের সম্মানী দেওয়া হয়নি।

নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের নির্দেশনা রয়েছে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কোনো নার্সের বদলি, পদোন্নতি বা অন্য কোনো দায়িত্বে পদায়ন করতে পারবে না। কিন্তু আনোয়ারা ও সুফিয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে তাঁদের পছন্দ অনুযায়ী নার্সিং সুপারভাইজার হিসেবে পদায়ন করিয়ে নিয়েছেন। গত বছরের ২৬ আগস্ট হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) এক অফিস আদেশে ১০ জন নার্সকে সুপারভাইজার হিসেবে পদায়ন করেন।

হাসপাতালের সেবা তত্ত্বাবধায়ক আনোয়ারা খাতুন বলেন, ‘পদে তো আমিই বড়। আমার চেয়ে তো তিনি বড় নন। তবে আমি তাঁর সহযোগিতা নিই। তাঁকে দিয়ে সব কাজ করানোর বিষয়টি সঠিক নয়। কাউকে অপদস্থ করার বিষয়টিও সঠিক নয়।’

উপসেবা তত্ত্বাবধায়ক সুফিয়া খাতুন বলেন, ‘এসব মিথ্যা কথা। আমি কারো সঙ্গে দুর্ব্যবহার করি না।’